আম্মার উঠোন বাগান

Words
581
Reading
3 min
Listen
Play
4y

আজকাল ছাদ বাগানের খুব প্রচার প্রচারনা দেখা যায়।শহরের ছাদ বাগান আর গ্রামের উঠোন বাগান আসলে একি বিষয়।শহরের বাড়িগুলো পাকা হয় তেমন জায়গাও নেই তাই বাগান করতে চাইলে ছাদে করতে হয়।গ্রামের বাড়ি গুলো বেশির ভাগ কাঁচা বাড়ি আবার জায়গাও অনেক বেশি থাকে, বাহির বাড়ি কিংবা ভিতর বাড়ির "উঠোন বাগান" উঠোনেই করা হয়।ছাদ বা উঠোন বাগান কেউ করে শখে, কেউ করে প্রয়োজনে,কেউ করে অন্যের টা দেখে আবার কারও ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও হয়। কেউ আরেকজনের ছাদ বাগান দেখে দেখে অনুপ্রাণিত হন কিন্তু তার করার সু্যোগ নেই তিনি আবার নিজের জুনিয়র কাউকে দিয়ে করানোর চেষ্টা করেন।

উঠোন বাগান দেখেছি আমি সেই ছোট থেকে। এতো ভালো উঠোন বাগান সবাই করতে পারেনা। বিভিন্ন রকমের লোক ছাদ বাগান বা উঠোন বাগান করলেও সঠিক ভাবে পারেনা।মূলত যে শখে আর যে প্রয়োজনে করে তারাই কেবল পারে এধরণের বাগান করতে। আমার আম্মাকে দেখেছি বাহির বাড়ির উঠোন, ভিতর বাড়ির উঠোন আর পুকুর পাড়ে এ ধরনের বাগান করতেন। এক বছর কিংবা দুবছর নয়, বছরের পর বছর।শীতের সময় পুকুরে পানি কম থাকে প্রায় শুকিয়ে যায়। আমার আম্মা পুকুরের ভিতরে বাঁশের আগার অংশটুকু কঞ্চি সহ রেখে দিতেন। আর পুকুরপাড়ের একদুই জায়গায় লাউ বিচি রুপন করতেন। বিচি থেকে যখন ছোট ছোট চারাগাছ হতো সেগুলো সেই কঞ্চি সহ বাঁশের উপর তুলে দিতেন। আস্তে আস্তে গাছগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো। এই গাছগুলোতে এতো লাউ হতো আম্মা এগুলো সারাপাড়ার লোককে দিতেন, আত্মীয়স্বজনদের দিতেন, মাঝে মাঝে বিক্রিও করতেন।এগুলোতো গেলো পুকুরের ভিতরের সবজি চাষ।পুকুর পাড়ে আম্মা এতো সবজি ফলাতো অন্য মানুষ তা জমিতেও ফলাতে পারতো না। পুকুর পাড়ে ঢেড়স,শিম,বরবটি প্রচুর পরিমাণে জন্মাতো।

আমাদের ঘরের চালে মিষ্টি কুমড়োর এক এলাহী কান্ড ছিলো আম্মা ঘরের ভিতর মাচা বানাতেন মিষ্টি কুমড়ো রাখার জন্য। মিষ্টি কুমড়ো গুলো গাছে রেখে ভালো করে পাকাতেন এরপর এগুলোকে মাচায় রেখে দিতেন। একেকটার ওজন হতো দশ কিলোর উপর। সেগুলো ছয় মাস পর বিক্রি হতো যখন মৌসুম চলে যেতো।

আমাদের ঘরের বাম দিকে বেশ অনেকটা খালি জায়গা সেখানে আম্মা হলুদ আর আদা চাষ করেন। আম্মা রান্না করে সব ছাই এসব চাষাবাদে ব্যবহার করেন। অল্প একটু জায়গায় একমণ দেড় মণ হলুদ হতো।একটা আলু আছে আমরা এটাকে পান আলু বলি আমাদের বাড়িতে এটা প্রচুর পরিমানে হতো। অনেকে আম্মার কাছ থেকে বীজ নিতো কিন্তু কারো নাকি হতো না আবার এক বছর হলে পরের বার নষ্ট হয়ে যেতো।

আমাদের ঘরের সামনে আর কলপাড়ে সব সময় মরিচ গাছ। সব মরিচ উল্টো ভাবে হয়। তবে অনেক রকম মরিচ হয়।কোনোটা কালো মার্বেলর মতো গোল, কোনোটা আবার কাগজের মতো সাদা,কোনোটা চিকন লম্বা। আমার আম্মা রান্না করার সময় মরিচ তুলে এনে রান্না করবে।মরিচের জন্য আম্মা একটা মাটির পাতিল আছে। সেটাই মাটি ভরে শিকায় ঘরের সামনে ঝুলিয়ে রাখে সারা বছর। এটাতে মরিচ বীজ থেকে মরিচের চারা হয়। চারা একটু বড় হওয়ার পর মাটিতে রোপন করে।আমাদের বাড়িতে আত্মীয় স্বজনরা আসলে আম্মার কাছ থেকে মরিচের চারা নিয়ে যায়।মরিচ উঠাতে গিয়ে মরিচের ডাল ভাঙা যাবে না। তাই আমরা যখন আম,জাম,জাম্বুরা ভর্তা বানাতাম বেশিরভাগ সময় আম্মা মরিচ তুলে দিতো।আম্মা উঠোনে বেগুন গাছ ও থাকে সেটা আবার সাদা ডিমের মতো বেগুন যা সারাবছর জন্মায়।

আমাদের বাড়িতে সব ধরনের কলা আছে। এই কলা গাছ গুলো আবার একি জায়গায় সব সময় থাকে না। দুই বছর পরপর আম্মা জায়গা পরিবর্তন করে নইলে নাকি কলার বাগ নষ্ট হয়ে যায়।

এখন ছাদ বাগান দেখে আমার আম্মার উঠোন বাগানের কথা খুব মনে পড়ে।এখনো আম্মার উঠোন বাগান আছে তবে এতো বেশি জমকালো নেই আগের মতো।

আমার বোন জামাই ছাদ বাগান দেখে দেখে ওনার খুব ভালো লাগে। তাই ওনার নিজেদের ছাদে ছাদ বাগান করার পরিকল্পনা করেন। তবে ওনি বিদেশে থাকায় ওনি ওনার ভাই ভাবি ভাইজি ওদের সাহায্যে ছাদ বাগান করান। খুব ভালো হয়েছিলো কিন্তু একবছর করার পর ভালো পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। আসলে নিজের ইচ্ছে আর প্রয়োজন এদুটো না থাকলে এসব হয় না,হলেও ঠিকে না।

IMG_20210225_124001.jpg

আম্মার উঠোন বাগান | Ecency