গ্রামের শতভাগ মানুষ কোনো না কোনো ভাবে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। তাই বলাই যায় শতভাগ মানুষ কৃষক। যারা সরকারি বা বেসরকারি চাকরি করেন তারাও কিন্তু নিজ হাতে চাষ করে ফসল ফলান।একজন শিক্ষক স্কুল থেকে এসে ধান কাটছেন এটা বিরল কোন দৃশ্য নয়। আসলে গ্রামের মানুষ খুব সহজ সরল ।ওরা সব সময় 'স্টেটাস' আর 'স্টেটেজিতে' আটকে থাকে না।ওরা অল্পতে সন্তুষ্ট। খুব বেশি চাওয়া পাওয়া নেই তাদের।
আসলে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করে তাই তারা জানে একটা বীজ থেকে কিভাবে একশতটি ধান উৎপাদন হয়। শহরের লোকেরা টাকা নিয়ে বাজারে যায়, চাল কিনে সেই চাল ধোঁয়ে ভাত রান্না করে খেয়ে নেয়। ভাতের জন্য এর থেকে বেশি কাজ একজন শহরের লোককে করতে হয় না। কিন্তু একজন কৃষক প্রথমে ধান বীজ সংগ্রহ করে। তার পর এই বীজ ভিজিয়ে রাখে দুই থেকে
তিন দিন। সেই ধান পানি থেকে উঠিয়ে একটা পাত্রে রেখে কলা পাতা কিংবা পাটের বস্তা দিয়ে ভালো ভাবে ঢেকে ভারি কোন বস্তু উপরে দিয়ে তিন চার দিন রেখে দিলে অঙ্কুরিত হয়। এরপর বীজ তলা প্রস্তুত করে সেই বীজ বপন করে।তারপর বীজ থেকে চারাগাছ। সেই চারা গাছ গুলো পঁচিশ থেকে ত্রিশ দিন পর উঠিয়ে চাষ উপযোগী জমিতে বপন করে।জমিতে বপন করার পর সাত আট দিন পর পানি দিতে হয়। ধান গাছ একটু বড় হওয়ার পর আগাছা পরিস্কার করতে হয়। সার দিতে হয়। পোকামাকড় যেন না খেতে পারে তার ঔষধ দিতে হয়।এরপর ধান পাকার পর তা কেটে বেঁধে বাড়িতে আনতে হয়। বাড়িতে আনার পর মারাই করে রোদে শুকাতে দেয়। সেই ধান পরিস্কার করে বড় হাঁড়িতে করে সিদ্ধ করে টানা তিন চার দিন রোদে শুকিয়ে মেশিনে চাল উৎপাদন করা হয়। এখানেই শেষ নয় চাল এবং কুঁড়ো তখন মিশে থাকে সে গুলো কুলা (বেতের এক ধরনের পাত্র)জেরে আলাদা করা হয়।তারপর ভাত তৈরি করা হয়। আমরা শহর বাসিরা যে রেডিমেড চাল পেয়ে যায় তা কোনো এক গ্রাম্য বধু বা ঝিয়ের নিরলস পরিশ্রমের ফসল।
এতো গেলো চাল তৈরির গল্প। আমরা শহর বাসিরা যারা ভাত খেলে ক্ষেত হয়ে যায় তারা কি জানেন স্পেকেটি,পাস্তা, নান,বান এসব রং বেরঙের খাবার তৈরির প্রধান উপাদান আটা, ময়দা কিভাবে উৎপাদিত হয়। আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ঝরেনি কিন্তু৷ গম,ভুট্টা, ইক্ষু এসব উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও জটিল। এই গম উৎপাদনের জন্য একজন কৃষককে মাসের পর মাস পরিশ্রম করতে হয়। বীজ বপনের উপযোগী করে জমিতে গম বীজ বপনের পর একটানা পনের থেকে বিশ দিন পাহারা দিতে হয় পাখি যাতে পাখি খেতে না পারে। এরপর আবার ছোট ছোট চাড়াগাছ জন্মানোর পর কিছু উঠিয়ে ফেলে দিতে হয়। তা না হলে ফলন ভালো হবে না। আবার কিছুদিন যাওয়ার পর আগাছা পরিস্কার করতে হয়। গম ক্ষেতে প্রচুর আগাছা হয় তাই এক মৌসুমে তিন বার আগাছা পরিস্কার করতে হয়। ধান চাষের ক্ষেত্রে যেখানে দুই বার আগাছা পরিস্কার করলেই হয়। সার দিতে হয়, ঔষধ দিতে হয়। তারপর গম যখন পেকে যায় তখন গমের শিষ গুলো সুয়ের মতো সূচালো হয়।হাতে পায়ে কাঁটার মতো ফুটে। আবার ধান যেমন সহজে মারাই করা যায় গম তত সহজে মারাই করা যায় না। গম শিষের ভিতর আবৃত থাকে। তাই প্রথমে শিষ গুলো গম গাছ থেকে আলাদা করে রোদে শুকিয়ে লাঠি দিয়ে জুড়ে জুড়ে আঘাত করলে গম বেরিয়ে আসে সেই গম প্রক্রিয়াজাত করেই আমাদের মর্ডান খাবার দাবার তৈরি করা হয়।
এরপর আসা যাক সবজি উৎপাদনের কথা। শীম যা খুবই জনপ্রিয় একটা সবজি। শীম গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের ফল।এই শীম গাছের পাতা গুলো দেখতে মনে হয় খুবই নরম। কিন্তু এতে হাত দিলে কখন কেটে যায় বুঝায় যায় না। কিছুক্ষন পরে শুধু জ্বলতে শুরু করে। কাঁকরোল এতে আবার আরেক ঝামেলা। পরাগায়ন করাতে হয়। পরাগায়ন না করালে ফল হয় না। তাই চাষীরা তাদের বৌ বাচ্চা নিয়ে ফজরের আযানের সাথে সাথে চলে যায় পরাগায়ন করাতে।যারা ফুল কপি চাষ করে তারা মধ্যরাতে চলে যায় কপি কাটতে। দিনের বেলায় নাকি কপি কাটা যাবে না। ফুল কপি শীতকালীন সবজি। আর গ্রামে তখন হারভাঙা শীত। কুয়াশায় চার দিক অন্ধকার। সেই শীতে রাতে ওরা কপি কাটতে চলে যায়।
এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ফল চাষ,মাছ চাষ, গরুছাগল, হাঁস মুরগী পালন সব কটি কাজেই পরিশ্রমের। এসব কাজ গ্রামের কৃষকেরাই করে। সব ধরনের ফসলই জমিতে চাষ করা হয়। গ্রামের ভাষায় যাকে বলে ক্ষেত।আমরা যারা শহরের অতীব ভদ্রলোক তারা গ্রামের লোকদের ক্ষেত বলে গালি দেই।শুধু গ্রামের লোকদের বললে ভুল হবে শহরে বাস করে কিন্তু আমার থাকে ভালো লাগছেনা, তাই তাকে বলে দেই তুই ক্ষেত,গ্রাম্য ভূত। আপনি আলট্রা মর্ডাণ হওয়ার জন্য পা থেকে মাথা পর্যন্ত যা কিছু ব্যবহার করেছেন সবি সেই ক্ষেত আর গ্রাম্যভূতে অবদান। হোক সে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে।
যারা ক্ষেত শব্দটাকে স্ল্যাং হিসেবে ব্যবহার করেন তাদের জন্য আমার ছোট্ট একটি পরামর্শ, আপনারা খাবার হিসেবে প্লাস্টিক গ্রহণ করুন। ক্ষেত খুব খারাপ জিনিস এতে উৎপাদিত ফসল খাওয়া উচিত হবে না। পরামর্শটা দিলাম বটে তবে এখানেও সমস্যা আছে, প্লাস্টিক উৎপাদনে কোনো ভাবে ক্ষেতের ফসল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে নাতো আবার আজকাল?বিবেচনার বিষয়!
বাংলাদেশের আশি শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। আবার আমরা যারা শহরে বাস করি তারাও কোনো না কোনো ভাবে গ্রামের সাথে সম্পৃক্ত। তারপরও আমরা কিভাবে গ্রামের লোকদের গ্রাম্যভূত আর ক্ষেত বলে গালি দিতে পারি আমার জানা নেই।