দয়ামায়া

Words
515
Reading
3 min
Listen
Play
4y

সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার জন্য স্বাদ আহ্লাদ ত্যাগ করতে হয় মধ্যবিত্তদের। এটাকে তারা নিয়তি বলেই ধরে নেয়।আমার জন্ম মধ্যে বিত্ত পরিবারে।তাই আমার চলার পথে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, শিখতে শিখতেই আমার বড় হওয়া। মেনে নাও, মানিয়ে নাও, সবরে মেওয়া ফলে, এসব মধ্যবিত্তদের চলার পথে মূলমন্ত্র।তাই আমি চাইতাম যতোটা টাকা মার কাছ থেকে কম নেওয়া যায়। এমনকি খাতা শেষ হওয়ার সময় হলে আমার খুব কষ্ট হত কারণ আম্মার কাছে টাকা চাইতে হবে।তাই স্কুল থেকে পিকনিকে গেলেও আমার কোনো দিন যাও হয়নি।

আমি যখন ইন্টার ফাস্ট ইয়ারে পড়ি তখন কলেজ থেকে পিকনিকে যাবে।তখন আমার কাছে টাকা আছে কারণ আমি টিউশনি করি।তারপর ও আম্মার কাছে কিভাবে বলব সেটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। অবশেষে আমার বন্ধুরা এসে মাকে বলে যাওয়ার ব্যবস্থা করলো।আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেল বেশ বড় ছিল। চারজন মেয়ে দশ জন ছেলে।

আমাদের বাড়ি কলেজের বেশ কাছে। আর আমরা যেহেতু একদিনের সফরে যাবো তাই সকাল সকাল পৌঁছাতে হবে।স্যাররা ঠিক করলেন রাত তিনটায় রওনা দেবেন।গন্তব্য গজনী। আমার চারজন ফ্রেন্ডের বাড়ি অনেক দূর। তাই ওরা সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে চলে আসে।রাতে খাওয়াদাওয়া করে একটার দিকে কলেজে চলে যায়।আমরা যারা গ্রামে বাস করি রাতটা তাদের কাছে মধ্য রাত।কিন্তু সেদিন অন্ধকার রাতটাকে দিন মনে হচ্ছিলো। সাউন্ড বক্সে গান বাজছে তালে তালে সবাই নাচছে। কখন তিনটা বেজে গেল টেরই পেলাম না। দুইটা বাস ভাড়া করা হয়েছিল।

আমরা ষোল জন একি বাসে উঠলাম। আমার বাসে যাতায়াতে বমির সমস্যা আছে,তাই জানলার পাশে বসলাম। স্যাররা সামনে বসছে। একজন স্যার দাঁড়িয়ে ব্রিফিং করলেন। আজ নাচ, গান,আড্ডা কোনো কিছুতে বাধা নেই। প্রথমেই জেমস এর "মাটির প্রদীপ" গান বাজানো হচ্ছে সবাই গানের তালে তালে নাচছে। আমি বেশ ছিলাম। হঠাৎ মাথা ঘুরানো সাথে বমি।আমার পাশে সীটে যে বসেছিলো তার ভালো লাগছে না বেপারটা।পিছন থেকে একজন বলছে ওর কষ্ট হচ্ছে ওকে ধরো। ও কিছু করছে না দেখে সে পিছন থেকে এসে আমার পাশের জনকে ওর সীটে বসিয়ে, সে আমার পাশে বসে রুমাল ভিজিয়ে হাত মুখ মুছে দেয়। তারপর বোতল থেকে অল্প পানি নিয়ে মাথায় দিয়ে দিল।

এরপর হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগল। যদিও এসি বাস ছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি সুস্থ হয়ে গেলাম। আবার সবার সাথে আনন্দে যোগ দিলাম। কিন্তু আমার ঐ বন্ধুটা আমাকে বাতাস করতেই থাকলো। আমি অনেক বার মানা করলাম ও শুনেনি। প্রায় পাঁচ ঘন্টা যাতায়াত এক দেড় ঘন্টা যাওয়ার পর আমি ঘুমিয়ে গেলাম সকাল সাতটায় আমার ঘুম ভাঙ্গল। দেখি ও আমাকে বাতাস করছে। আমি চমকে গেলাম। এই কি কর? এখনো বাতাস করছো? সকাল হয়ে গিয়েছে তুমি ঘুমাও নি? আমি এখন ভালো আছি। বাতাস করছ কেন? ও একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল আমার কোন সমস্যা হচ্ছে না। তুমি কি কষ্ট পাচ্ছিলে আমি দেখেছি। তাই আমি চাইনি তুমি সে কষ্ট আবার পাও।আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো আম্মার বলা একটি কথা 'দয়ামায়া আল্লাহ প্রদত্ত গুন এটা সবার থাকে না'।এটায় বুঝি সেই দয়ামায়া।

আমাদের ষোল জন ফ্রেন্ডের সে একজন।ওর সাথে আমার আলাদা কোনো সম্পর্ক তাও না। অন্যরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত অনেকে হয়ত তাকিয়ে দেখার ও সময় হয়নি। অথচ আমি যাতে কষ্ট না পাই সে সারা রাস্তা সেই চেষ্টায় করে গেল যেখানে আমি নিজে ঘুমাচ্ছি। আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে সে হয়ত তাই করত। কলেজ জীবনের পর অনেক বছর কেটে গেলো আর কোনো দিন সাক্ষাৎ হয়নি এরপর সাথে। কিন্তু আমার ওকে প্রায়ই মনে পরে।ভালো থাকোক ঐ দয়ামায়ায় পরিপূর্ণ মানুষগুলো।পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠুক তাদের ছড়ানো ভালোবাসায়।

IMG_20220511_215153.jpg

দয়ামায়া | Ecency