আজ মল্লিকার মায়ের বিয়ে। হ্যাঁ ঠিক শুনেছেন।আপনি যা শুনেছেন আমি তাই বলেছি। মল্লিকার বয়স একুশ বছর। অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোট বেলা থেকে মল্লিকা দুজনকেই আপন বলে জানে মা আর তার নানী। শহরতলীতে তিনতলা দালানের চিলে কোঠায় তাদের সংসার।ছোট থেকে অভাব দেখেছে মল্লিকা কিন্তু দুঃখ কষ্ট দেখেনি । মল্লিকা কেঁদেছে কিন্তু চোখের পানি কখনো গালে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ তার মায়ের হাত প্রস্তুত ছিলো এটা মুছে দেওয়ার জন্য। মল্লিকার মা তার মায়ের একমাত্র সন্তান। মল্লিকা তার মায়ের একমাত্র সন্তান। তাই তাদের পৃথিবীতে তারা তিন জন ছাড়া আর কেউ নেই।
ছোটবেলায় একটা কাহিনি শুনেছিলাম, ইসলামের নবী মূসা(আ) আল্লাহর সাথে কথা বলতেন। তাই কোনো কিছু ওনার কাছে ঠিক মনে না হলে তিনি আল্লাহকে প্রশ্ন করতেন। একদিন এক বিধবা মহিলা মূসা(আ)কাছে বিচার নিয়ে আসলেন হে নবী আমার পাশের একজনের ছয় সন্তান। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই জীবিত। আর আমি আমার একমাত্র পুত্র সন্তানকে নিয়ে বিধবা হয়েছি অনেক বছর আগে। আজ আমার সে সন্তান মৃত্যুবরণ করেছে। ওদের এতো গুলো সন্তান থেকে একটা মরে গেলে কি হতো। কিন্তু না তোমার আল্লাহ কেনো আমার একমাত্র সন্তান কে নিয়ে গেলো।
তখন মূসা(আ) রেগে আল্লাহ কে জিজ্ঞেস করতে চলে গেলেন। আল্লাহ কে জিজ্ঞেস করলেন আল্লাহ তাঁকে কোনো উত্তর দিলেন না।বললেন হে মূসা ঐ যে দূরে একটা কলা বাগান দেখছো তুমি সেখানে যাও সেখান থেকে একটা পাকা কলা নিয়ে আসো।মূসা (আ) কোনো প্রশ্ন না করে চলে গেলেন এক বেলা পার করে একটা কলা নিয়ে আসলেন। আল্লাহ বললেন হে মূসা এতো বড় বাগান থেকে একটা কলা নিয়ে আসতে তোমার এতো সময় কেনো লাগলো। জবাবে তিনি বললেন হে আল্লাহ কাঁদি কাঁদি পাকা কলা এতো সুন্দর লাগছিলো ছিঁড়তে ভালো লাগেনি।অনেক খুঁজে একটা গাছে একটা কলা পেয়েছি সেটা নিয়ে এলাম। সাথে সাথে আল্লাহ বললেন হে মূসা তুমি কি তোমার উত্তর পেয়েছো!
তারপর মূসা (আ)চলে আসলেন। ঘটনা গুলো এভাবেই ঘটে যার কেউ নেই তার শেষ সম্বল হারিয়ে যায়। মল্লিকার মায়ের এক বছর বয়সে তার বাবা মারা যায়। তারপর মল্লিকার নানী তার মাকে একা হাতে মানুষ করেছে। কেউ পাশে ছিলো না।ভেবে ছিলেন মেয়ে কে বিয়ে দিলে সব দুঃখ গুছে যাবে। কিন্তু মেয়ের বিয়ের তিনমাস পর এক দুর্ঘটনায় তার স্বামী মারা যায়। ততোদিনে মল্লিকার মা গর্ভবতী ছিলেন। এরপর থেকে ওনি ওনার মেয়েকে নিয়ে সংসার গড়েছেন। কখন কে আসবে তখন জীবন সুন্দর হবে এসব ভাবনা বাদ দিয়ে নিজেরা সুখে থাকার চেষ্টা করেছেন।
মল্লিকার জন্মের আগে মা মেয়ে চাকরি করতেন। কিন্তু মল্লিকার জন্মের পর থেকে শুধু মল্লিকার মা চাকরি করেন। নানী মল্লিকাকে দেখাশোনা করেছে।মল্লিকার মা দিনরাত পরিশ্রম করেছে মল্লিকাকে মানুষ করার জন্য। মল্লিকা কোনো দিন তার মাকে কাঁদতে দেখেনি, কষ্ট পেতেও দেখিনি। ও সব সময় ভাবতো ওর মায়ের কোনো দুঃখ নেই।ও যখন একাদশ শ্রেণীতে পড়ে হঠাৎ একদিন ওর মা জ্ঞান হারায়।অনেক চেষ্টা পর জ্ঞান না ফেরায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে ভর্তির তিন ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরে। তিন দিন পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি আনা হয়।
বাড়িতে আসার সময় ডাক্তার মল্লিকাকে বলে দুশ্চিন্তা আর হতাশা থেকে এই অবস্থা। এভাবে আর কয়েকবার জ্ঞান হারালে ওনাকে বাঁচানো যাবে না। তার হাসি খুশি মায়ের এতো কষ্ট মল্লিকা কখনো বুঝেনি।মল্লিকা আর তার নানী ভেবে যাচ্ছে মল্লিকার মাকে কিভাবে ভালো রাখবে।দুশ্চিন্তা আর হতাশা থেকে কিভাবে মুক্তি দেবে। হঠাৎ নানী বললো তোর মাকে যদি আমরা বিয়ে দেই তাহলে তোর মা ভালো হয়ে যাবে। মল্লিকারও এই আইডিয়াটা ভালো লেগেছে।কিন্তু মাকে কিভাবে রাজি করবে!
বহু কষ্টে মাকে রাজি করিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে। বিয়ের দিন খুব খুশি ছিলো মল্লিকা। জমকালো আয়োজন করে মায়ের বিয়েতে।বিয়ের আসরের পেছনে লিখে রেখেছিলো আজ মল্লিকার মায়ের বিয়ে। মায়ের বিয়ের একবছর পর্যন্ত সব ঠিক ছিলো। এক বছর পরও মা জানতে পারে ওনার স্বামীর বৌ বাচ্চা আছে এই শুনে মল্লিকার মা মানতে পারেনি আত্মহত্যা করে ফেলে। মায়ের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু মল্লিকা মানতে পারেনি। সব সময় রুমে বসে থাকে আর বলতে থাকে আজ মল্লিকার মায়ের বিয়ে। নানি সারাদিনে একবার হয়তো কিছু খাইয়ে দেয়। এভাবেই চলছে মল্লিকার জীবন।