ফার্স্ট প্রফেশনাল এমবিবিএস পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এক মাস ছুটি ছিলো।আর পরীক্ষা শুরুর আগে মোটমাট পাঁচ মাস ক্লাস হয়েছে তার আগেতো করোনার জন্য প্রায় দেড় বছর ছুটি কাটাতে হয়েছে।হিসাব করলে দেখা যায় গত কয়েকবছর যাবৎ তেমন পড়ালেখার চাপ নেই,মেডিকেলে ভর্তির পর শুধু ছুটি আর ছুটি কাটাচ্ছি।আর আমি ছাত্র,পড়ালেখা ছাড়া আর কোনো কাজও নেই।তাই বলা যায়,কয়েকবছর যাবৎ এক অলস সময় পার করছি।
প্রফ দেওয়ার সময়টা কষ্ট হয়েছে তবে তা ঘরে বসে শুধু পড়ালেখা করার কষ্ট।দৌড়া দৌড়ি বা শারীরিক কোনো পরিশ্রম না।অলসভাবে সময় পার করা কঠিন।সময়গুলো যেনো কাটতে চাইতো না।ছুটির সময়টা বেশিরভাগ সময় গ্রামের বাড়িতে কাটাই।হয়তো বিকাল বেলা এসে মেহগনি বাগান টাই বসি।সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে গিয়েছে,আর একটু পরেই অস্ত যাওয়ার কথা।কিন্তু অস্ত আর যায় না,মনে হচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যাচ্ছে।আসলে সময়তো অল্পই।কিন্তু আমার কাছে দীর্ঘ মনে হতো।ঐ কোনো কাজ নেই,সারাদিন বসে থাকা আর এলোমেলো চিন্তা করা।ঘড়ির মিনিটের কাটা একবার ঘুরে আসার সময়টাকে মনে হতো যেনো ঘন্টার কাটা একবার ঘুরে আসছে।
পূর্ণ বিশ্রামে থাকা শরীর।খাওয়া দাওয়ার কোনো সমস্যা নেই।শরীরের সাথে মন আনন্দে থাকার কথা ছিলো।কিন্তু সেই সময়টা কেনো যেনো আনন্দ পেতাম না।সব কেমন যেনো নিরামিষের মতো লাগতো।দিনগুলোকে মনে হতো লবণ ছাড়া রান্না করা খাবারের মতো।আর মুখের কথার মধ্যে সবসময় লেগে থাকতো "ভাল্লাগে না" নামক এক বিরক্তিকর শব্দ।
উপরওয়ালার অশেষ মেহেরবানিতে পৃথিবী আবার প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছে।সব কিছুই আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।পড়াশোনা অনলাইন থেকে আবার অফলাইনে ফিরে এসেছে।সেই ধারাবাহিকতায় আমাকেও মেডিকেলে ফিরতে হয়েছে।এবার মেডিকেলে ফিরেছি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হয়ে।মেডিকেল কলেজগুলোতে তৃতীয় বর্ষ থেকে রোগীর শরণাপন্ন হওয়া শুরু।প্রথম দুই বছর শুধু একাডেমিক পড়ালেখা ছিলো।এখন সেই সাথে হাসপাতাল ভবনেও যেতে হয়।সুতারাং এখন পড়াশোনার সাথে সাথে হাসপাতালেও দৌড়াতে হয়।এটাকে "ওয়ার্ড" করা বলে।
এখন দিনকাটে খুব ব্যস্ততায়।যদি আজকের দিনের রুটিনটার কথাই বলি।ভোরে ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠে মসজিদ যাওয়া,সেখান থেকে এসে ঘন্টা কানেক পড়াশোনার পরই ক্লাসের সময় হয়ে গেলো।সাড়ে সাতটা থেকে ক্লাস শুরু।কলেজে গিয়ে একাডেমিক ভবনে ঘন্টাখানেক ক্লাস করার পর হাসপাতাল ভবনে ওয়ার্ডে যেতে হলো।সেখানে দু'ঘন্টা অধ্যয়ন করার পর।আবার লেকচার ক্লাসের জন্য একাডেমিক ভবন।সেখানে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত ক্লাস করার পর আধাঘন্টা বিরতি।বিরতির পর আবার দেড় ঘন্টা ব্যাবহারিক ক্লাস হলো।আড়াইটার দিকে ছুটি হলো।
ছুটির পর আবার পাঁচটা পর্যন্ত হাসপাতালে দুই ঘন্টা " ইবেনিং ওয়ার্ড"।সব শেষে সাড়ে পাঁচটার দিকে যখন বাসায় আসলাম তখন মেডিকেলের এক বড় ভাই ফোন দিলো,মাগরিবের পর ঔষধ কোম্পানির একটা সেমিনার আছে সেখানে ওনার সাথে যোগ দিতে।আমি বললাম,"আচ্ছা"।সেই সেমিনার থেকে আসলাম রাত এগারোটার সময়।
আমার সহপাঠী আমাকে আজকে বলছিলো,"ছুটিতে কতো সময় অলস ভাবে কাটিয়ে দিয়েছে,ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া,ঘুম তারপরও মনে কেমন জানি শান্তি পেতাম না।আর এখন সারাদিন ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া নেই,নেই ঠিকমতো ঘুম, শরীরে নেই পর্যাপ্ত শক্তি তবু মনের মধ্যে আনন্দ,ছুটে চলার আনন্দ।" তার এই কথাটা একদম সত্য।এখন আর মনে কোনো এলোমেলো চিন্তা নেই।এখন আমার জীবনের মিনিটের কাটা একবার ঘুরে চলে আসে সেকেন্ডের কাটার গতিতে।