ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি তখন,স্কুল ছুটির পর স্কুল থেকে বাস দিয়ে বাসায় ফিরছি।বাসের কোনো আসন ফাঁকা না থাকায় গেইটের কাছে হেলপারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।বাস স্টেশন ছেড়ে দিয়েছে,তাই হেলপার একটু ফ্রী সময় পেল,আমাকে জিজ্ঞেস করলো বাবু,তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?আমি বললাম, ক্লাস সিক্স।
তোমাদের বই এ একটা গল্প আছে না আয়না,খুব হাসির তাইনা!
হ্যাঁ,তা ঠিক, কিন্তু আপনি কিভাবে জানেন?
হেলপার ছেলেটা,আবার জিজ্ঞেস করলো,নবম শ্রেনীতে উঠলে কোন বিভাগ নেওয়ার ইচ্ছে,কিছু কি ভেবেছো?
হ্যাঁ,আমার বোনদের ইচ্ছে আমি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা করবো।
আচ্ছা ভালো,কি হতে চাও বড় হয়ে?
হেলপার ছেলেটা, এইধরনের আরো অনেক প্রশ্ন করলো।
সে এমনসব প্রশ্ন করছিলো যে মনে হচ্ছিল পড়ালেখা বিষয়ে অনেক কিছুই জানে এবং বুঝে।
আমি অবাক হচ্ছিলাম,স্বাভাবিকভাবে বাসের হেলপার,ড্রাইভার ওরাতো পড়ালেখা না করেই এই পেশা বেঁচে নিয়েছে,পেটের দায়ে,পড়ালেখা সম্পর্কে এতোকিছু তাদের জানার কথা না বা বেশিরভাগ হেলপার,ড্রাইভাররা জানেও না।
এইবার,হেলপার ছেলেটিকে তুমি সম্মোধন করে বললাম,তুমি কিভাবে এইসব জানো?তুমি কি পড়ালেখা করেছো?
এই প্রশ্নটা প্রথম থেকেই করছিলাম,কিন্তু ছেলেটা এর উত্তর দিচ্ছিলো না,কিভাবে সে পড়ালেখা সম্পর্কে এতো কিছু জানে।যখন শেষ পর্যায়ে উত্তর দিলো তখন আমি হতবাক হয়ে গেলাম।
সে নাকি এসএসসি পাশ করেছে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে।কলেজেও ভর্তি হয়েছে,দ্বাদশ শ্রেণীতে এইবার।কিন্তু বই-খাতা,কলম তাছাড়া শিক্ষার অন্যান্য খরচ চালানোর সামর্থ্য ওনার পরিবারের নেই।ওনার বাবা মারা গিয়েছেন তিন বছর হলো,মা আর ছোটো দুই ভাই-বোন রয়েছে।পরিবার ওনার পড়ালেখার খরচ চালাবে সেটা ভাবাই যায় না,বরং পুরো পরিবারকে তার চালাতে হয়।তার পরিবারের সবাই অবশ্য গ্রামে থাকে।মাসের শেষে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়।
কিন্তু ওনার ইচ্ছে ওনি পড়ালেখা করবেন।তাই বাবা মারা যাবার পর যখন পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়লো,উপার্জন করে পরিবার চালানো যখন অপরিহার্য হয়ে পড়লো,তখনও তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেননি।নিজ চেষ্টায় চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশোনা।নিজের পড়ালেখার খরচ নিজেকেই বহন করতে হয় তার।তারপরও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা করছেন।তার স্বপ্ন দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিবেন।
আমি বললাম,তাহলে বাসের হেলপারই কেনো হতে হবে,অন্য কোনো কাজ করা কি যেতো না?
সে বললো যে বাসের হেলপার এর কাজটা যেদিন ইচ্ছ হয় করতে পারেন,ইচ্ছে না হলে না করতে পারেন,বাধ্যবাধকতা নেই।যেদিন কলেজে যাওয়া বেশি জরুরি থাকে,সেদিন কাজে যান না,কলেজে যান।আর সারামাসে যে কদিনই কাজ করতে পারেন,তাতে নিজের থাকা-খাওয়া এবং পড়াশোনার খরচ চালিয়ে কিছু টাকা বাড়িতেও পাঠাতে পারেন।তাই বাসের হেলপারের কাজটাই করছেন আপাতত।
ছেলেটা আমার ছোট্ট বয়সের হৃদয়ে স্থান করে নিলো।আমার স্টপেজ চলে আসলো,বাস থেকে নেমে পড়লাম,পিছন ফিরে তাকিয়ে একবার তাকে আবার দেখলাম,সে হাত নেড়ে মুচকি হাসি দিয়ে আমাকে বিদায় জানালো।আমি স্টপেজ থেকে হেঁটে বাসায় যাচ্ছি আর ভাবছিলাম, কতো ধনীর ছেলে-মেয়েরা শত সুযোগ সুবিধা পাওয়ার পরেও পড়ালেখা করে না,আর ঐ বেচারা এই বয়সে নিজে উপার্জন করে পরিবার চালাচ্ছে,সাথে নিজের পড়ালেখার খরচ নিজে চালিয়ে পড়াশোনা করে যাচ্ছে।সে সত্যিই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
সেই বাসের হেলপার ভাইটির কথা কয়েকদিন পরপর মনে পড়ে।তখন ভাবি যে,ভাইটির স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছিলো কিনা,তিনি পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করতে পেরেছেন কিনা,বা এখন ভালো চাকরি পেয়েছেন কিনা!
সেটা জানার কোনো উপায় নেই,তবু কেনো জানি মনে হয়,জীবন যুদ্ধে হার না মানা এমন বীর কখনও পরাজিত হতে পারে না,তার স্বপ্ন অপূর্ণ থাকতে পারেই না...