"দুনিয়াতে সবচেয়ে অদ্ভুত কথা কি যা মানুষ সত্যি যেনেও বিশ্বাস করতে চায় না?" এই প্রশ্নটির সম্মুখীন হয় আলাদীন যা আগুনের সন্তান তাকে জিজ্ঞেস করে আশ্চর্য প্রদীপ সংগ্রহ করার আগে।বলছিলাম ছোটবেলায় বিটিভিতে দেখা আলিফ লায়লার কথা।ঐ পর্বটিতে দেখা যায়,আলাদীন যখন আশ্চর্য প্রদীপে হাত দিতে যায় তখন তার প্রহরী দৈত্য আগুনের সন্তান তাকে তিনটি প্রশ্ন করে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলে প্রদীপটিকে আলাদীন সাথে নিয়ে আসতে পারবে।সে যাই হোক,প্রশ্নটির উত্তর ছোটসময় তেমন বুঝতাম না।আলাদীন যখন উত্তর দিলো,উত্তর শুনেও বুঝতে পারিনি।এখন পুরোপুরি বুঝতে পারি এমন নয়।তারপরও বুঝার চেষ্টা করি।
প্রশ্নটির উত্তর ছিলো,এই অদ্ভুত কথাটি হচ্ছে "মৃত্যু" যাকে সত্যি যেনেও মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না,মানে মানুষ এমনভাবে জীবন পরিচালনা করে যেনো এই পৃথিবী ছেড়ে সে কোনো দিনও যাবে না।মানুষের কর্মকাণ্ড এমন যে এই পৃথিবীতে সে চিরস্থায়ী ভাবে থাকবে,কোনোদিনও তাকে অন্য কোথাও যেতে হবে না।
ছোটো সময় মনে হতো,এটা কিভাবে সম্ভব।সবাইতো মৃত্যুকে সত্যি জানার সাথে সাথে বিশ্বাসও করে যে সে মরে যাবে।কারণ এটাতো সে প্রতিদিনই দেখতে পাচ্ছে,আশপাশের সব প্রাণের মৃত্যু হচ্ছে।তাহলে এই কথার মানে কি যে মানুষ মৃত্যুকে বিশ্বাস করে না!তাহলে এই কথা বলার মানে কি?
এই বিশ্বাসটা আসলে মুখের না বা মনের না,এই বিশ্বাস কর্মকাণ্ডের,এই বিশ্বাস মানুষের জীবন পরিচালনার পদ্ধতির।তার জীবন চালনার পদ্ধতিই বলে দিচ্ছে যে সে বিশ্বাস করে না তার কোনোদিন মৃত্যু হবে।একটা উদাহরণ দিলেই বেপারটা পরিষ্কার হবে।
একজন মানুষকে যদি বলা হয় নদীভাঙন এলাকায় কিছুদিন থাকতে তাহলে সে কিভাবে থাকবে,কি পদ্ধতিতে সে জীবন কাটাবে?নদী ভেঙে ভেঙে অগ্রসর হচ্ছে,আর এক-দুই কিলো মিটার দূরে আছে, হয়তো আর বছর খানেকের মধ্যে ভাঙন সে জায়গায় পৌঁছে যাবে,এমন জায়গায় তার আবাসস্থল নির্ধারণ করা হলো।তাকে এখানে থাকতে বলা হলো এবং যা কিছু করার ক্ষমতা দেওয়া হলো।সে চাইলে থাকার জন্য বিরাট বিলাসবহুল ভবন করতে পারবে,সুন্দর বাগান বানাতে পারবে,আরাম-আয়েশের সব ব্যবস্থা করতে পারবে,এক কথায় তার ভবিষ্যতের সুখ স্বাচ্ছন্দের জন্য যা প্রয়োজন সব করতে পারবে।
সে মানুষটি তখন কি করবে?সে যদি সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ হয়,তাহলে চিন্তা করবে আর বছর খানেকের মধ্যেই এই জায়গা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে,এখানে কি করবো বিলাসবহুল ভবন করে বা আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করে।যদি আজীবন থাকতে পারতাম তাহলে না হয় করতাম,এই কয়েকদিনের জন্য এতো ঝামেলা করে লাভ কি।বরং আমাকে যেহেতু কিছুদিন এখানেই থাকতে হবে কুঁড়ে ঘর একটা বানিয়ে থেকে যায় কোনো রকমে কিছুদিন,তারপর সে একটা কুঁড়েঘর বানিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করলো।
এর বেশি কিছু করার চিন্তা সে করতে পারবে না,কারণ সে বাস্তব দেখছে যে নদী ভেঙে সব জায়গা জমি নদীর অতল গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।এইক্ষেত্রে বলা যায়,সে "নদীভাঙন" টাকে বিশ্বাস করেছে।তার কর্মকাণ্ড বলে দিচ্ছে সে নদীভাঙন কে বাস্তবিক ভাবে বিশ্বাস করেছে।যদি সে নদীভাঙন টাকে বাস্তব জেনেও ঐ জায়গায় বহুতল ভবন তৈরির কাজ শুরু করে দিতো,তাহলে বলা যেতো যে সে নদীভাঙন কে বিশ্বাস করেনি।
ঠিক তেমনি,মানুষ মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখছে,আর এটাও জানে যে তার মৃত্যু হবে আর মৃত্যু হলেই সব শেষ তারপরও সে নিশ্চিত মনে পৃথিবীতে বাস করছে।আমি বলছি না যে,মানুষের মৃত্যু হবে তাই সে বিলাসিতা বাদ দিয়ে কুঁড়েঘর তৈরি করে জরাজীর্ণভাবে জীবন কাটিয়ে দিক।
বরং আমি বলছি যে সে নিজের মতো করে জীবন কাটাক,তার সমপ্রজাতিকে কষ্ট না দিক।নৈতিক উপায়ে,ন্যায়ভাবে যতখুশি বিলাস জীবন কাটাক,কিন্তু অন্যের ভাগ টা মেরে না দিক।যেহেতু জীবন ক্ষণস্থায়ী তার জন্য এতো লোভ কিসের জন্য ?সম্পদের জন্য ভাই ভাই এ ঝগড়া,মারামারি কিসের জন্য? দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা সঞ্চয় কিসের জন্য? খুন খারাবি, রাহাজানি করে নিজের ক্ষমতা দেখানো কিসের জন্য? দুর্বলের প্রতি অত্যাচার কিসের জন্য? অন্যের ভাগের জিনিস নিজের করে পাওয়ার লোভ কিসের জন্য?এমন শতশত অপরাধ করা কিসের জন্য?
এসব প্রশ্নের উত্তর একটাই,মানুষ মৃত্যুকে সত্যি জানে,কিন্তু বিশ্বাস করে না।এমনভাবে সে জীবন প্রবাহিত করছে যে এখানেই সে চিরস্থায়ী ভাবে থেকে যাবে।