দুনিয়ার নিয়ম অনুযায়ী কোনো মানুষ যখন কিছু করে তখন তাকে বলা হয় যে,সে সরলপথে চলছে।কোনো একজন একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে,তো সেই প্রতিষ্ঠানের যত নিয়ম আছে,ঐ নিয়ম অনুযায়ী যদি সে সব কাজকর্ম করে তখন তার সুনাম এই হবে যে,লোকটা খুব নিয়মতান্ত্রিক কাজকর্ম করে,সরলপথে চলা লোক।কিন্তু ঐ প্রতিষ্ঠানেরই আরেকজন হয়তো,নিয়মের বাহিরে গিয়ে কাজকর্ম করে,কোনো একটা প্রজেক্টে ফাঁকি দিয়ে কাজ সম্পন্ন করে ফেলে।তখন সেই লোককে বলা হবে যে, সে সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে এখন বাঁকাপথে চলা শুরু করেছে।
দেখা যায় সরকারি অফিসগুলোতে, জনসাধারণ যখন কোনো কাজের জন্য যায়,তখন কর্মকর্তারা সেবা না দিয়ে গড়িমসি করে অথবা উৎকোচ দাবি করে।অথচ তার দায়িত্বই হচ্ছে জনসাধারণের সেবা করা,আর তা করার জন্যই তাকে বেতন দেওয়া হয়।তার সরলপথ এটাই ছিলো যে সে তার দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করবে,জনগণ তার কাছে সেবা নিতে আসলে, না ঘুরিয়ে,হয়রানি না করে তার কাজটা করে দেবে।কিন্তু সে যখন ঐ কাজ করার জন্য ঘুষ নিচ্ছে,আর ঘুষ না পেলে কাজই করছে না,তখন এটাই হচ্ছে তার বাঁকা পথে চলা।
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এই সরলপথ বেপারটা রয়েছে।ভালো শিক্ষার্থীরা দেখা যায়,নিয়মিত ক্লাসে যায়, পড়াশোনা করে।পরীক্ষার সময় নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা দেয়।তাহলে তারাতো সরলপথে আছে।কিন্তু কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী দেখা যায় যারা হয়তো সময়ের পড়া সময়ে পড়েনি,কিন্তু যখন পরীক্ষা আসলো তখন মনে হলো,না আমাকে পাশ করতে হবে।এখন সেতো নিজের মেধা দিয়ে পাশ করতে পারবে না,কারণ সে যখন পড়ার দরকার ছিলো তখন পড়ে নি।তখন সে কি করবে!একটাই উপায় পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বন করা।যদি লিখিত পরীক্ষা হয়,তাহলে হয়তো কারো কাছ থেকে দেখে লিখবে,না হয় নিজের সাথে কিছু 'নকল' নিয়ে যাবে।এইধরনের কোনো না কোনো নিয়মের বাহিরের কিছু করে সে পাশ করে গেলো।তাহলে সেতো বাঁকা পথে পাশ করলো,সরলপথে যেতো পারলো না।
কিছুদিন আগে আমার গ্রামের একজন যে কিনা ডেন্টালে পড়ালেখা করেছে,সে আমাকে ফোন দিলো।ফোন দিয়ে বলছে,সামনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেন্টাল বিভাগে তার একটা চাকরির পরীক্ষা আছে।অবশ্য সে ডেন্টালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পড়ালেখা বিডিএস পাশ নয়,কোনো একটা প্রতিষ্ঠান থেকে কোর্স করেছে।যাইহোক,সে বলছে যে,ঢাকা মেডিকেলে তার পরিচিত লোক আছে।তো সেই লোককে দিয়ে ব্যবস্থা করিয়ে, তার চাকরিটা হয়ে যেতো,কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যতই ক্ষমতা থাকুক না কেনো,লিখিত পরীক্ষা দিয়ে পাশ না করলে চাকরির ব্যবস্থা করা যাবে না।
এখন সে আমাকে বলে যে আমি তার পরীক্ষাটা যাতে দিয়ে দিই।মানে হলে যাবো আমি,কিন্তু নাম বা সবকিছু তার।আমিতো প্রথমে শুনেই অবাক এমনও কি করা যায়।তারপর সে বলছে যে,আমি যদি পরীক্ষা দিয়ে দেই,হলরুমে যে জায়গায় আমি বসবো সে জায়গায় কেউ গার্ড দিতে আসবে না,কোনো তদারকি করবে না এই ব্যবস্থাও সে করে রেখেছে।আমি তাকে সরাসরি নিষেধ না করে বুঝিয়ে বললাম যে আমি এটা করতে পারবো না।পরে সে আমাকে অর্থের লোভ দেখাতে লাগলো,পঞ্চাশ হাজার টাকা অফার করলো।আমি তখন তাকে অন্যভাবে বুঝালাম যে,এই চাকরির পরীক্ষায় যেসব লিখতে হবে সেসব থেকে এখন আমি অনেক দূরে,আমি এমবিবিএস পড়ি আর এই চাকরির পরীক্ষায় আসবে সাধারণ জ্ঞান,বাংলা,গণিত এসব।তারপরও সে জোরাজোরি করছে,আমি এই বলে তখন ফোন রেখে দিলাম যে অন্য কাউকে দেখো পারে কিনা,দুঃখিত আমি পারবো না।
পরবর্তীতে আমি আর তার ফোন ধরি নি।হয়তো সে অন্য কাউকে দিয়ে এই কাজ করিয়ে নিয়েছে।
এই যে আমার গ্রামের ছেলেটা এইভাবে দুর্নীতি করে পরীক্ষা দিয়ে হয়তো চাকরিও পেয়ে যাবে।আর তার এই চাকরিটার শুরু ছিলো বাঁকাপথে।সরলপথের পথিক সে নয়।
ইসলাম ধর্মে একটা টার্ম আছে "সিরাতুল মুস্তাকিম" যার অর্থ হচ্ছে,সাফল্যের সরলপথ।এখানেও সেই সরলপথের কথা বলা হয়েছে উপরের উদাহরণগুলোতে যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সরলপথ,বাঁকাপথের শাব্দিক অর্থ চিন্তা করলে হয়তো মনে হবে একটা হয়তো সোজা রাস্তা,আরেকটা হয়তো আঁকাবাঁকা রাস্তা।যেমন,আমাদের গ্রামের বাজার থেকে আমাদের বাড়ি যাওয়ার স্বাভাবিক যে রাস্তা যেটা দিয়ে সবাই যাতায়াত করে,আমি কখনও সেটা দিয়ে যায় না।কারণ এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে স্কুল পরে,রাস্তাঘাটে অনেক পরিচিত মানুষ থাকে তাই আমি এই রাস্তা দিয়ে যায় না।আমি একটু 'কনজার্ভেটিভ',বেশিই লজ্জা পায়,বারবার মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করতে হবে বলে সে রাস্তা দিয়ে আমি যায় না।আমাদের বাড়ি থেকে উপজেলা সদরে যাওয়ার সময়ও আমি এমন একটা রাস্তা বেঁচে নিয়েছি যেটা কিনা অন্য কেউ ব্যবহার করে না।তো কয়েকজন এই বেপারটা লক্ষ্য করে আমাকে বলেছিলো,সহজ-সরল পথ থাকতে এই বাঁকাপথে কেনো চলো?
তাদের বলা ঐ বাঁকাপথ আর আমার উপরে বলা বাঁকাপথ এক নয় সেটা বুঝাই যাচ্ছে।আমান বাঁকাপথে যাওয়াতে কারো কোনো ক্ষতি হয় না।কিন্তু মানুষ কাজ কর্ম যখন বাঁকাপথে করে তখন সেটা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সে যাইহোক,আমি পুরো দুনিয়ার সব কাজকর্মকে এই দুটি ভাগে বিভক্ত করি,সরলপথ,বাঁকাপথ।
আমাদের সবারই উচিত সরলপথে চলা,বাঁকাপথে যাওয়া উচিত নয়।সরলপথে চললেই আমাদের সমাজ,রাষ্ট্র,পৃথিবী শান্তিময় হবে।