গ্রামের লোকদের কাছে আম, জাম, পেয়ারা,খেজুর,জলপাই অর্থ্যাৎ দেশী ফল যতটা সহজলভ্য বিদেশি ফল মানে কমলা, আপেল,আঙ্গুর ততোটাই দূর্লভ। আসলে গ্রামের মানুষ এগুলো কে বিদেশি ফল বলে তাই আমিও বললাম। গ্রামের প্রায় শতভাগ মানুষের নিজের একটা বাড়ি থাকে। সেটা হোক বড় কিংবা ছোট। তাই সেখানে সে শখ করে রোপণ করোক আর গাছ নিজে থেকে জন্মাক কিছু ফুলের গাছ থাকবেই। আবার গ্রামে যারা পাশাপাশি বসবাস করে তারা সবাই আত্মীয়। তাই এখানে সবাই সুখ দুঃখ যেমন ভাগ করে নেয় তেমন ফলফুল শাক সবজি সবি ভাগাভাগি করে খায়।তাই গ্রামে বড় হওয়া প্রতিটি মানুষ এসব দেশী ফলমূলের সাথে বিশেষ ভাবে পরিচিত। গ্রামের মানুষ বিদেশি ফলের প্রতি আকৃষ্ট হলেও ভালোবাসে দেশি ফলকে। এর সত্যতা বলতে পারবে আমার মতো গ্রাম থেকে শহরে এসে বাস করা মানুষ গুলো।
আমাদের গ্রামের বাড়ি সম্পর্কে এর আগে আরও অনেক বার লিখেছি।তাই বড় করে এর বর্ননা করা নিঃসপ্রয়োজন ।বিভিন্ন ফলের গাছে ভরপুর আমাদের বাড়ি। এসব গাছের সাথে ছিলো আমার আত্মার সম্পর্ক। আজ শত মাইল দূরে বসে চোখ বন্ধ করে দেখি এসব গাছ। ছোট বেলায় বাড়িতে যেদিন কমলা আসতো সেদিন আনন্দে হাওয়ায় যেনো ভাসতাম। আর এখন এসব বিদেশি ফল সামনে পরে থাকে কোন আকর্ষনই নেই। দেশি ফল নেই তা না কিন্তু আমাদের বাড়ির সেই ফল নেই। আমাদের গাছের সে টক মিষ্টি জাম্বুরা আহা যেন অমৃত।
ছোট বেলা থেকে টক আর তিতা স্বাদ আমার প্রিয়।টক অনেকে পছন্দ করে কিন্তু তিতা অনেকেরই ঘোর শত্রুতা। সেখানে তিতা আমার ভালো বন্ধু।টক জাতীয় সব ফল আমার প্রিয়। দেশি ফলের অধিকাংশ টক যুক্ত। যেমন আম,জাম,লিচু,জাম্বুরা, লটকন,তেঁতুল ইত্যাদি। তাই টক ফল নিয়ে আলাদা কিছু বলার নেই।
তবে তিতা জাতীয় কোন ফল হয় না এটা সত্য মনে হলেও একটা তিতা ফল আছে তা হচ্ছে শালুক । শালুক সাদা শাপালার মূল।অবশ্য সব সাদা শাপলার মূল এক রকম হয়না। আসলে সাদা শাপলা বললে ভুল হবে শাপলা গুলো বিভিন্ন রঙের হয়।সাদা, বেগুনি,গোলাপি অবশ্য কালার গুলো খুব হালকা।কতগুলো শাপলার মূল খুব বড় হয় সেটাই আবার ছোট ছোট শালুক হয় যেটাকে আমরা বলতাম গুঁড়া শালুক। কতগুলোর মূলে আবার কচুর মুখীর মতো শালুক হয় এই শালুক গুলো বেশি মজাদার। এ শালুক গুলো কামড় দিলে প্রথমে তিতা মনে হয়। এরপর মুখে একধরনের স্বাদ ছড়িয়ে যায় অন্য কোনো ফলে তা নেই। আমাদের বাড়ির আশেপাশে কোনো নদী নেই তাই শালুক ও নেই। শালুক খেতে শিখেছি মামা বাড়ি থেকে। আমার মামা বাড়ির তিন পাশে নদী। আমার চাচাতো মামাতো ভাইবোনেরা শাপলা শালুক তুলতে নদীতে যেতো। তাদের সাথে আমার মেজুবোন যেতো আমি আমার মেজু বোনের সাথে যেতাম।
আমি ছোট ছিলাম শালুক তুলতে পারতাম না। শালুক রাখার পাত্র ধরে দাড়িয়ে দেখতাম মেজু কিভাবে তুলে।এভাবে ছোট বেলায় কয়েকবার শালুক খেয়েছিলাম। আমি একটু বড় হওয়ার পর আর কোনো দিন শালুক খায়নি। যখন খিলক্ষেত আমরা তিন ভাইবোন থাকতাম, তখন ওভার ব্রিজের পাশে একদিন দেখি শালুক বিক্রি হচ্ছে। তখন এক কেজি কিনলাম। সেবার শালুক খেয়ে আমি শালুকের ভক্ত হয়ে গেলাম। এরপর ওভার ব্রিজের এখানে যতোবার দেখেছি ততোবারই কিনেছি।এখন খিলক্ষেত থাকা হয় না আর শালুক ও দেখি না। মাঝে মাঝে মনে পড়ে কিন্তু কোথায় পাবো? তাই আর খাওয়া হয় না।
আজ হঠাৎ শালুকের কথা মনে পড়েছে তাই ফল নিয়ে এই কথাগুলো বলা।শহরে সব কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু কেনো জানি গ্রামের জিনিসের মতো হয় না।গ্রামের কোনো একটা ফলের স্বাদ আর শহরে পাওয়া সেই একি ফলের স্বাদের মধ্যে থাকে অনেক ব্যবধান।হয়তো যারা গ্রামের সেই ফল কোনোদিন খায়নি সে এই পার্থক্য বুঝেত পারবে না।শুধু ফল নয়,গ্রামের প্রত্যেকটা খাবার জিনিসের স্বাদই ভিন্ন।মনে হয় প্রকৃতির সাথে মিশে আছে বলে এমন পার্থক্য।আর শহরের শাকসবজি,ফলমূল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণে উৎপন্ন করে এবং সেসব ক্ষেত্রে পন্যের মানের চেয়ে যাতে বেশি পরিমাণ উৎপাদন করতে পারে সে দিকে মনোযোগ দেয়।
তাছাড়াও গ্রামের কৃষকের হাতে উৎপাদিত ফসল যেগুলো শহরে আনা হয় সেগুলো আনার জন্যও রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় সংরক্ষণের সুবিধার্থে, এগুলোও ফসলের স্বাদ কমিয়ে দেয়।
মূলত এসব কারণেই শহরে পাওয়া গ্রামের ফলমূল,শাকসবজির স্বাদ ঠিক গ্রামের ফলমূলের মতো হয় না।