জীবন ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায় এটা আমরা সবাই জানি।এই বদলটা যখন সুখকর হয় তখন সেটা আমরা খেয়াল করি না।সুখের ভেলায় ভেসে ভেসে দিন যাপন করতে থাকি।এই সুখ খুব অদ্ভুত একটা জিনিস যার পিছনে আমরা সবাই ছুটে চলি।কিন্তু সুখ সবাইকে ধরা দেয় না।কারও কারও কাছে সুখ এ যে মরিচীকা।সারাজীবন সুখের হাতছানি দেখে দেখে কেটে যায়।কখনও যদি দেখা দেয়ও,তাও বিদ্যুৎ গতিতে আবার হারিয়ে যায়।তাই আমার বড় ফুফু একটা প্রবাদ বলতেন,
"সুখ আসে তড়িঘড়ি তড়িৎ চলে যায়,
দুঃখ আসে সমারোহে যেতে নাহি চায়।"
এটা কার কথা জানি না,বা আদৌ প্রবাদ বাক্য কিনা তাও জানি না,কারণ আর কারো মুখে কখনও শুনিনি,শুধু আমার বড় ফুফুকে বলতে শুনেছি।
এ কথাটা আজ আমার খুব মনে পড়ছে,কারণ আজ আমাদের গ্রামের পারুলের একটা খবর শুনালাম।পারুল আমাদের প্রতিবেশী,ওরা ছয় ভাইবোন।পারুল সবার বড়।বাড়ির ভিটা ছাড়া আর তাদের কোনো জমিজমা নেই।বাবা দিনমুজুরের কাজ করে।যখন যে কাজ পায় তাই করে।তার উপর দশ জনের পরিবার।মা-বাবা,দাদা-দাদি আর ছয় ভাইবোন।অভাব লেগেই থাকে।কোনোদিন দুই বেলাতো কোনোদিন এক বেলা কেয়ে কাটে ওদের দিন।পারুলের বয়স যখন তের বছর তখন ওর বাবা ওকে বিয়ে দিয়ে দিল।ওর বরের বয়স তখন আটারো বছর।গরিবের মেয়েকে তো আর রাজপুত্র বিয়ে করবে না।ওরাও গরিব।
বিয়ের কিছুদিন পর ওর বর বিদেশ যাবে বলে ঠিক করে।এইজন্য পারুলের বাবাকে কিছু টাকা দিতে বলে।সার্মথ্য না থাকলেও পারুলের বাবা স্থানীয় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে পারুলের বরকে দেয়।বিয়ের ছয়মাস পর পারুলের বর মালয়েশিয়ায় চলে যায় পরিবারের অবস্থা পরিবর্তনের আশায়।পারুল তখন অন্তঃসত্ত্বা।পারুল তখন সুখস্বপ্নে বিভোর।ও নিয়ে আসবে সৃষ্টিকর্তার দান নতুন অতিথি।আর ওর বর নিয়ে আসবে সকল সুখের আধার,সকল চাহিদা পূরণের পার্থিব বস্তু অর্থ।কিন্তু সবার স্বপ্ন যে বাস্তবে রুপ নেয় না।পাঁচ মাস পর নতুন অতিথি ঘরে আসল,পুত্র সন্তান জন্ম দিলো পারুল।কিন্তু ওর স্বামীর খবর পেলো না গত পাঁচ মাসে।এভাবে দিন যেতে শুরু করলো,এভাবে মাস গেলো,বছর গেলো ওর বরের কোনো খবর নেই।পারুলের শ্বশুর-ভাসুর ওকে আর নিজেদের বাড়িতে রাখবে না।
পারুলের ছেলের বয়স তখন তিন বছর।ওর শ্বশুর ওকে বলে দিয়েছে ছেলে নিয়ে কিংবা রেখে বাবার বাড়ি চলে যেতে।পারুল ছেলেকে নিয়ে চলে এলো বাবার বাড়িতে।এখানে কিছুদিন থাকার পর ওর বাবা ওকে ডেকে বলল," দেখ মা আমার অভাবের সংসার তোকে আর তোর ছেলেকে এভাবে লালন-পালন করা আমার পক্ষে অসম্ভব।যাদের ছেলে তাদের দিয়ে দাও।আর ওর বাবা আর ফিরে আসবে বলে মনে হয় না।আমি একটা ছেলে দেখে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করি।"
পারুল কোনো কথা না বলে চলে গেলো।পরের দিন থেকে পাশের বড়বাড়িতে কাজ করতে শুরু করলো।এভাবে আর কয়েক বছর চলে গেলো।এর মধ্যে পারুলকে অনেকবার ওর বাবা বিয়ের কথা বলেছে।পারুল রাজি হয়নি।এবার পারুলের বাবা পারুলের বিয়ে ঠিকনকরেছে।প্রথমে পারুলকে কিছু বলেনি।বিয়ের আগের দিন পারুলকে ডেকে ওর বাবা বললো,কাল তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করেছি,আশা করি কোনো ঝামেলা করবে না।পারুল বললো,ছেলের বাবার খুঁজ নাই যেমন সত্যি, তেমনি ওনি মারা গেছেন কিনা সেটাও আমরা জানিনা এটাও সত্যি,তাহলে আমি কিভাবে বিয়ে করতে পারি।ওর বাবা এসব কথার কোনো জবাব না দিয়ে চলে গেলো।
পারুল বুঝতে পারছে না কি করবে।পরের দিন ছোট আয়োজন করা হলো।দুপুরের দিকে জামাই চলে এসেছে।পারুল বুঝতে পারছেনা,এখন কি করবে।এখনি মাওলানা আসবে।ঘরে সবাই ওকে বউ সাজিয়ে বসে আছে।পারুল একজনকে বললো,আমি ওয়াশরুমে যাবো।ওর মা শুনে বলল এখন যাওয়া যাবে না।এক্ষণী কাজীসাহেব ঘরে আসবেন।পারুল বললো,এক মিনিটের জন্য যাবো,এটা বলেই আর কিছু না বলে ওয়াশরুমের দিকে গেলো।দশ মিনিট চলে গেলো ও আসেনা দেখে ওর ছোটো বোন ডাকতে গেলো।ও চিৎকার করে বলে উঠলো,পারুল আপা ওয়াশরুমে নাই।সবাই দৌড়ে গেলো,চার দিকে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো,পারুলকে পেলো না।অবশেষে বরপক্ষকে বলতে বাধ্য হল পারুলকে পাওয়া যাচ্ছে না।বরপক্ষ চলে গেলো।
পারুল সেদিন ওদের গ্রাম থেকে তিনগ্রাম পরে দূর সম্পর্কের এক খালার বাড়িতে উঠে।পরের দিন সেখানেই থেকে যায়।দুইদিন পর অনেক ভয়ে ভয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।তার পা সামনের দিকে এগোতে চায় না।আজ বাড়ি গিয়ে কি জবাব দেবে।কি দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে ওদের মা ছেলের ভাগ্যে।কিন্তু পারুল জানেনা,বাড়িতে তার জন্য কি চমৎকার অপেক্ষা করছে।ঘন্টা দেড়েক পর পারুল বাড়িতে পৌঁছালো।ভয়ে ভয়ে বাড়িতে ঢুকতে যাবে,তখনি পারুলের চোখে পড়লো,উঠোনে অনেক অনেক লোকের ভীড়।মাঝখানে কে যেনো চেয়ারে বসে আছে।আর একটু এগোতেই বুঝতে পারে লোকটার কোলে বসে আছে তার বারো বছরের ছেলে।পারুল হতচকিত হয়ে সামনে আগালো।ওর ছেলেকে কোলে নিয়ে বসা এ মহাপুরুষ কোথা থেকে উদীয়মান হলো।গত এগারো বছর যাবৎ পারুল আর ওর ছেলের সম্পর্ক অনেকটা "মধ্যবিত্ত পরিবারের সম্মানের" মতো,ধরে রাখাও কষ্টকর, ছেড়ে দেওয়াও বিপদজনক।
সেই ছেলেকে কেউ আদর করে কোলে নিয়ে বসে আছে।পারুল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।ওর স্বামী বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে।পারুল আজ মহা খুশি।পরের দিন পারুল তার ছেলেকে নিয়ে স্বামীর বাড়ি চলে গেলো।আবার সে সুখের সংসার সাজালো।পারুলের আরও দুই ছেলে এক মেয়ে হলো,বড় ছেলে এইচএসসি পাশ করে অনার্সে ভর্তি হলো।সব কিছু ঠিকঠাক চলছে। তবে চার ছেলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে বেশ কষ্ট হয়।
পারুলের বর আবার বলে বিদেশ যাবে।প্রথমে পারুল রাজি হয়নি পরে আবার রাজি হয়ে গেলো।এবার সৌদি আরব গেলো।কিন্তু ইদানীং আগের মতো হলো না।প্রতিমাসে টাকা পাঠায়,প্রতিদিন ফোনে কথা বলে।এভাবে তিন বছর কেটে গেলো।বড় ছেলের অনার্স ফাইনাল চলে এসেছে।বাড়িতে দালানঘর করেছে,মাঠে কিছু জমি কিনেছে।পারুল তার বরকে বলে ছুটিতে দেশে আসার জন্য।পারুলের বর সব ঠিকঠাক করে দেশে আসার টিকেট বুক করে। দেখতে দেখতে নির্দিষ্ট দিন চলে আসলো। আগামী শুক্রবার,পারুলের বর দেশে আসবে তাই চলছে প্রস্তুতি।উৎসব উৎসব পরিবেশ।বৃহস্পতিবার রাত বারোটায় ফোন দিয়ে সবার সাথে কথা বললেন।কার জন্য কি কিনেছেন এসব বলে রাত একটার দিকে ফোন রেখে ঘুমাতে গেলেন।সকাল ছয়টায় ফ্লাইট।কিন্তু রাত তিনটায় ঘুমের মধ্যে প্রেসার স্ট্রোক করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন,জীবন্ত আর দেশে ফেরা হলো না।
সকল ছয়টায় পারুলরা মাইক্রোবাস নিয়ে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর দশটার দিকে ফোন আসে সৌদি আরব থেকে,পারুলের ওপর আকাশ ভেঙে পরেছে।খবরটা শুনার পর পারুল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো,এরপর মাটিতে লুটিয়ে পরে।আজ তিন দিন চোখে খোলেনি,পারুল।জানিনা তার শেষ পরিণতি কি হবে।তার জীবনটা রুপালি পর্দার নাটকের চেয়েও নাটকীয়।তার জীবনের সুখ আর আমার ফুফুর বলা সেই প্রবাদের সুখ একি সুতোয় গাঁথা ফুলের মালা।