আম্মার সাথে ছোটবেলায় হেঁটে হেঁটে নানুবাড়িতে যাওয়ার সময় একটু পর পর আমি রাস্তায় বসে পড়তাম।আম্মাকে বলতাম,আমি আর যেতে পারবো না কোলে করে নিয়ে যাও।আমার মনে আছে,পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ি,ঐ বয়সেও আম্মা আর বোনেরা আমাকে কোলে নিতো।যাইহোক, নানুবাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে তিন-চার কিলোমিটার দূরে হবে,মাঝখানে দুই গ্রাম পেরিয়েই নানুবাড়ি।তখন গ্রামের মাটির রাস্তা দিয়ে সহজলভ্য কোনো যানবাহন চলতো না,তাই হেঁটেই যেতে হতো।রিক্সা ছিলো,কিন্তু রিক্সা সবসময় সবজায়গায় পাওয়া যেতো না,রিক্সা আনতে বাজারে যেতে হবে,সেটাওতো আরেক ঝামেলা,ভাড়াও নাগালের বাইরে।
তাই হেঁটেই যেতেন আম্মা।আম্মা হেঁটে অনেকদূর চলে যেতেন আমি ধীরে ধীরে যেতাম,বসে থাকতাম।সারা পথ কোলে করে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হতো না আম্মার পক্ষে।আম্মা দ্রুত হেঁটে চলে যেতেন,আর আমার পা যেনো চলতো না,মনে হতো নানুবাড়ি যাওয়ার রাস্তা অসীম,শেষই হচ্ছে না।
আর এখনতো অটোরিক্সা বা অটো যেটাকে বলে,সেই অটোতো সব জায়গায় পাওয়া যায়।অটো দিয়ে খুব সহজেই নানুবাড়ি যাওয়া যায়।ভাড়াও অল্প,জনপ্রতি দশ টাকা।কিন্তু ঐ কিছুদিন আগে দুপুর বেলায় অটো পাওয়া যাচ্ছিল না।আম্মার সাথে সেই ছোটোবেলার মতো ঐদিনও নানুবাড়িতে যাচ্ছিলাম।আম্মা বললেন,চল হেঁটেই চলে যায়,অটোর জন্য আর কতোক্ষণ অপেক্ষা করবো।আমারও ছোটোবেলার কথা মনে পড়লো আর ভাবলাম,হ্যাঁ হেঁটে গেলে ভালোই হয়,ছোট সময়ের স্মৃতিচারণ হবে।আমি আর আম্মা পাশাপাশি হাঁটছিলাম,একটু পর দেখলাম,আমি দ্রুত চলে যাচ্ছি আম্মা পিছনে পড়ে যান বারবার।আম্মা বললেন,একটু ধীরে যাও আগের মতো আর এতো দ্রুত হাঁটতে পারি না,ক্লান্ত লাগে।
একসময় ছোট্ট আমার শক্তি ছিলো কম,আম্মার তখন জোয়ান বয়স শক্তি ছিলো বেশি,এখন আমার জোয়ান বয়স আমার শক্তি বেড়েছে,আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে আম্মার শক্তি কমেছে,আগের মতো আর পূর্ণ শক্তি দিয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না।মানুষের শক্তি সামর্থ্য ছোটো বয়সে কম থাকে, যৌবনে সর্বোচ্চ আর বৃদ্ধ বয়সে আবার বাচ্চাদের মতো শক্তি কমে যায়।
ছোট থাকতে মামা সাইকেল দৌড়াতেন আমি পিছনের সিটে বসে থাকতাম।মামার সাইকেলের পিছনের সিটে করে কতো জায়গায় গিয়েছি,মেলায় নিয়ে যেতেন,নানুবাড়ি থেকে বাড়িতে নিয়ে আসতেন।কয়েকদিন আগে মামা আমাদের বাড়িতে আসলেন,কোনো এক দরকারে মামা আর আমার একসাথে বাজারে যেতে হবে।মামার সেই পুরোনো সাইকেলটা এখনো আছে।ঐদিন সাইকেলের চালকের আসনে বসলাম আমি আর মামা পিছনের সিটে।এখন মামাকে নিয়ে সাইকেল দৌড়ানোর সামর্থ্য আমার হয়েছে,কিন্তু আমাকে পিছনের সিটে বসিয়ে সাইকেল দৌড়ানো মামার পক্ষে কষ্টসাধ্য বেপার।
কারণ ঐ মানবশক্তির উর্ধ্ব এবং নিম্নমান গ্রাফ।ছোটো সময় শক্তি থাকে কম,বয়স বাড়ার সাথে সাথে শক্তি বাড়তে থাকে,যৌবনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর আবার কমতে শুরু করে,বৃদ্ধ বয়সে আবার শিশুকালের মতো প্রায় শক্তিহীন হয়ে পড়ে।কথায় আছে,একটি শিশু আর একজন বৃদ্ধের মতো কোনো পার্থক্য নেই।