ঢাকা শহরে সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ বাস করে।যার কারণে নতুন কারো সাথে পরিচিত হলেই প্রথমে জিজ্ঞেস করে আপনি কোন জেলার?যখন কিশোরগঞ্জ জেলাতে থাকি তখন পুরো কিশোরগঞ্জ ঘুরে হাজারও নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হলেও কেউ জিজ্ঞেস করবে না যে আপনি কোন জেলার।কিন্তু ঢাকাতে যেহেতু পুরো বাংলাদেশের চৌষট্টি জেলার লোকই আছে তাই এটাই স্বাভাবিক যে মানুষ আগে জানতে চাইবে আপনি কোন জেলার।জানতে চাওয়ার পর যখন বলি,কিশোরগঞ্জ জেলার।এখন তিনি অন্য জেলার,তাই কিশোরগঞ্জ জেলাকেতো আর চিনেন না, তাই পরবর্তী প্রশ্ন এটা করে যে,ঢাকা থেকে কতদূর।এখন ঢাকা থেকে কতদূর, এর উত্তর একটা হতে পারে দুরত্বের হিসাবে।সেটার হিসাব দিতে গেলে কিলোমিটার বা মাইলে দিতে হবে।কিন্তু এই হিসাব দিলে মানুষ সন্তুষ্ট হয় না বা বুঝতে পারে না।আরেক ভাবে হিসাবটা দেওয়া যায় আর তা হলো,স্বাভাবিকভাবে কিশোরগঞ্জ যেতে কতো সময় লাগে।
স্বাভাবিকভাবে বলতে এখনতো আর কেউ পায়ে হেঁটে এই একশো কিলো রাস্তা পারি দিবে না।বেশিরভাগ মানুষ বাসে করেই যাতায়াত করে।
সুতরাং কিশোরগঞ্জ কতদূরে,তার হিসাব সবসময় এইভাবে দেই যে,ঢাকা থেকে বাড়িতে যেতে সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা সময় লাগে যদি জ্যাম না থাকে,আর যদি জ্যাম থাকে তাহলে ঐ পাঁচ ঘন্টার মতো সময় লাগে।তখন প্রশ্নকারীর মুখ দেখে বুঝা যায়,সে বুঝে গেছে কিশোরগঞ্জ কতটুকু দূরে।বলতে থাকে,আচ্ছা আচ্ছা তাহলেতো বেশি দূরে না।এইভাবে ছোট থেকে বহু মানুষকে এই জবাব দিয়েছি কিন্তু আজকে জবাবটা পাল্টে গেলো।
ছোট থেকে কিশোরগঞ্জ টু ঢাকা যাতায়াত করেছি শুধুমাত্র বাস দিয়ে।সেই প্রথম থেকে এই পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ টু ঢাকা যে বাস চলে সেই বাসের নাম ''অনন্যা''।আমার খেয়ালে বাড়িতে যাবো মানেই অনন্যা বাস।আর অন্য কোনো যানবাহন দিয়ে যাওয়া-আসা করা যায়, এটা অভিজ্ঞতারতো বাহিরেই,চিন্তারও বাহিরে।শুনেছি ট্রেন দিয়ে যাওয়া যায়।কিন্তু কখনও যাওয়া হয়ে উঠেনি।কারণ আমাদের বাড়ি যে জায়গায় সে জায়গা থেকে রেল স্টেশনে যেতে যে সময় লাগবে, সে সময়ে ঢাকার অর্ধেক পথ চলে আসা যাবে।তাই রেলে আসবো এই সাহস কখনও করে উঠতে পারি নি।তাই বাসে ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়ার সময়টাকেই "প্রমাণ" সময় হিসেবে ধরে নিয়েছি।আর বাসে কখনওই চার ঘন্টার কম সময়ে যাওয়া যায় না।বাস বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড় হয়।যাত্রী উঠা নামা করে।এভাবে জ্যাম থাকুক আর নাই থাকুক,সময় চার ঘন্টার কাছাকাছি লেগেই যায়।
ঈদের ছুটি শেষ হতে আরও কয়েকদিন বাকি আছে।এখনই বাড়ি থেকে আসার কোনো পরিকল্পনা ছিলো না।বাড়িতে গেলে ছুটি যেদিন শেষ হয় তার একদিন আগে কখনও আসি না।কিন্তু বোন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে নিয়ে চলে আসতে হয়।আর যেহেতু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে,তাই তাকে নিয়ে বাসে করে আসা সম্ভব নয়।মাইক্রোবাস ভাড়া করতে হলো।বাংলাদেশে যেগুলো "প্রাইভেট কার" নামে পরিচিত।যাইহোক,মাইক্রোবাস আমাদের বাড়ি থেকে রওনা দিয়েছে ঠিক সাতটার সময়।আর ঢাকা এসে আমাদের ঠিকানায় পৌঁছে গিয়েছে সাড়ে আটটার সময়।অর্থাৎ মাত্র দেড় ঘন্টার মধ্যে চলে আসা গেলো।বেপারটা হচ্ছে ঈদের ছুটি শেষ না হওয়াতে রাস্তাঘাট ফাঁকা তার উপর আবার সকাল বেলা,কমবয়সী গাড়ি চালক।তাই যতটুকু সম্ভব তাড়াতাড়ি সে চলে এসেছে।
আমি ঢাকার খিলক্ষেত থাকি।এয়ারপোর্টে আসার পর আমি ভাবছি যে এতো দ্রুত চলে আসলাম।আমাদের বাড়ি ঢাকা থেকে এতো কাছে যে মাত্র দেড় ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে চলে আসলাম।অথচ যখন ছুটি হয় তখন বাড়ি যাবো বলে মনের মধ্যে আনন্দ দেখা দেয়,কিন্তু এই চার-পাঁচ ঘন্টা সময় বাসে বসে থাকতে হবে এটা ভাবলে মনের আনন্দ উবে যায়।আমার দিদি সদরঘাটে থাকে।খিলক্ষেত থেকে সদরঘাট কখনওই দেড় ঘন্টার কম সময়ে যেতে পারিনি।আর আজ বাড়ি থেকে মাত্র দেড় ঘন্টায় চলে আসলাম।এটাকে আমার একধরনের দুরত্বের আপেক্ষিকতা বলে মনে হচ্ছিল।ঢাকা থেকে বাড়িকে খুব কাছে মনে হচ্ছে।আজকের পর থেকে সেই চিরাচরিত প্রশ্নটি মানুষ যখন করবে যে,কিশোরগঞ্জে তোমাদের বাড়িতে যেতে কতক্ষণ সময় লাগে বা কিশোরগঞ্জ কতদূরে।আমি তখন বলবো,আরে গাড়িতে যেতে মাত্র দেড় ঘন্টা সময় লাগে!
কিন্তু দুঃখের কথা এই যে,এই পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা যানজট আমাদের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করে দিচ্ছে।ঢাকা শহরের মানুষের 'জীবনের সময়ের ব্যয়' নিয়ে গবেষণা করলে দেখা যেতো, তাদের জীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয়ে যায় গাড়িতে বসে ঘড়ির কাটার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে করতে।