দিন যত যাচ্ছে মানুষ আধুনিক হচ্ছে।আধুনিক কথাটার শাব্দিক অর্থতো বর্তমান সময়।কিন্তু ভাবার্থ এই যে উন্নত হওয়া।কিন্তু উন্নত হচ্ছে মনে হলেও আসলেই কি উন্নত হচ্ছে?
অনেকক্ষেত্রে এর বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করা যায়।মানুষের মন-মানসিকতা,নৈতিকতা এসব দিক দিয়ে অনেকক্ষেত্রে মানুষ আগের থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে।
মেজুর বাসায় যখনই যায়,ওর বাসার বারান্দায় গেলে অন্য আরেকটা বাসার জানালা মুখোমুখি,প্রথম দিকে একদিন অজান্তে সেই জানালা দিয়ে ভিতরে চোখ পড়ে,তো জানালার সাথেই একটা টেবিল,সেই টেবিলে একটা কম্পিউটার।আর কম্পিউটার টার সামনে একটা নয়-দশ বছরের ছেলে বসে আছে।সে খুব মন দিয়ে কি জানি একটা গুলাগুলির গেইম খেলছিলো সেদিন।এরপর থেকে আমি যখনই মেজুর বাসায় যায় গত এক বছর যাবৎ,যখনই বারান্দায় যায় আর তার দিকে আমার চোখ পরে,সেই একি দৃশ্য।সে কম্পিউটারের সামনে বসে আছে।কম্পিউটারের স্ক্রিনটাও দেখা যায়।যদিও এটা তার প্রাইভেসির বিষয়।তাই আমি ইচ্ছা করে তেমন একটা লক্ষ্য করি না।তবে দশ-এগারো বছরের একটা বাচ্চা ছেলের কি কোনো প্রাইভেসি আছে!নাকি থাকা উচিত!আইন অনুযায়ীও একজন মানুষের প্রাইভেসির বেপারটা শুরু হয় আটারো বছর থেকে।তারপরও আমি তার কোনো অভিভাবক না,থাকে দেখার দায়িত্ব আমার না।কিন্তু তাকে যখনই দেখি তখনই এই কম্পিউটারের সামনে।ভাতের তালা নিয়ে খাওয়ার সময়ও তার বাম হাতে মাউস।আর এট্যাক এট্যাক বলে চিল্লাচ্ছে।
এটা অতি আশ্চর্যের বিষয় যে,গত একবছরে বহুবার আমি মেজুর বাসায় গিয়েছি,বহুবার তার বারান্দায় গিয়েছি,সকাল থেকে রাতের দুই-তিনটা পর্যন্ত,এমন একবারও হয় নাই যে তাকে কম্পিউটারের সামনে আমি দেখিনি।কম্পিউটারের সামনে থাকা খারাপ কিছু না,উন্নত বিশ্বের অনেকে এই বয়সে বড় বড় বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করছে,অনেক কিছু আবিষ্কার করছে এই কম্পিউটারের মাধ্যমে।কিন্তু সে সবসময় এন্টারটেইনমেন্ট রিলেটেড বিষয় নিয়ে পরে থাকে।আমার কাছে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক যে বিষয়টা মনে হলো সে হয়তো ফেইসবুক চালাচ্ছে আর উরাধুরা মেয়েদের ছবিতে লাভ রিয়েক্ট দিচ্ছে,আর মুচকি মুচকি হাসছে।আর আমি তখন ভাবছি,আসলে তার হয়তো এখন বয়ঃসন্ধি শুরু হয় নি।সে এসবের কি বুঝে।বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তারতো এখনও কোনো আকর্ষণ থাকার কথা না।হ্যাঁ একটা হতে পারে,বন্ধু ভাবতে পারে সে হিসাবে এসব করতে পারে,কিন্তু সেক্ষেত্রে তো ভাবভঙ্গি এমন হয় না।আমার মনে হয়েছিলো,ছেলেটার অভিভাবককে তার বাচ্চার এই বেপারগুলো জানানো উচিত।
এইরকম তার মতো যাদের হাতে স্মার্টফোন রয়েছে বা কম্পিউটার আর ইন্টারনেট কানেকশন, তারা বয়ঃসন্ধী শুরুর আগেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হয়ে সেইদিকে ঝুঁকে পড়ে।এটাতো দেখি বিজ্ঞানেরও যুক্তির বাহিরে।আধুনিক এসব বাচ্চারা যেসব শব্দ ব্যবহার করে,আটারো বছর হওয়ার পর হয়তো সেগুলোকে আমরা স্বাভাবিকভাবে নিতে শিখেছি।
একটা ঘটনা মনে পড়লে এখনও আমার খুব হাসি পায়,আর আধুনিক বাচ্চারা আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য, আমি এটাকে সবসময় সব মানুষের কাছে একটা উদাহরণ হিসাবে দিয়ে থাকি।অবশ্য আমাদের জেনারেশনও আধুনিক,তবে আমাদের জেনারেশন এর ছেলেমেয়েরা আধুনিক,মানে যুবক-যুবতীরা আধুনিক কিন্তু বাচ্চা অবস্থায় তারা তেমন আধুনিক ছিলো না।
যাইহোক,তখন আমার বয়স তের হবে,অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি।আমার গ্রামের পাশের বাড়ির কাকা বিয়ে করেন ঐসময়।বিয়ে হওয়ার দুই-তিন মাস পর শুনলাম,কাকীর বাচ্চা হবে।তখন আমি যা ভেবেছি এই ব্যাপারে তা আমার জীবনের জন্য ইতিহাস।আমি ভাবলাম,যে সৃষ্টিকর্তা কতই না মহান আর সর্ব দ্রষ্টা,তিনি সেই উপরে বসে সবকিছু দেখছেন,আর যখনই দেখলেন যে আমার কাকা বিয়ে করেছেন,তখনই যে কাকী আসলো ঘরে ওনার পেটে বাচ্চা দিয়ে দিলেন।একটা তের বছরের ছেলে এমন কিছু ভাবতে পারে তা এখন বললে অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবে না।এখনকার ছয়-সাত বছরের বাচ্চাকাচ্চাও এই বাচ্চা হওয়ার মেকানিজমগুলো বুঝে।যদিও আমার ভাবনার প্রথম অংশটুকু ভুল ছিলো না,সে বিশ্বাস এখনও আছে।যাহোক পরবর্তীতে অষ্টম শ্রেণির শারীরিক শিক্ষা বই এ অল্পস্বল্প বিজ্ঞান ছিলো,সেখান থেকে কিছু ধারণা পাই,আর পরবর্তী শ্রেণীগুলোতে এসব বিস্তারিত জানতে পারি।আর এখনতো ডাক্তারি পড়ি,এসব নিয়েই আমাদের কারবার।
অনেকের মত এটা হবে যে, আমার সেই ভাবনাটা ছিলো আমার অজ্ঞতা।আর এটা পজিটিভ কিছু ছিলো না।কারণ বাচ্চাদের সব বিষয়েই জানা উচিত,এতে তারা পরবর্তী জীবন সহজভাবে কাটাতে পারবে।তবে এই মতটা তেমন যুক্তিসঙ্গত না,কারণ সবকিছু জানার একটা বয়সের লিমিট থাকা উচিত,একটা আট-নয় বছরের বাচ্চা,যে নিজেই কিনা বাচ্চা,সে বাচ্চা হওয়ার মেকানিজম জেনে কি করবে!
এভাবেই অনেক কিছু আধুনিক হচ্ছে, মানুষের মন নাকি উন্মুক্ত হচ্ছে,উদার হচ্ছে,সব দিক দিয়ে স্বাধীন হচ্ছে।তবে আগের মানুষের কিছু "রেস্ট্রিকশন" সত্যিই নৈতিকতার দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলো,এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।