আমার বোনের জামাই কুমিল্লা থাকেন চাকরিরসুবাধে।গত বৃহস্পতিবার কুমিল্লা থেকে ঢাকা, বাসে যে ভাড়া দিয়ে এসেছিলেন আজ শনিবার তার দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে কুমিল্লা যেতে হয়েছে।এর কারণ হচ্ছে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ করে বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশের বাজারে।বাসগুলোতে যেহেতু ঐসব জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হয় তাই তারা এই খবর পাওয়ার সাথে সাথে নিজের মর্জিমাফিক দাম বাড়িয়ে নিয়েছে।কেউ কেউ অতি-আবেগের কারণে ভাড়া দ্বিগুণ করে নিয়েছে আবার অনেকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী ত্রিশ শতাংশ,চল্লিশ শতাংশ করে বাড়াচ্ছে।মনে হচ্ছে তারা শুধু তেলের জন্য বাস ভাড়া নেয়,আর তাদের জনবলের বেতন,ড্রাইভার,হেলপারের বেতন,বাসের অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ এই ভাড়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়!তেলের দাম বেড়েছে কিন্তু হেলপার,ড্রাইভারের বেতন বা বাসের দামতো আর বাড়েনি,তবু তারা তেল বৃদ্ধির সমপরিমাণ বাস ভাড়াও বৃদ্ধি করেছে।
এই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে অনেক বিষয় মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।এক-দুই দিন আগে আমি আর কিছু সহপাঠী রাস্তা দিয়ে আসছিলাম,আর আমাদের ছোট সময়ের কিছু স্মৃতি বিচরণ করছিলাম।বিভিন্ন কথার মাঝে শরীফ বলছিলো,সে ছোটসময় একধরনের আইসক্রিম খেতো লম্বা নলের মধ্যে থাকতো,রোভো নাম।মেহরাবও তার স্মৃতিগুলো বলছিলো,আমি তখনি বলিনি।এমন সময় সামনেই একটা দোকান পড়লো,তো সেই দোকানে আমরা "রোভো" খুঁজতে গেলাম।রোভো তো পেলাম না কিন্তু যা পেলাম তা দেখে আমি চমৎকৃত হয়ে গেলাম।ছোটো সময় একধরনে আচার খেতাম ছোটো প্যাকেটে থাকতো,নাম ছিলো "বার্মিজ"। সেই যখন প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়তাম তখন গ্রামে থাকাকালীন এই বার্মিজ আচার এক টাকা করে কিনে খেতাম।এর পর এতো বছরে ঢাকা আসার পর আর কোনোদিন সেটা দেখিনি,এখন বাড়িতেও তা পাই না,আমি মাঝেমধ্যে মনে মনে খুঁজি।শরীফরা যখন এসব ছোটবেলায় খাওয়া খাবার নিয়ে আলোচনা করছিলো,তখন আমার এটার কথাও মনে পড়ছিলো,আর কাকতালীয়ভাবে পেয়েও গেলাম।ছোট সময় অনেক ভাবতাম এটার নাম এমন কেনো,বার্মিজ।কোনো পরিচিত শব্দ ছিলো না এটা।এইবার যখন এটা পেলাম এটার গায়ে দেখতে পেলাম লিখা,মেইড ইন মায়ানমার।আর মায়ানমারের আরেক নাম যেহেতু বার্মা,তাই এই বার্মাতে প্রস্তুতকৃত আচারের নাম বার্মিজ।
কিন্তু সেই এক টাকার আচারটার দাম এখন চার টাকা।চার টাকা শুনতে তেমন বেশি মনে হচ্ছে না তাই না।কিন্তু দাম কিন্তু চারশো শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।এটা মাথায় আসলো যখন আমি আমার বোনকে আচারটার ছবি দেখালাম সে দাম জানতে চাইলো আর শুনে এটা বললো।
তো আমি এই আচারটার মূল্যকে "মান" বা "স্ট্যান্ডার্ড" ধরে হিসাব করে দেখলাম,এই আচারের মতো বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জিনিসের দাম তখনকার তুলনায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।তখনকার বলতে বারো-তের বছর আগের কথা কিছুক্ষেত্রে তা ছয়গুণ বা সাতগুণও।যেমন,সেইসময় ঢাকা থেকে আমাদের কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার বাস ভাড়া ছিলো ষাট-সত্তর টাকা।বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে দুইশত দশ টাকা।এখন এইবার তেলের দাম বৃদ্ধির পর ভাড়া নিশ্চয়ই বাড়িয়েছে তা কত এখনও জানি না।
অনেকে বলে পটেটো ক্র্যাকার্স চিপস একমাত্র জিনিস যার দাম সেই পনের বছর আগে যা ছিলো এখনও তা।কথাটা আংশিক সত্য,কারণ চিপসের দাম বৃদ্ধি না পেলেও প্যাকেটের ভিতরে থাকা চিপসের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।তখন থাকতো ত্রিশ গ্রাম চিপস আর এখন থাকে সতের গ্রাম চিপস।আর একটা বিষয় হচ্ছে আলুর দাম তেমন বাড়েনি,এটা এখনও বিশ-ত্রিশ টাকা কেজি ধরে পাওয়া যায় প্রায় সময়ই।এর কারণ হচ্ছে কৃষিজ পণ্যের দাম তেমন বাড়েনি, এই যে বললাম আলু সেটা আগে যত ছিলো তার থেকে হয়তো দ্বিগুণ হয়েছে এই দশ-পনেরো বছরে।ঠিক তেমনি অন্যান্য কৃষিজ পণ্য দ্বিগুণ হয়েছে মাঠপর্যায়ে।তবে ঐ একি জিনিস ভোক্তার কাছে যখন আসছে তখন তা চারগুণ বা তারও বেশি।
এভাবে হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে মানুষের জীবনধারণের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যের দাম চারগুণ থেকে ছয়গুণ হয়েছে।মানুষের আয়রোজগার কিন্তু এতো বাড়েনি।তাই এখন নিম্নবিত্ত,মধ্যবিত্ত, খেটে খাওয়া মানুষের জীবনধারণ করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে,তাদের জীবনে সংগ্রামতো আগেই ছিলো এখন সেটা আরও প্রচুর বৃদ্ধি পেয়েছে এই আরকি।