'মিষ্টি' কাহিনী

Words
543
Reading
3 min
Listen
Play
4y

এইতো কয়েকদিন আগে আমাদের মেসে একটা অনুষ্ঠান ছিলো।মেডিকেল ছাত্রদের মেস।আমাদের মেস যে পরিচালনা করেন ওনার নাম নাইম।তো নাইম ভাই তার পরিচিত অন্যান্য মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের দাওয়াত দিয়েছেন।উদ্দেশ্য বড় একজন "মোটিভেশনাল স্পিকার" এর বক্তব্য শুনে আমরা যাতে পড়ালেখায় এবং ধর্ম পালনে আরও মনোযোগী হতে পারি।

তারজন্য অবশ্যই ভালো একটা খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিলো।সব বাজার সকালেবেলা এবং দুপুরে নাইম ভাই করে রাখেন।বিকাল থেকে আমাদের মেসের খালা আরেকজনকে সাথে নিয়ে এসে রান্না শুরু করেন।অনেক কিছুই রাধেঁন পোলাও,মুরগির রোস্ট,ডিমের কোরমা,ইলিশ মাছ আর সবজি।তো এসব খাবার খাওয়ার পর মিষ্টি কিছুতো খেতে দিতে হবে।

এইজন্য সন্ধ্যায় আমি আর নাইম ভাই বাহিরে মিষ্টি আনতে যায়।ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার,এমন দোকানের নাম।এই দোকানে দেখি সব উচ্চমানের মিষ্টি।মানে উচ্চ কিনা সেটাতো আর দেখেই বলতে পারবো না,কিন্তু দামে যে উচ্চ সেটা প্রতিটি মিষ্টির থালার সাথে থাকা "প্রাইস প্লেট" দেখে বুঝতে পারছি।তারমধ্য থেকে নাইম ভাই এক ধরনের মিষ্টি নিবেন বলে ঠিক করলেন।এক কেজি মিষ্টির দাম সাড়ে ছয়শো।নয়টা মিষ্টি হয় এক কেজিতে।সে হিসাবে একটা মিষ্টির দাম পরেছে প্রায় সত্তর টাকা করে।

আমিতো অবাক একটা ছোট মিষ্টির দাম সত্তর টাকা।যেকানে কিনা গ্রামের দোকানে এক কেজি মিষ্টির দাম হয় সত্তর-আশি টাকা।একটা মিষ্টির দাম সেখানে চার-পাঁচ টাকা করে পরে।হ্যাঁ বুঝলাম ঐ মিষ্টি আর এই মিষ্টির মধ্যে পার্থক্য আছে,কিন্তু স্বাদতো ঐ একি।মানে গ্রামের মিষ্টিও মিষ্টি লাগবে,এটাও মিষ্টিই লাগবে।তাই বলে এতো পার্থক্য দামে।যাইহোক,দুনিয়াতে আরও কতো দামি জিনিস আছে,ঐদিন শুনলাম শহরের কোন হোটলে না জানি এক লাখ টাকার আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে এটাতো কিছুই না।

নাইম ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলো,এটা আগে খেয়েছি কিনা।আমি বললাম,না ভাই এসব আমার জন্য না।অযথা বিলাসিতা করা আমার পছন্দ না।
পরে ওনি বললেন,আমাদের মেসের আরেক সদস্য নাকি,দুই-তিন দিন পর পর এখানে এই মিষ্টি খেতে আসেন।
সে যাইহোক,আমার মনেতো স্বাদ জাগলোই স্বাভাবিকভাবে,এই মিষ্টির মধ্যে কি এমন আছে খেয়ে দেখতে হবে।

আমরা মোট তিনকেজি মিষ্টি আনি।তিনকেজির জন্য উনিশশো টাকার একটু বেশি দিতে হয়।তো মিষ্টি হয়েছে মোট সাতাশটা।অনুষ্ঠানে মানুষ আসে তেইশ থেকে পঁচিশ জন এর মতো।তো প্রত্যেকে একটা করে মিষ্টি পাবে এর বেশি পাবে না।

যথানিয়মে অনুষ্ঠানের আনুষঙ্গিক সব কিছু শেষ হলো,বক্তব্য বা অন্য যা কিছু আছে।সবার খাওয়া দাওয়াও শেষ হলো।খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়ার পর সবাইকে মিষ্টি দেওয়া হলো।আমিই বন্টন করলাম।সবাইকে একটা করেই দিলাম।দেওয়ার সাথে সাথে সবাই খেয়ে ফেললো।
সবাই,এতো ভালো খাবার পেয়ে খুশি।

অবশ্য আমার ভাগে যে মিষ্টিটা পড়েছিলো সেটা আমি রেখে দিয়েছিলাম।কারণ ভারী খাবার খাওয়ার পর আবার এই সত্তর টাকা দামের মিষ্টি খাবো আমি এতোটাও পেটুক না।আর এই মিষ্টি টা আমার আয়োজন করে বসে খেতে হবে।এতো মানুষের সামনে খেলে অনুভূতি মিশিয়ে খেতে পারবো না।আর এতো মানুষের সামনে খেতে মজাও পাবো না।নিজের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে বসে এতো দামের মিষ্টি খাওয়া লাগবে আমার মনে এই আশায় ছিলো।
এইসব চিন্তা করে সুন্দর করে একটি বাটিতে মিষ্টিটাকে নিয়ে ফ্রীজে রাখলাম।বাটিটাকে একটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলাম।

অনুষ্ঠান শেষ হতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজলো।
কিছু মেহমান চলে গেলেন,আর অনেকেই রয়ে গেলেন ঐদিনের রাতের জন্য।

এর পরের দিন ছুটির দিন শোকদিবস ছিলো।আমি ভাবলাম যাক সকালে ঘুম থেকে উঠে সত্তর টাকার মিষ্টি দিয়ে নাস্তা করে শোক পালন করবো।রাতে মিষ্টিটাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখলাম।আমি আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম।কখন সকাল হবে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

সকালবেলা উঠে হাত মুখ ধুয়ে প্রথমেই গেলাম মিষ্টিটাকে খেতে।আহা মিষ্টি।
কিন্তু ফ্রীজ খুলে দেখি,যে ঢাকনা দিয়ে মিষ্টিটা ঢেকে রেখেছিলাম সেটা অনাদরে পরে আছে।
ওমা আমার বাটি কোথায়,বাটি নরকে যাক,আমার মিষ্টি কোথায়।
তখন বাসনকোসন ধোয়ার বেসিনে তাকিয়ে দেখি বাটিটা ভিজানো সাথে একটি চামচও ভিজতেছে।
আর অল্প সাদা পানি দুধের তৈরি ছিলো কিনা।আর বাটির নিচের অংশে বাটির সাথে লেগে রয়েছে আমার বড় স্বাদের সত্তর টাকার মিষ্টির অবশিষ্টাংশ।

IMG_20220817_014609.jpg