চলাফেরার স্বাধীনতা বনাম ইভটিজিং

Words
664
Reading
3 min
Listen
Play
4y

বাংলাদেশ সংবিধানের ছত্রিশ নাম্বার অনুচ্ছেদে বলা আছে "জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ- সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে"। এর মানে বাংলাদেশের যেকোনো রাস্তায় যেকোনো সময় যেকোনো মানুষ নির্দ্বিধায় চলাফেরা করার অধিকার রাখে।সংবিধানতো মানুষকে অধিকার দিয়েই দায়মুক্ত হয়ে গেলো।কিন্তু মানুষজন কি সত্যিই রাস্তাঘাটে সবসময় নিরাপদে,ভয়হীন মনে চলাফেরা করতে পারে?না পারে না।এতে অবশ্য রাষ্ট্রের কোনো দোষ নেই,নাগরিকই এর জন্য দায়ী।এক নাগরিক অন্য নাগরিকের চলাফেরার রাস্তায় কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়।এই কাঁটার মধ্যে এক ভয়ংকর রকমের বিষাক্ত কাঁটা হচ্ছে "ইভটিজিং"।ইভটিজিং শব্দটার ইভ মানে নারী,আর টিজিং মানেতো উত্যক্ত করা।তার মানে ইভটিজিং মানে নারীদের উত্যক্ত করা।রাস্তাঘাটে,অলিতেগলিতে কোনো ছেলে যদি কোনো মেয়েকে দেখে বাজে মন্তব্য করে,শিষ বাজায় বা যেকোনো ধরনের বিরক্ত করে এটাকে ইভটিজিং বলে।আর এটা আমাদের দেশের বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলের একটা বিরাট সমস্যা,শহরে এমন ঘটনা কম ঘটে।

ছুটিতে গ্রামে গেলে রাস্তায় বের হলে এই বেপারটা একদম অতি সাধারণ বিষয় হিসাবে দেখা যায়।বাড়িতে যাওয়ার পর,স্বাভাবিকভাবে ছোটো বেলার কিছু বন্ধুদের সাথে মাঝে মধ্যেই বের হতাম আগে।হতাম বলেছি কারণ,এখন গ্রামে গেলে আর বের হওয়া হয় না,সমবয়সী সবাই দেশের বাহিরে চলে গিয়েছে।যাইহোক,স্কুলের দিকে যখন যেতাম তখন এটা একটা সাধারণ দৃশ্য যে একেকটা ছেলে একেকজন মেয়েকে লক্ষ্য করে ছুটে বেড়াচ্ছে।তার পিছু পিছু যাচ্ছে।আপত্তিকর কথাবার্তা বলছে,মেয়েটা চুপচাপ হেঁটে চলে যাচ্ছে।আর যেসব মেয়েরা একটু সাহসী তারা প্রতিবাদ করছে,বকা দিচ্ছে।আর গালি শুনে ছেলেরা আরও জেনো বেশি মজা পাচ্ছে।যেসব মেয়েরা প্রতিবাদ করে,গালি দেয় তাদের পিছনে আরও বেশি যায় ঐ সব ছেলেরা।আমি যাদের সাথে যেতাম তারাও এমন করা শুরু করতো,আমি বাহিরের মানুষ,কয়েকদিনের জন্য তাদের সাথে চলবো,তাই আমার সামনে তেমন করতো না,কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম তারাও এমন করে অন্য সময়।

দিন দিন পৃথিবী সভ্য হচ্ছে তা ঠিক।কিন্তু মেয়েদেরকে রাস্তাঘাটে এভাবে উত্যক্ত করার বেপারটা দেখলাম বৃদ্ধি পেয়ছে,আর অন্য কোনো জায়গার কথা জানি না অন্তত আমাদের গ্রামে।কিশোর বয়সের ছেলেরাই সাধারনত এমন করে থাকে।আর এখনকার গ্রামের বেশিরভাগ ছেলেরা স্কুলে ভর্তিতো হয় ঠিক,কিন্তু তেমন পড়াশোনা করে না,কোনোরকমে পাশ করে।আর অপেক্ষায় থাকে কখন বয়সটা আটারো হবে আর দেশের বাহিরে চলে যাবে শ্রমিক ভিসায়।তাই পড়ালেখার প্রতি তেমন ঝোঁক নাই।তাই তারা রাস্তাঘাটে বখাটের মতো ঘুরে বেড়ায় আর এসব কান্ডকারখানা করে থাকে।

এতোক্ষণ পর্যন্ততো দেখা গেলো যে গ্রামের মেয়েরা খুব বিপদে আছে।তারা রাস্তাঘাটে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না।সংবিধানে যে চলাফেরার স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে তা লঙ্ঘন হচ্ছে।কিন্তু এই পরিস্থিতি যখন কোনো গ্রামের ছেলের সামনে তুলে ধরে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তখন সে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এমন বলে যে,তারা যে মেয়েদের এভাবে উত্যক্ত করে এতে নাকি আধুনিকা কোনো মেয়ে বিরক্তবোধ করে না,তারা নাকি এতে খুশি হয়,আর মেয়েদের খুশি করার জন্যই তারা এমন করে।আজকালকার স্কুলের কোনো মেয়ে নাকি তত বেশি "ফেমাস" যার পিছনে যত বেশি ছেলে ঘুরে।এগুলো ঐসব ছেলেদের বক্তব্য যারা ইভটিজিং করে থাকে।

আমি জানি না ইভটিজিং এর স্বীকার কোনো মেয়ে আসলে বিরক্ত হয় নাকি খুশি হয়, তবে আমি নিজের সাথে ঘটা একটা ছোট ঘটনা ধারা এই অনুভূতিটা বুঝতে পারি।তখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি।আমি ছোট থেকেই খুব লাজুক,আর শান্তশিষ্ট স্বভাবের।একদিন স্কুলে যাচ্ছি।ছোট সংকীর্ণ একটা গলি পার হচ্ছি।গলির শেষ মাথা দিয়ে একটা মেয়েদের দল ঢুকলো।আমাদের স্কুলে যে শিফটে আমি পড়তাম সেই শিফটে কোনো মেয়ে ছিলো না।তাই মেয়েদের সাথে কখনও কোনো যোগাযোগ বা কথাবার্তা হতো না,আর আমি এমনিতেও কিছু বন্ধু ব্যাতিত কারো সাথে তেমন কথাবার্তা বলতাম না ছেলে হোক বা মেয়ে।তো যাইহোক,এতোগুলো মেয়ে গলিতে ঢুকছে এটা দেখেই আমি ইতস্ততবোধ করলাম।গলির দেয়ালের একপাশে চেপে নিচের দিকে তাকিয়ে হেঁটে সামনে আগাচ্ছি।মেয়েগুলো হয়তো আমাকে দেখে বুঝতে পারছিলো যে এই ছেলে আমাদের কে দেখে অস্বচ্ছন্দ বোধ করছে,তো তারা বোধহয় তখনি আমার সাথে মজা করার পরিকল্পনা করলো।যখন গলির মধ্যে তাদেরকে আমি ক্রস করছিলাম নিচের দিকে তাকিয়ে, তখন তাদের মধ্যে একজন বলে উঠলো, "ভাইয়া তোমার ঘড়িতে কয়টা বাজে"। অথচ আমার হাতে কোন ঘড়ি ছিলো না।তারপর সবাই হুহু করে হেসে দিলো।আবার আরেকজন বলছে,"বেচারা লজ্জা পাইছে আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না"। এইভাবে একেকজন একেক কথা বলতে লাগলো।আমার তখন এতো খারাপ লাগলো যে আমি দ্রুত হেঁটে চলে গেলাম।তারা কি বলছে না শুনার ভঙ্গিতে।।আমার মনে হচ্ছিল আমি চারপাশে সব অন্ধকার দেখছি,কানে কিছু শুনতে পাচ্ছি না ভনভন করছে।ঐদিন সারাদিন আমার খুব খারাপ লাগলো, বেপারটা আমারকাছে খুব অপমানজনক বোধ হলো।সেই অনুভূতির কথা আজও আমার মনে পড়ে।

সেদিনের এই ঘটনাতে বুঝতে পারি,কোনো মেয়েকে যখন রাস্তাঘাটে ছেলেরা বাজে মন্তব্য করে তখন মেয়েদের কেমন খারাপ লাগে!যদিও আমার ঘটনাটাকে ইভটিজিং বলা যাবে না,কারণ আমি ছেলে মানুষ আর ইভটিজিং এর ইভ মানে নারী...

1_ZRStsuBwm5EDHuM9tAZNPg.jpeg