জীবনের প্রথম নিজের জেলা আর ঢাকা বাদে অন্য কোনো জেলায় ভ্রমণের বর্ণনার প্রথম অংশটুকু ছিলো প্রথম পর্বে।আজকে তার পরবর্তী অংশটুকু থাকছে।
লঞ্চ মুন্সিগঞ্জ যাবে এটা নিশ্চিত হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লাম।টিকেট কাটা লাগেনি।বললো পরে ভাড়া নিয়ে নেওয়া হবে।আমি সোজা ছাদে চলে গেলাম।এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করলাম।কারণ প্রথম কোনো নদীকে কোনো নৌযানে চড়ে দেখবো।এর আগে লঞ্চতো দূরে থাক কোনোদিন নৌকাতেও উঠিনি।একটু পর যাত্রী উঠা শেষ হলে লঞ্চ চলতে শুরু করলো।আমার মধ্যে একসঙ্গে ভয় আর নতুন কোনো অভিজ্ঞতার আনন্দের অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করছিলো।লঞ্চ মাঝ নদী দিয়ে চলছে।লঞ্চে থেকে ঢাকা শহরকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছিলো।স্বাভাবিকভাবে শহরের ভিতরে থেকে শহরের এই সৌন্দর্য চোখে পড়ে না।বড় বড় কিছু কোম্পানি উঁচু উঁচু দালানের ছাদে তাদের নামের বিলবোর্ড টানিয়ে রেখেছে।আমার মনে হলো লঞ্চে থেকে দেখার জন্যই বোধহয় এই বিলবোর্ড গুলো রাখা।
কয়েকটা ব্রীজের নিচ দিয়ে পার হয়ে লঞ্চ চলতে লাগলো।নদীর দুইপাশে কর্মব্যস্ত মানুষদের দেখা মিললো।বড় বড় নৌকা,ট্রিমারে করে আসা বিভিন্ন ধরনের মালগুলো মাথায় করে নামাচ্ছেন শ্রমিকরা।একটু পর পর এই দৃশ্য চোখে পড়লো।যখন লঞ্চে উঠেছি তখন চাঁদপুরগামী এই লঞ্চটাকেই সবচেয়ে বড় বলে মনে হচ্ছিল।কিন্তু একটুপর বরিশালগামী এক বিরাট লঞ্চ যখন আমাদের লঞ্চটাকে ক্রস করে গেলো তখন আমাদের লঞ্চটাকে ক্ষুদ্র মনে হলো।আর ঐ লঞ্চের ঢেউয়ে আমাদের লঞ্চটা দুলে উঠলো, আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম।আমাদের লঞ্চের পাশ দিয়ে মাঝে মধ্যে ছোটো নৌকা যাচ্ছিলো,নৌকাগুলো এতো দুল খাচ্ছিলো দেখে আমার নিজেরই ভয় লাগছিলো।মনে হচ্ছিলো,এই বুঝি ডুবে যাবে।নৌকায় আরোহী যাত্রীদেরতো অনেক সাহস।আমার জন্যও যে এই রকম একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিলো সেটা বুঝতে পারিনি তখন।
অনেকক্ষণ যাওয়ার পর,টিকেট মাস্টার আসলেন।তিনি জিজ্ঞেস করলেন কোথায় যাবেন।আমি বললাম মুন্সিগঞ্জ।তিনি চল্লিশটাকা দামের একটা টিকেট ধরিয়ে দিলেন।আমি একশো টাকার একটি নোট দিলাম,ওনি বাকি টাকা ফেরত দিচ্ছিলেন আর যা বললেন তা শুনে আমার চক্ষু চড়কগাছ।এই লঞ্চ নাকি চাঁদপুর গামী তাই মুন্সিগঞ্জের ঘাটে ভিড়বে না আমাকে নাকি মাঝ নদীতে নেমে যেতে হবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম,মাঝ নদীতে নামবো মানে,উঠার সময়তো বললেন মুন্সিগঞ্জ যাবেন।
ওনি বিনিত স্বরে বললেন,আরে মাঝনদীতে নৌকা আসবে সেখানে নিরাপদে উঠে যাবা কোনো সমস্যা হবে না, বলে চলে গেলেন।দেখলাম তিনিই লঞ্চ চালাচ্ছেন।তখন অবশ্য এই দুঃসময়েও আমার মনে একটা প্রশ্ন উদয় হয়েছিলো,যারা জাহাজের চালক তাদেরকে নাবিক বলে,আবার নৌকার চালককে বলে মাঝি,কিন্তু লঞ্চ এর চালককে কি বলে?
যাইহোক তখনতো আমার ভয়ে কাঁদো কাঁদো অবস্থা।এই কোন বিপদে পড়লাম।মাঝনদীতে লঞ্চ থেকে আবার নৌকায় উঠবো কিভাবে!তাও আবার চলন্ত লঞ্চ থেকে।পান্থকে ফোন দিয়ে বললাম ঘটনা।পান্থ আশ্বাস দিলো,এটা স্বাভাবিক বেপার কোন সমস্যা হবে না।তারপরও আমার প্রচন্ড ভয় লাগছিলো।এতোক্ষণ যাবৎ আমি যে নদীর সৌন্দর্য, নদীর দুইপাশে গড়ে উঠা শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম তা ধূলিস্যাৎ হয়ে গেলো।এখন আর কোনো সৌন্দর্য চোখে পড়ছে না,মনে শুধু এক চিন্তা কিভাবে নামবো,কিভাবে পার হবো এই নদী।
মনে মনে আবার ভাবলাম,আম্মাকে না জানানোর কারণেই বোধহয় এই বিপত্তি হয়েছে।আমাদের ভাই-বোনদের আবার "স্পিরিচুয়াল" একটি বিশ্বাস রয়েছে যে আম্মা যদি কোনো কাজ করতে নিষেধ করে সেটা যদি করি তাহলে নিশ্চিত বিপদ আসবে।তাই আমরা কখনও আম্মার কথার অবাধ্য হই না।
যাইহোক এসব চিন্তা করতে করতে ভয়ে ভয়ে লঞ্চের ছাদের মাঝ বরাবর বসে রইলাম।আর কেনো যে আসলাম এটার জন্য আপসোস করতে লাগলাম।অনেকে দেখি লঞ্চের ছাদের একপাশের রেলিঙে বসে আনন্দে বাতাস খাচ্ছে।আর আমি ভয়ে আছি,যেনো মনে হচ্ছে আমার জীবন সংশয় এ আছে।একটু পর লঞ্চের চালক আসলেন,আমাকে দেখে হয়তো বুঝতে পারলেন যে আমি ভয়ে আছি।তিনি বললেন,চিন্তা করো না,আমি নামিয়ে দিবো ভয় নাই।
অবশেষে মুন্সিগঞ্জ এ পৌঁছালাম,মানে মুন্সিগঞ্জের মাঝনদীতে।তারপর ডাকতে লাগলো মুন্সিগঞ্জে যারা নামবেন তারা নিচে আসুন।নিচে গেলাম।একটা নৌকা এসে লঞ্চের সাথে সাথে চলতে লাগলো, মনে হচ্ছে লঞ্চের সাথে বেঁধে দিয়েছে।সবাই লঞ্চ থেকে নৌকায় পার হয়ে যাচ্ছে।আমি দেখতে থাকলাম,কিভাবে পার হচ্ছে।তারা দেখলাম কোনো ভয় ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে নৌকায় নামছে,যেনো মনে হচ্ছে লঞ্চ থেমে আছে আর ওরা মাটিতে নামছে।সবার পার হওয়া শেষ,তারপর আমি গেলাম।এমন সময়ও মনে হচ্ছিলো দূর,চাঁদপুরই চলে যাই,তাওতো এই মাঝনদীতে নামতে হবে না।এসব ভাবতে ভাবতে লঞ্চের রেলিঙ পার হয়ে নৌকাতে মোটামুটি চোখ বন্ধ করে ঝাপিয়ে পড়লাম।অতঃপর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।নৌকা ঘাটে ভিড়ার পর নামলাম।এতোক্ষণ বুকের মধ্যে হৃদপিন্ডটা যে কি ভিষণ লাফাচ্ছিলো,মনে হচ্ছিলো খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে যাবে।এখন লাফানো বন্ধ হলো।
পান্থকে ফোন করলাম,পান্থ দেখলাম ছোটো একধরনের বিশেষ অটো রিক্সা নিয়ে আসলো আমাকে নিতে, যার নাম নাকি "মিশুক"। এর আগে এই ধরনের অটো রিক্সা দেখিনি, মুন্সিগঞ্জেই প্রথম দেখলাম।তারপর মিশুকে চড়ে পান্থ যেখানে থাকে সেখানে চলে গেলাম।
প্রথম লঞ্চ ভ্রমণের প্রথম দিকটা আনন্দময় হলেও,শেষের দিকটা রোমাঞ্চকর ছিলো,যদিও বেপারটা খুবি স্বাভাবিক,কিন্তু ঐটুকুই আমার মতো এমন ঘরকুনো মানুষের জন্য বিরাট রোমাঞ্চের বেপার।