মেলায় যাইরে

Words
599
Reading
3 min
Listen
Play
5y

ছোটবেলায় মেলায় যেতাম,গ্রামে সাধারণত মেলা হয় ফাল্গুন মাসে আর বৈশাখ মাসের দিকে।শহরে চলে যাওয়ার পর আর মেলায় যাওয়া হয়ে উঠে না।ছুটির মিল পড়ে না,যখন মেলা হয় তখন গ্রামে আসা হয়ে উঠে না।শহরের বাণিজ্য মেলা,বই মেলা এসবের সাথে গ্রামের মেলার পার্থক্য প্রচুর।

IMG_20210314_160404.jpg

IMG_20210314_163848.jpg

আজকে অনেক দিন পর মেলায় গেলাম।আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামে মেলা।মেলার নাম "আদু পাগলার মেলা"। আদু শাহ্ পাগলা নামক একজনের মাজার।তার মাজারের বার্ষিক ওরশ শরীফ আয়োজন করা হয় ফাল্গুন মাসের শেষ শুক্রবার,সেই ওরশকে কেন্দ্র করেই মেলার আয়োজন।মোটামুটি বড় পরিসরে,অনেক দোকানপাট বসেছে।দোকানগুলো সাধারণত পলিথিন দিয়ে ছোটছোট কুটিরের মতো করে তৈরি।

IMG_20210314_161120.jpg

মেলায় গিয়েছি আমি, আমার বন্ধু পান্থ আর সোহান।এখনতো গ্রামে সবজায়গায় অটোরিকশায় যাওয়া যায়।অটোরিকশা দিয়ে বাড়ির সামনে থেকে সরাসরি মেলায় গিয়ে পৌঁছেছি।

IMG_20210314_162153.jpg

IMG_20210314_162156.jpg

মেলার প্রধান আকর্ষণইতো হচ্ছে নাগরদোলা বা চরকি।তিন ধরনের নাগরদোলা দেখলাম।স্বাভাবিক নাগরদোলা বলতে যা বুঝায় গোল চরকি।আরেকটা নৌকার মতো,এমন ভাবে বানানো যে,গভীর সমুদ্রে ঝড়ের কারণে ঢেউ উঠলে যে অনুভূতি হবে এই চরকিতে উঠলে সেই অনুভূতিই বোধহয় পাওয়া যাবে। আরেকটা চরকি ঘোড়ার অবয়ব তার মধ্যে বসার জায়গা।চরকি যখন চলে তখন মনে হবে ঘোড়া হয়তো তিরিং বিরিং করে লাফিয়ে চলেছে।আমি আর পান্থ চরকিতে উঠলাম,কিন্তু সোহান উঠতে চাইলো না,ওর নাকি ভয় করে।

IMG_20210314_162900.jpg

একজন বন্দুকের নিশানার দোকান নিয়ে বসেছে।ছোট ছোট বেলুন ফুটিয়ে রেখে দিয়েছে,আর বন্দুকের গুলি দিয়ে সেই বেলুন ফাটাতে হয়।দশটা গুলি বিশটাকা।আমিও চেষ্টা করলাম বেলুন ফাটাতে।আমি দশটা গুলি দিয়ে ছয়টা বেলুন ফাটিয়েছি,আর পান্থ সাতটা ফাটিয়েছে।

IMG_20210314_160317.jpg

IMG_20210314_164105.jpg

দোকানগুলোর বেশিরভাগই বাচ্চাদের খেলনার দোকান।প্লাস্টিকের খেলনায় বেশি,গাড়ি,আসবাবপত্র,পুতুল,বল,বেলুন,তীর,বন্দুক আরো কতোকি।আর মেয়েদের কসমেটিকসের দোকানও অনেক।মেয়েদের হাতের কাচের চুড়ি,চুল বাঁধার ফিতা,ক্লিপ,গলার হার,লকেট,কানের দুলসহ সবধরনের গয়না দিয়ে দোকান সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে দোকানিরা।মেলার দোকানিদের মূল ক্রেতাই নারী আর শিশু,অবশ্য ক্রয় করার টাকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষের পকেট থেকেই বের হচ্ছে।

IMG_20210314_164208.jpg

IMG_20210314_175836.jpg

গ্রামের মেলার আরেকটা বড় অংশ বা ঐতিহ্য হচ্ছে জিলাপির দোকান।মেলার যে জিলাপি তা সারাবছর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।জিলাপি আর খই,মুড়ির দোকান অনেকগুলো।তাছাড়া "ডালভুরি" নামক এক ধরনের ভাজাপোড়া আমাদের এলাকার ঐতিহ্য বাহী খাবার, এর দোকানও অনেকগুলো।এই দোকানগুলো বেশি হওয়ার কারণ এইগুলো বিক্রি হয় বেশি।তারপর খাবারের দোকানগুলো মধ্যে বসেছে আধুনিককালের ফুচকা,চটপটির দোকান,ফাস্টফুডের দোকান,ছোলা বুটের দোকান,চিংড়ি মাছ ভাজা,তাছাড়া সবধরনের ভাজাপোড়া যেমন,পেঁয়াজু, বেগুনি,আলুর চপ এসবের দোকান।আরেকটা একদম নতুন বিষয় দেখলাম,আচারের স্টল,শতশত রকমের আচার সাজানো,মনে হচ্ছিল জগতের সবধরনের আচার মনে হয় আছে ঐখানে।বাহারি রকমের জর্দা দিয়ে সাজানো পান,দই এর দোকানও বসেছে।

IMG_20210314_163244.jpg

IMG_20210314_163311.jpg

IMG_20210314_164003.jpg

মাটির তৈরি তৈজসপত্রের দোকানওতো গ্রাম বাংলার মেলার ঐতিহ্য।মাটির তৈরি হাড়ি পাতিল,ঢাকনা সাজানো,বাসনকোসন আগে থাকতো,কিন্তু আজ চোখে পড়লো না।মাটির তৈরি বাসন এখন আর কেউ ব্যবহার করে না।তাছড়া মাটির তৈরি খেলনা, গরু,ছোট মাটির চুলা,নৌকা,মাটির ব্যাংক।মাটির তৈরি খেলনাগুলো লাল রং করা।বাচ্চাদের হয়তো লাল রং আকর্ষণ করে বেশি।মাটির তৈরি খেলনা ছাড়াও অন্যান্য খেলনাতেও লাল রং এর প্রাধান্য বেশি বলে লক্ষ্য করলাম।

IMG_20210314_174017.jpg

IMG_20210314_182718.jpg

বাঁশ দিয়ে তৈরি হাতপাখা,ঝুড়ি,মোড়া(টুল),টুপি ইত্যাদি আরো কিছু জিনিসপত্র নিয়ে বসেছে একজন।আরেকটা দোকান দেখলাম "কাঠ দিয়ে তৈরি নাম" সাজানো।বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েদের কমন নামগুলোর সবই আছে।আর বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের নাম কিছু নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ।তবে ইদানীং শিক্ষিত সমাজের পিতা-মাতারা নতুন নতুন নাম রাখছে সন্তানের,যাতে অন্যের সাথে না মিলে।
বাদ্যযন্তের ছোট একটা দোকানও দেখতে পেয়েছি।

সবকিছুই খুব ভালোভাবে দেখলাম যাচাই করলাম,কিন্তু কিনলাম না কিছুই।কিনার প্রয়োজনও হলো না,আগেই বলেছি মেলায় বেশিরভাগই মেয়েদের আর বাচ্চাদের জিনিস।আর আমাদের সাথে না ছিলো কোনো মেয়ে,না ছিলো কোনো বাচ্চা।খাওয়া-ধাওয়া করেছি,যেসব খাবারের দোকান বসেছে সবগুলো থেকেই অল্প অল্প করে খেয়েছি।সবশেষে জিলাপি আর ডালভুরি কিনে মিষ্টি পান মুখে দিয়ে মেলা থেকে বের হয়ে এসেছি।

মেলা শব্দের অর্থ হচ্ছে মিলন,সব জনতা মিলে সত্যিই আনন্দঘন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে।মেলার প্রবেশ থেকে প্রস্থান করার মাঝের সময়টুকু শুধুই আনন্দের।তবে আজকের মেলায় গিয়ে একটাই কষ্টের দৃশ্য চোখে পড়লো,এক গরীব বাচ্চা ছেঁড়া-কাপড়, চুরি করে খাবারের দোকান থেকে কয়েকটা খাবার মুঠোর মধ্যে নিয়ে খাচ্ছে।আমার চোখ ওর চোখে পড়তেই হাতে মিনতি করে বলছে,যাতে দোকানিকে না বলি।
তখন অল্প সময়ের জন্য মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লো।মনে হলো,মেলার এই আনন্দ তাদের জন্য না,বরং এই মেলা তাদের কষ্ট বাড়িয়ে দেয়,তারা যখন দেখে তাদের সমবয়সী কাউকে তাদের বাবা-মা আদর করে এটা-ওটা কিনে দিচ্ছে,কিন্তু তাদেরকে কিনে দেওয়ার "কেউ" নেই,হয়তো "কেউ" আছে কিন্তু কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নেই।

মেলায় যাইরে | Ecency