আমাদের গ্রামের বাড়ির ঘরগুলো টিনের তৈরি।পূর্বে গ্রামের বেশিরভাগ ঘরই টিন দিয়ে তৈরি হতো,বর্তমানে অবশ্য ইটের তৈরি দেয়াল,আর ছাদ টিনের তৈরি এমন ঘরের সংখ্যাই বেশি।আর কিছু সংখ্যক ঘর রয়েছে ইটের দালান,ছাদও ইটের তৈরি।যাইহোক,আমাদের বাড়িটা গাছ-গাছালিতে ঘেরা।বাড়ির ঘরগুলোকে মনে হয়,কোনো জঙ্গলের মাঝখানে কুঁড়েঘর।
আমাদের বাড়ির আশপাশে আর কোনো বাড়ি নেই।অন্যদের বাড়ি একটু দূরে।আমাদের বসত ঘর মানে বেডরুম যেটাকে বলে সেটাও টিন আর কাঠের তৈরি,নিচের দিকে ইটের পাটাতন,এই ঘরগুলোকে আমাদের এলাকায় "দাইড় পাক্কা" ঘর বলে।এইসব ঘরের পিলারগুলো ইট-সিসেন্টের তৈরি।আর অন্য ঘরগুলোর পিলার বাঁশের।বসত ঘরের সামনে বারান্দা রয়েছে,বারান্দায় আবার ছোট একটা রুম।এই ঘরগুলোকে "চার চালা ঘর" বলে।কারণ এইসব ঘরের টিনের "চাল" থাকে চারটা।
ঘর মোট তিনটা।বসত ঘর একটা,রান্নাঘর একটা, আরেকটা ঘরে লাকড়িসহ বিভিন্ন জিনিস রাখা,স্টোর রুমের মতো।
আর বাড়ির বাউন্ডারিও টিনের তৈরি বেড়া দিয়ে দেওয়া।
বাথরুম আর টয়লেট ঘর থেকে আলাদা।বাথরুমের দেয়াল ইটের তৈরি আর চাল টিনের।
বাড়ির উঠোনের মাঝখানে শুধু কোন গাছ নেই আর বাকি বাড়ি জুড়েই গাছ আর গাছ।উঠোনের চারপাশেও গাছ।উঠোনের পশ্চিম দিকে দুইটা নারকেল গাছ,একটা অনেক বড়,বয়স ত্রিশ বছর হবে।আর পূর্ব পাশে বড়ই গাছ,কাঁঠাল গাছ।আর উঠোনের একপাশে লাকড়ির ঘরের সামনে কলাগাছ কয়েকটা।
বসত ঘরের পিছনের দিকে বাঁশবাগান।আগে বাঁশবাগান অনেক ঘন ছিলো,এখন অবশ্য বাঁশ কমে গিয়েছে।বাঁশবাগানের মাঝে রয়েছে আমগাছ,কামরাঙা গাছ,আরও বিভিন্ন ধরনের গাছ যেগুলো কোনো ফল দেয় না,লাকড়ির গাছ হিসাবে পরিচিত।বাঁশবাগান বসত ঘরের পিছন দক্ষিণ থেকে শুরু করে পশ্চিম পর্যন্ত।পশ্চিম দিকে জাম্বুরা গাছ দুইটি,বেল গাছ আর ঝুপড়ীর মতো আরো অনেক গাছ।
বাড়ির সামনের দিকে লাকড়ির ঘরের পিছনে তিনটা আমগাছ আছে তারপর অনেকটা খালি জায়গা।ছোটো সময় এই জায়গায় ক্রিকেট খেলতাম,বাচ্চা-কাচ্চারা এখনও এই জায়গায় খেলাধুলা করে।এই খালি জায়গার পর মেহগনি বাগান।মেহগনি বাগানের চারপাশে সুপারি গাছ,জামগাছ,কাঁঠাল গাছ,আতাফল গাছ,পেয়ারা গাছ,আনারস গাছ কলাগাছ আর আমগাছ রয়েছে অনেকগুলো।
মেহগনি বাগানের পিছনে আমাদের পুকুর।পুকুরের চারপাড়েও বিভিন্ন ধরনের গাছ রয়েছে।উত্তর পাড়ে একটা শিমুল গাছ।এখন বসন্তকাল শিমুল ফুল ফুটেছে।লাল শিমুল ফুল দেখতে অপূর্ব লাগে।পশ্চিম পাশে একটা লিচু গাছ আর একটা খেঁজুর গাছ রয়েছে।পুকুরের পরেই চাষ করার জমি।বিস্তৃত ধান ক্ষেত।পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ালে এক নৈসর্গিক সৌন্দর্য মনকে অভিভূত করে তুলে।
পুকুরে রুই আর কার্পজাতীয় অন্যান্য মাছ চাষ করেছি।চাষ ছাড়াও অন্যান্য অনেক ছোটো মাছ রয়েছে।এখন চৈত্র মাস,পুকুরের পানি শুকিয়ে গিয়েছে,সেলু মেশিন দিয়ে পানি দিতে হয়,কয়েকদিন পর পর, না হলে আবার মাছ মারা যাবে।
সবুজ গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা আমাদের বাড়িটি আমার কাছে স্বর্গের মতো মনে হয়।"চিত্রা নদীর পাড়ে" সিনেমার একটি সংলাপ ছিলো এমন যে,"চিত্রা নদী ছেড়ে স্বর্গে গিয়েও সুখ নেই"।শশীভূষণ সেনগুপ্ত নামের এক হিন্দু উকিল তার জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা বুঝাতে এই কথাটি বলেন। আমারও এমনি মনে হয় আমার বাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও গিয়েই শান্তি পাবো না।