এই ছোট্ট জীবনে আমি অনেক কিছুই দেখেছি কিন্তু সে বর্ণনা করার মত এত সুন্দর ভাষা আমার হয়তো জানা নেই।শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার "শ্রীকান্ত" উপন্যাসে বলেছিলেন,যার পা দুটো আছে সেই ভ্রমণ করতে পারে,কিন্তু হাত দুটো থাকলেইতো আর লিখা যায় না,সে যে ভারী শক্ত।লিখা আসলেই শক্ত কাজ।
তাও মাঝে মাঝে লিখতে মন চায়, মনের ভাব প্রকাশ করতে মন চায় তাই কখনো কখনো ডাইরি কলম হাতে নিয়ে লিখতে বসে যায়। কি লিখলাম বা কেন লিখলাম তা নিয়ে আমার ভাবার কিছু নেই। ভালো লাগে তাই লিখি এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।
আজ যখন জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম,ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়তে লাগলো। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে পুকুর।পুকুরপাড়ের দুইপাশে ফসলি মাঠ।মাঠের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা রাস্তা। আমাদের পুকুর পাড় থেকে তাকালে দূরের বাড়ি গুলো বনাঞ্চলের মতো লাগত। আসলে গ্রামেতো আর শহরের মতো উঁচু উঁচু দালান কোঠা নেই। এখানকার কাঁচা পাকা সব বাড়িই এক তালা। বাড়ি গুলো গাছ পালাতে ভরপুর থাকে তাই দূর থেকে শুধু গাছপালাই দেখা যায়।পুকুর থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে মনে হতো সেই দূরের গাছপালার পিছনে আকাশ মিশে গেছে। তাই আমি ভাবতাম সেটা অনেক দূর এবং সত্যিই এটা আকাশের শেষ সীমানা। আবার ছোট থেকে সুন্দরবন নিয়ে অনেক গল্প শুনতাম। তাই আমি মনে করতাম এটাই সুন্দরবন।আজব সব ভাবনা আমার মাঝে ভীড় করতো।এখন আমার শোবার ঘর থেকে তাকালে একি রকম লাগে। পার্থক্য শুধু মাঝে মাঝে আকাশ ছোঁয়া কিছু বিল্ডিং মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। জীবন কত বিচিত্র। কোথায় ছিলাম আর কোথায় এলাম।
রোদ্রোজ্জ্বল আকাশে যখন মেঘ করে তখন স্তরে স্তরে আলাদা হয়ে যাওয়া মেঘগুলো দেখতে প্রাণী,গাছ বা ঘরবাড়ির মতো দেখায়।ছোট বেলায় আমরা যখন মাঠে খেলা করতাম,তখন সেই মেঘগুলোর আকৃতিকে বন্ধুদের মাঝে ভাগাভাগি হতো।এই ভাগাভাগি করতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে কতো যে ঝগড়াঝাটি হতো তার কোন হিসাব নেই।এখন যদিও বুঝতে পারি তাও আমার আকার গুলো গরু ছাগলের মতো লাগে।জানলা দিয়ে এগুলো দেখে প্রায়ই আমি বলে ওঠি ঐযে গরু।
রাতের আকাশ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তাই মাঝে মাঝে গভীর রাতে জানলার গ্রীল ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি।শহরের আকাশে তারা নেই।প্রথম যখন শহরে এলাম আমি ভাবলাম শহর আর গ্রামের মাঝে এটা একটা পার্থক্য। তাই বাড়িতে গিয়েও বলে ছিলাম শহরের আকাশে তারা নেই। এর অনেক পর আমি জেনেছি দিনের বেলায় যেমন সূর্যের আলোর জন্য তারা দেখা যায় না ঠিক তেমনি বিদ্যুতের আলোর ঝলকানির জন্য রাতের বেলাও শহরে তারা দেখা যায় না।
শহরে থাকার পর থেকে, আরেকটা বিষয় খেয়াল করে ভেবে দেখি যে,শহরে থাকা অবস্থায় কোনো দিন সূর্য দেখা হয় না।শুধু দিনের আলো,আর রাতের মৃদু অন্ধকার দেখা যায়,তবে এর পার্থক্যসৃষ্টিকারী সূর্যকে কখনও দেখা হয় না।এটাকি শুধু আমার ক্ষেত্রে! নাকি সবার ক্ষেত্রেই এমন জানি না।তবে গ্রামে থাকলে যত কাজই থাকুক বা যেখানেই থাকি না কেনো,সূর্য একবার চোখে পড়বেই।
করোনাতে যে সময়টা গ্রামে ছিলাম,সেই সময়টাতে আমার মোবাইল ফোনের ফটো গ্যালারির বেশিরভাগ অংশজুড়ে শুধু চাঁদের ছবি ছিলো,চাঁদনি রাতের ছবি।ফোনের ক্যামেরা তেমন ভালো না,চাঁদকে চাঁদ হিসাবে তেমন বুঝা যায় না,তারপরও ছবি তুলে রাখতাম।গ্রামের মেঠোপথে চাঁদের দিকে তাকিয়ে অযথা গভীর রাত পর্যন্ত একা একা কতো যে বসে থেকেছি!বসে থেকে এলোমেলে চিন্তা করতাম।চাঁদের দিকে তাকিয়ে চিন্তা-ভাবনার জগৎ প্রসারিত হয়।এটা আমার মতামত।তবে আরও অনেকে সেটা বলেছে,যেমন গ্রামের যেসব ছেলেরা নেশা করে তাদের কাছ থেকে শুনেছি,তারা নাকি চাঁদনি রাতে নেশা করে,চাঁদের দিকে তাকিয়ে নেশা নাকি আরও ভালো হয়,চাঁদের সাথে তারা নাকি কথা বলতে পারে।
আমি হয়তো চাঁদের সাথে কথা বলতে পারি না,তবে এটা অনুভব করতে পারি চাঁদের সাথে কিরকম না জানি একটা যোগাযোগ আছে মানবহৃদয়ের।সত্যিই আছে নাকি! নাকি হুজুগে মন চাঁদের প্রতি আসক্ত হয়ে গেছে তাও জানি না।
হুজুগে হোক বা বুঝেশুনেই হোক একটা বেপার আমি নিশ্চিত, আমার মগজ কখনও অলস থাকে না, ঘুমানোর আগ পর্যন্ত,কি না কি চিন্তা-ভাবনা করতেই থাকে,মাঝেমধ্যে হয়তোবা কোনো দরকারি বিষয়, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আজীব,উদ্ভট চিন্তা-ভাবনাতে ব্যস্ত থাকে এই অকালকুষ্মাণ্ড মগজ।এখানে আরেকটা উদ্ভট কর্ম করি আমি, একবার একটা ভাবনা মনের মধ্যে শুরু হলে সেটার মধ্যে কোনো বিরতি দিতে হলে,মানে কোনো দরকারি কাজে ভাবনাটা তখন ভাবতে না পারলে, যাতে বিরতির পর দ্বিতীয়বার ভাবনার সময় ঐ জায়গা থেকে আবার ভাবতে পারি তাই ভাবনার বিষয়টা কোথাও নোট করে রাখি,মাঝেমধ্যে কোনো কাগজে লিখি বা এখন মোবাইল ফোনের কোনো একটা ফাইলে লিখে রাখি,এই ফাইলটা নাম আবার "অকালকুষ্মাণ্ডের আকাশকুসুম চিন্তা-ভাবনা"।মানুষজন ইংরেজি সিরিজে একটার পর একটা "পর্ব" দেখে।আর আমি ভাবনার "পর্ব" তৈরি করি নিত্যনতুন।সবগুলো পর্ব মিলে একটা ভাবনার সিরিজ হয়।এভাবে কতোযে হাজার সিরিজ সৃষ্টি হয়েছে,আর হচ্ছে তার অন্ত নেই,উপরওয়ালা বিনে কেউ জানে না।