গত এক তারিখ থেকে এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে।বাংলাদেশের সব মেডিকেল কলেজগুলোতে একইদিনে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা ক্লাস শুরু করে।আমাদের মেডিকেল কলেজেও ঐদিন "ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম" ছিলো।ওরিয়েন্টেশনে স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় বর্ষ আর তৃতীয় বর্ষের ছেলে-মেয়েরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ছিলো।আমাকেও স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে যোগ দিতে বলা হয়।কিন্তু এসব গণঅনুষ্টান আমার তেমন ভালো লাগে না বিধায় আর নাম দেই নি।জানাকথা,প্রথম বর্ষ আসছে তাই কলেজ যেমনটা সাজানো হয় ছেলে-মেয়েরা তার থেকে বেশি সাজে আর স্বেচ্ছাসেবক যারা কিনা নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের সাহায্য করবে তারা আরও মারাত্মক ধরনের সাজগোছ করে,এমন ঝাঁকঝমকপূর্ণ পরিবেশে যেতে আমার সমস্যা হয়, অনাড়ম্বরভাবে চলিতেই আমার ভালো লাগা।
যেহেতু অনুষ্ঠান তাই মেডিকেলের ক্লাস বন্ধ।ক্লাস বন্ধ তাই অনেকবেলা করে ঘুম থেকে উঠলাম।উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম করছি,এমন সময় মনে পড়লো,আরে আজতো কলেজে বিরাট অনুষ্ঠান।তারপর একজন সহপাঠীকে ফোন দিয়ে খুঁজখবর নিলাম,আমার সহপাঠী অনেকেই স্বেচ্ছাসেবক এই অনুষ্ঠানের, মানে ভলেন্টিয়ার আরকি।আমি দুপুরের দিকে ফোন দিয়েছি ভেবেছিলাম তখন শেষ হয়ে গিয়েছে।কিন্তু ও বললো শুরুই হয় নি।অনুষ্ঠানে নাকি বাংলাদেশ সরকারের এক মন্ত্রী আসবেন,যেহেতু মন্ত্রী আসবেন সেই অনুষ্ঠান তাড়াতাড়ি শুরু হতে পারে এমনটা সম্ভব নয়,বাংলাদেশের মন্ত্রী বলে কথা।বাংলাদেশের কোনো অনুষ্ঠান সময় মতো শুরু হয় বলে আমার জানা নেই।সকাল দশটায় শুরু হওয়ার কথা থাকলে শুরু হবে দুপুর বারোটায় এটাই এখানে নিয়ম।যাইহোক,যাকে ফোন দিয়েছিলাম ও বললো অনুষ্ঠান শুরু হবে দুপুর আড়াইটার দিকে।
একটুপর আম্মা ফোন দিলো,কলেজের অনুষ্ঠানের কথা আম্মাকে বললাম।অনুষ্ঠানের অতিথি হিসাবে একজন আসবে যে কিনা আমাদের গ্রামের।আম্মা বললো,যাতে গিয়ে ওনার সাথে দেখা করি।এই অনুষ্ঠানে যাবো বলে স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার অফার ফিরিয়ে দিলাম,আর এখন আবার ঐখানে যেতে হব!কি আর করা আম্মা বলেছে,তাই যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম।আরেক সহপাঠী শরীফকে সাথে যেতে বললাম।কলেজের ভিতর যেতেই দেখি খুব ঝাঁক ঝমক পূর্ণ অবস্থা।
অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান হচ্ছে।নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখি খুব জোরদার,কারণ ভিতরে মন্ত্রীসাহেব আছেন।আমরা ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলাম,গার্ড যেতে দেয় না।আমরা এই মেডিকেলের স্টুডেন্ট তাও ভিতরে যাওয়া যাবে না,যদি না অনুষ্ঠানে প্রবেশের জন্য যে অনুমতিপত্র বা কার্ড দেওয়া হয়েছে সেটা থাকে ।পরবর্তীতে আমাদের এক বন্ধু যে কিনা স্বেচ্ছাসেবক তার মাধ্যমে ভিতরে প্রবেশ করলাম।তখন অনুষ্ঠান একদম শেষ পর্যায়ে।আর সবার শেষে মন্ত্রী সাহেব ইংরেজিতে বক্তৃতা দিচ্ছেন।প্রতিটি কথায় তিনি সরকারের প্রশংসা করছেন,সামনে বসে আছে সদ্য ভর্তি হওয়া এমবিবিএস শিক্ষার্থী, যারা কিনা ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হয়েছেন। তাদেরকে এইরকম সরকারের কর্মকাণ্ড শুনিয়ে কি লাভ হবে আমি জানি না।
যাইহোক,এরপর মন্ত্রীসাহেবের বক্তৃতা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই এখন খাবার বিতরণের পালা।খাবার শুধু নতুন শিক্ষার্থী তাদের অভিভাবক,স্বেচ্ছাসেবক আর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি এক কথায় যাদের কাছে কার্ড আছে তাদের জন্য।আমি আর শরীফ তাই দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করলাম,যদিও আমরা সবার পিছনের দিকে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।কিন্তু খাবার বিতরণে যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় তার জন্য সবাইকে এক জায়গায় থাকতে বলা হলো,অডিটোরিয়ামের দরজাও বন্ধ করে দেওয়া হলো।কি করবো বুঝতে পারছিলাম না,লজ্জায় পড়ে গেলাম আমি আর শরিফ।তারপর কি আর করা ভিতরে থাকতে হলো,আর এক বড়ভাই জোর করে আমাদের দুইজনকেও খাবারের দুইটা প্যাকেট দিলেন।
এখন বসে খাবার খাওয়ার পালা।সবাই প্যাকেট খুলে দেখলাম গাপুসগুপুস খাচ্ছে।আমি ধীরে ধীরে প্যাকেট খোলে দেখি ওমা এটাতো সেই খাবার যেটা আমি প্রায়ই দোকানে দেখতাম,একদিন দামও জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু দাম এতো বেশি ছিলো যে কেনার সাহস হয়নি।"william Somerset Maugham" এর "The luncheon" এর কথকের মতো,এসব খাবারের দাম এতো বেশি যে আমি ঐসব রেস্টুরেন্টে প্রবেশের সাহসই করতে পারি না।
যাইহোক,খাবারটা দেখে খুশি হলাম।কিন্তু আমি আবার খুব ধীরে ধীরে খাই,আবার মানুষের সামনে খেতেও পারি না ঠিকমতো।তাই ভাবলাম এতো শখের একটা খাবার যেহেতু পেয়েছি বাসায় নিয়ে গিয়ে আরাম করে খাবো।সুতরাং প্যাকেট আবার গুছিয়ে খাবারটা রেখে দিলাম।
এই খাবারটার সাথে আরও কিছু খাবার ছিলো এবং কোমল পানীয়ের রং বেরং এর পাত্র বা "ক্যান" ছিলো।আর আমার "ক্যান" জমানোর শখ আছে,ক্যানকে বিভিন্নভাবে সাজিয়ে রাখি।স্বাভাবিকভাবে মানুষ পানীয় খেয়ে ক্যানগুলো টেবিলে রেখে চলে গেলো।এখন আমার এগুলো আনার ইচ্ছে হলো,তো আমার এক সহপাঠী সালমানকে বলাতে,এক জুনিয়রকে দিয়ে ক্যানগুলো সব দুটো প্যাকেটে ভর্তি করে দিয়ে দিলো।এখন আমার খাবারের প্যাকেট আর খালি ক্যান ভর্তি প্যাকেট দুটো নিয়ে অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে স্পোর্টস রুমে গেলাম, সেখানে গিয়েই শরীফ টেবিল টেনিস খেলা শুরু করে দিলো।
এখন শরীফের খেলা শেষের জন্য অপেক্ষা করছি।আর পাশের টেবিলটাতে আমার তিনটা প্যাকেট রেখেছি।কিছুক্ষণ পর এক বড় ভাই আসলো,এসে আমার কাছে তিনটা প্যাকেট দেখে মজা করে বললো,"ওহ্ তাহলে এই কাহিনি আমরা প্যাকেট পাই না,আর তুই তিনটা প্যাকেট নিয়ে চলে এসছিস"।আমি ভাইকে বলতে পারছিলাম না যে এই প্যাকেটগুলোতে খালি ক্যান।তো ভাই আমার খাবার যেটাতে ছিলো ঐ প্যাকেটটাতেই হাত দিলো।তারপর বললো,"তোর কাছেতো অনেক খাবার,আমি এটা খেলাম"।আমি বললাম,ঠিক আছে ভাই খান,কোনো সমস্যা নেই।আসলে ভাই যেটা খেয়েছে সেটা আমার সেই শখের খাবারটা ছিলো,বাসায় বসে আরাম করে খাবো বলে নিয়ে যাচ্ছিলাম।
যাইহোক,মনে অল্প কষ্ট লেগেছিলো।কিন্তু এটা বলে মেনে নিলাম যে এই খাবার মনে হয় আমার জন্য ছিলো না,ঐ বড় ভাই এর জন্যই ছিলো,তাই ওনি খেয়েছেন।কার রিজিক কোথায় লিখা থাকে কে বলতে পারে!