কিছুদিন আগে মুন্সিগঞ্জগামী একটি লঞ্চ নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবে যায়।এই লঞ্চডুবি দেখে আমার প্রথম এবং শেষ লঞ্চ ভ্রমণের কথা মনে পড়ে গেলো।ঐ একবারই লঞ্চে উঠেছিলাম।তার আগে বাস ছাড়া আমি অন্য কোনো যানবাহনে উঠিনি কখনোও।শুধু কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা আসার জন্য রাজপথ দিয়ে যে বাস চলে সেই বাসই আমার একমাত্র ভ্রমণের অবলম্বন।তাছাড়া দেশের অন্য কোথাও বা অন্য কোনো রাস্তায় কোনো দিন যায়নি।অন্য কোনো যানবাহনেও উঠা হয়নি।ট্রেনেও আজ পর্যন্ত উঠা হয়নি,বিমানতো দূরে থাক।আমার আম্মা আর বোনেরা আমাকে কখনই কোথাও যাওয়ার অনুমতি দেয় না।সবসময়ই একটা গন্ডির মধ্যে বন্ধি করে রাখেন।তাদের আমাকে নিয়ে খুব ভয়,একটা মাত্র ছেলে যদি কিছু হয়ে যায়!
সে যাই হোক,সেবার আমার মামাতো ভাই পান্থর কাছে যাবো বলে ঠিক করি।সে থাকে মুন্সিগঞ্জে।আমি ঢাকা থেকে তার কাছে যাবো।সময়টা ছিলো উনিশ সালের ডিসেম্বর মাসে,শীত তখনও শুরু হয়নি।মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর,ক্লাস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ছুটি ছিলো কয়েকমাস।ভাবলাম ওর কাছ থেকে ঘুরে আসি।অবশ্য এর আগে কোনোদিন কোথাও যাওয়ার সাহস হয়নি বা পরিবার থেকে অনুমতি দেয় নি।কিন্তু সেবার সাহস করেছি,কারণ সবেমাত্র মেডিকেলে ভর্তি হয়েছি,নিজের মধ্যে একটু বড় হয়েছি ভাব আসলো।আর আমার আগে থেকে ইচ্ছা ছিলো,কলেজ জীবনটা শেষ করার পর, আমি যে বড় হয়েছি এটা বুঝানোর জন্য কিছু কাজ করবো।সেই পূর্বপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্যই এই মুন্সিগঞ্জ যাত্রা।
মুন্সিগঞ্জ যাবো কিন্তু লঞ্চে যে যেতে হবে এটা আগে থেকে জানতাম না বা আমার বোনরাও জানতো না,যদি জানতো লঞ্চে যেতে হবে তাহলে কখনই দিতো না।পানিকে তারা খুব ভয় পায়,মানে তাদের নিজেদের জন্য না, পানি আমার জন্য ভয়ংকর।আমাকে কোনোদিন পানিতে নামতে দেয় নি।তাই সাঁতারও শিখা হয়ে উঠে নি।অথচ জীবনের প্রথম দশবছর আমি গ্রামে বড় হয়েছি।গ্রামে থাকা একটা বাচ্চা যে সাঁতার পাড়ে না এটা একদম বিরল,পাড়বো কিভাবে ঐ যে বললাম কখনই পুকুরের পানি দূরে থাক ডোবার পানিতেও নামতে দেয় নি আমাকে।
যাক সে কথা, মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশ্যে ভোরবেলা ফজরের পর পর বাসা থেকে বের হলাম।হেঁটে হেঁটে খিলক্ষেত বাস স্ট্যান্ডে গেলাম।খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডে থেকে "আজমেরী গ্লোরী" নামক বাসে ছড়ে প্রথমে সদরঘাট গেলাম।পান্থ বলেছিলো সদরঘাট থেকে মুন্সিগঞ্জে যাওয়ার বাস পাবো।বাস হয়তো স্বাভাবিক দিন হলে পেতাম,কিন্তু ঐদিন ছিলো কোনো এক রাজনৈতিক দলের হরতাল যা আমি আগে থেকে জানতাম না।বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি সাংবাদিকরা ব্যস্ত ক্যামেরা নিয়ে,জনসাধারণের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
জীবনের প্রথম কিশোরগঞ্জ আর ঢাকা বাদে অন্য কোনো জেলায় যাবো বলে ঠিক করেছি,আর এই বিপদে পরতে হলো।বাস চলে না,তাহলে হয়তো আবার বাসায় ফেরত যেতে হবে।পান্থকে ফোন দিলাম,পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে।পান্থ বললো,সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে খুঁজ নিয়ে দেখতে পারো লঞ্চ চলে নাকি।যদি লঞ্চ চলে,তাহলে লঞ্চে চড়ে চলে আসো।আমি ভাবলাম সত্যিই কি লঞ্চে যাবো নাকি।আম্মারা শুনতে পারলেতো আমি শেষ!
তারপরও লঞ্চ টার্মিনালে গেলাম।গিয়ে দেখি লঞ্চও বন্ধ।সেখানেও সাংবাদিক।আমার খুব বিরক্ত লাগলো।তারপর ভাবলাম থাক বাসায়ই ফেরত যায়।চলে আসবো এমন সময় ভাবলাম,আচ্ছা জিজ্ঞেস করে দেখি কখন লঞ্চ চলা শুরু হতে পারে।টিকেট কাউন্টারে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,তিনি বললেন,এক-দুই ঘন্টা পড়ে ছাড়তে পারে তবে শিউর না।একটু বাহিরে এসে,বুড়িগঙ্গার পঁচা পানির দিকে তাকিয়ে ভাবছি যে এক দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করবো নাকি বাসায় চলে যাবো।যদি অপেক্ষা করি তারপর যদি লঞ্চ আজকে আর না ই ছাড়ে তখনতো বৃথায় সময় নষ্ট। পরক্ষণেই আবার ভাবলাম,এতোদূর চলে আসলাম একটু অপেক্ষা করেই দেখি।অতঃপর দুই ঘন্টা পর লঞ্চ ছাড়বে বলে শুনতে পেলাম।সবাই তড়িঘড়ি করে লঞ্চের দিকে যাচ্ছে।আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার লঞ্চ কোনটা।ওনি লঞ্চ টা দেখিয়ে দিলো।গিয়ে লঞ্চের গায়ে কোথাও মুন্সিগঞ্জের নাম দেখতে পেলাম না বরং লিখা চাঁদপুর।লঞ্চের দায়িত্বে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করলাম এটা কি মুন্সিগঞ্জ যাবে? তিনি বললেন হ্যাঁ যাবে।
তারপরও আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না।প্রথম কিনা তাই সবকিছুতেই ভয় ভয় লাগছিলো।পান্থকে আবার ফোন দিলাম,পান্থ বললো সমস্যা নেই উঠে পড়ো,মাঝপথে মুন্সিগঞ্জ নামিয়ে দিয়ে যাবে।তখন একটু সাহস পেলাম আর উঠে পড়লাম।
প্রথম লঞ্চ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ঘটনাটা লিখার পর দেখলাম বেশ বড় হয়ে গিয়েছে,তাই দুই পর্বে দিতে হচ্ছে।পরবর্তী পর্বে বাকি অংশটুকু থাকছে।