আমার "আম্মা ভক্তি"

Words
571
Reading
3 min
Listen
Play
4y

মাকে ছাড়া মানুষের জীবনের একটি মুহূর্তও সৃষ্টি হয় না। সেই মাকে আলাদা ভাবে মা দিবসে শুভেচ্ছা জানানোর কোন প্রয়োজন আমি বোধ করি না।স্কুল কলেজে পড়ার সময় আর্ট পেপার কিনে, তাতে লাভ চিহ্ন এঁকে, তার ভিতরে আই লাভ মম লিখে, রং করে দেওয়ালে সারা বছর টানিয়ে রেখেছি কয়েকবার। কিন্তু কখনো মায়ের গলা জরিয়ে বলা হয়নি আই লাভ ইউ,আম্মা। কোন দিন বলতে পারব কিনা তাও জানি না। আর ফেইসবুকে বড় করে মাকে নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে আমার কোন লাভ নেই কারণ আমার আম্মার কোন ফেইসবুক একাউন্ট নেই। তাই দেখার কোন সম্ভাবনা ও নেই। যার জন্য দেবো সেই যদি না দেখে তাহলে কি লাভ? আজ মাকে নিয়ে সবাই কে লিখতে দেখে ছোট বেলার কথা খুব মনে পড়ছে। তাই এই লিখতে বসা।

আমি খুব আম্মা ভক্ত ছিলাম। যেটাকে গাঁয়ের লোকেরা বলে মায়ের নেউটা। ছিলাম প্রচন্ড রকম জেদি। অবশ্য দাদু বলত আম্মা নাকি অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেয় তাই এই অবস্থা। সে যায় হোক আমি আম্মাকে ছাড়া খাওয়া ঘুমতো দূরের কথা,আম্মা ওয়াশরুমে গেলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
আমার যখন ছয় বছর বয়স তখন একদিন আম্মার কোন একটা জরুরি বিষয়ে মামার বাড়ি যেতে হবে। আবার ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে চলে আসবে। আমার মামার বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে হেঁটে যেতে আধা ঘন্টা লাগে। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এত ভালো ছিল না। আমাকে নিয়ে গেল আমার কষ্ট হবে,এটা ভেবে আমাকে না নিয়ে আম্মা চলে গেলো। আমাকে বলেনি।

দশ মিনিটের মধ্যে আমি আম্মাকে খুঁজতে শুরু করলাম। না পেয়ে এমন কান্না সারা পাড়ার মানুষ আসা শুরু করেছে জানতে কি হয়েছে। অবশেষে বাধ্য হয়ে বড় আপা বলল, আম্মা মামাবাড়ি গেছে এখনি চলে আসবে। এর পর আম্মা ফিরে আসতে তিন ঘন্টার মতো সময় লেগেছিল আমি ততক্ষণ পুকুর পাড়ে বসে আম্মা যে রাস্তা দিয়ে আসবে সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ছিলাম।এ দৃশ্য পাড়ার প্রায় সব মানুষ দেখেছে। গ্রামের বাড়ি এখানে সবাই সবার সাথে সম্পৃক্ত। আম্মা বাড়িতে আসার পর কত জন যে আম্মাকে বকে গেছে তা গুনা নেই। আম্মার অপরাধ আমাকে তিন ঘন্টার জন্য রেখে মামাদের বাড়িতে গিয়েছিল।

যখন আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি তখন আম্মা ব্যাংকে যাবে উপজেলা সদরে। আমি সেটা আগের দিন শুনেছি।তাই স্কুলে যায়নি। উদ্দেশ্য আম্মার সাথে যাব।কিন্তু আম্মারা আগে থেকে তিন জন যাবে একটা রিকশা ঠিক করে রেখেছে তাই আমাকে নেওয়া যাবেনা। কিন্তু আমি যাব। আব্বা বাড়িতে তাই আম্মার কাছে গিয়ে বলতে পারছি না। আম্মারা বের হয়েছে আমিও পিছন পিছন বের হয়েছি। আম্মা দেখেনি। আম্মারা রিকশায় উঠেছে আমি পিছনে দৌড়াচ্ছি। আম্মারা দেখেনি।আমি দৌড়াতে দৌড়াতে আম্মাদের সাথে পৌঁছে গেছি। আম্মারা ব্যাংকে ঢুকে গেছে।

আমি আর ঢুকিনি কারণ আমার পরনে হাফ প্যান্ট আর "নিমা"।তাই লজ্জা পাচ্ছি। নিমা হচ্ছে হাতে বানানো ছোট জামা যা বাড়িতে পড়ি।একটা গাছের নিচে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি। বৃষ্টি নেমেছে মুষলধারে । আমি ভিজছি। আমার পাশের বাড়ির দাদা তিনিও ব্যাংকে গেছেন। হঠাৎ আমাকে এভাবে দেখে হকচকিয়ে গেলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করবেন এমন সময়, আমি দূরে চলে গেছি। বৃষ্টির জন্য আসতে পারলেন না। ব্যাংকে ঢুকে আম্মাকে দেখে আমার কথা বললেন। আম্মা তখন বাইরে এসে আমাকে ভিতরে নিয়ে গেলেন। আব্বা সেদিন খুব রেগে গিয়েছিলেন। আমাকে সেই একদিনই মারতে এসেছিলেন। দাদু আমাকে নিয়ে গেলেন। আমাকে গোসল করিয়ে যখন আনেন, আমি তখন তর তর করে কাঁপছি।তারপর দাদু কম্বল মুরিয়ে শুইয়ে দেন আমাকে।

এছাড়াও স্কুল থেকে এসে কোন দিন আম্মাকে ঘরে না পেলে বই রেখে আগে আম্মাকে খুঁজে বের করে তারপর যা করা লাগবে করতাম। আম্মা অবশ্য যা ই কাজ থাক আমি স্কুল থেকে আসার আগে ঘরে চলে আসতো।

কিন্তু এখন আম্মাকে ছাড়া অনেক দূরে থাকি।আম্মার মুখটা পর্যন্ত সরাসরি দেখার ভাগ্য হয়ে উঠে না।দিনতো তবু চলে যাচ্ছে,কিন্তু প্রায়ই সেই ছোটো সময়ের কথা মনে পড়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি।
সৃষ্টিকর্তা সবার মা কে তাদের কাছাকাছি রাখার তওফিক দান করুক এই কামনা।

FB_IMG_16201080145667414.jpg

Picture:Collected From Facebook