জহির বেপারির বুদ্ধি,পরিকল্পনা শুনে আসমা অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলো আজ হোক কাল হোক তাদের মাতো মরবেই,তার ওপর তিনি অসুস্থ।কিন্তু এখন যদি তিনি মরেন তাহলে তাদের অনেক লাভ হবে।আসমার মনে তখন জমির লোভ ছাড়া আর কিছু কাজ করছিলো না,তার বিবেক তখন তালাবদ্ধ ছিলো।সে নিজের মনকে বুঝালো তার সাথে আকলিমা আর আফিয়াকে ও বুঝালো।কিন্তু সবার থেকে ছোট বোন আছিয়া যে কিনা শুধু মার সেবা করে আসছে সে আর তার মা জানতেও পারলো না তাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে।মা বুঝতেও পারলো না তার মেয়েদের পরিকল্পনায় তার মৃত্যু হবে।
তারিখ ঠিক করে,জহির বেপারি কে জানানো হলো।ঐদিন ছোট বোন আছিয়াকে তাদের নানিবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো,আর তাদের একমাত্র ভাইতো বাড়িতে থাকে না কাজ করে অন্য এলাকায়।তাই তাদের পরিকল্পনা ফলাতে সহজ হলো।
জহির বেপারি দলবল নিয়ে ভোর বেলা হাজির হলো।তিন বোন ধরাধরি করে মাকে সুবিধা মতো একটি চৌকিতে শুইয়ে দিলো।মা বললো," কি হলো আমাকে এই খাট থেকে ঐ চৌকিতে নিচ্ছিস কেনো,আর তোদের চোখ-মুখ এমন শুকনা লাগছে কেনো,আছিয়াটাও আজকে নেই,কেমন জানি লাগছে"।
-আম্মা চুপ থাকো তো।
আসমা গিয়ে জহির বেপারি কে ডাক দিলো,সে তিনটা ছেলেকে সাথে নিয়ে এসেছে তারা ঘরে প্রবেশ করলো।
জহির বেপারি বললো,"তোমরা বাহিরে গিয়ে দাঁড়াও সহ্য করতে পারবে না"।
আকলিমা আর আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বাহিরে চলে গেলো,আসমা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো।
মা বলতে লাগলো,"কি হচ্ছে এসব, আমাকে কি হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করছিস নাকি,এই ছেলেরা আমাকে কোন হাসপাতালে নিবা..."
কথা বলা শেষ না হতেই একটা ছেলেটা আসামাদের মায়ের মুখ চেপে ধরলো,আরেকজন হাত-পা চেপে ধরলো,জহির বেপারি বললো,ঐ তুই চুরি চালা,আরেকটা ছেলে সাথে সাথে অসুস্থ মহিলাটি যে কিনা,একটু চিকিৎসার আশা করছিলো সুস্থ হওয়ার জন্য তার গলায় চুরি চালিয়ে দিলো,ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।আসমা দরজা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে যেন পাথরের মূর্তি।
নড়াচড়া করার বেশি শক্তি ছিলো না,তারপরও একটু নড়ার চেষ্টা করে,আজীবনের জন্য স্তব্ধ হলো আসমাদের মা।
দ্রুত জহির বেপারি আর তার দলবল বাড়ির পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে গেলো।তিন বোন দৌড়িয়ে ঘরে আসলো আর চিৎকার করে কান্না করতে লাগলো।
"হাই হাইরে কে কোথায় আছেন,আমার মারে মতিননিয়া খুন করে ফেলছেরে"
"এই একটা জমির জন্য শেষ পর্যন্ত আমার মারে মেরে ফেললো"
"আব্বার জমিটাতে আমরা একটা ঘর তুলতে গেছিলাম এইটাই কি আমাদের অপরাধ,তার জন্য আমার মাকে মেরে ফেললো"
এই ধরনের কথা বলে চিল্লাতে লাগলো।
মতিন মিঞার বাড়ি আসমাদের বাড়ির পাশেই।সে সকাল বেলা উঠে ফজরের নামাজ পড়ে,বাড়ির সামনে একটু পায়চারি করছে।এইধরনের চিল্লা পাল্লা শুনে আর তার নামে এইধরনের অপবাদ শুনে সে কি করবে বুঝতে না পেরে,পালিয়ে চলে গেলো।
লোকজন আসলো,আসমারা লোকজনকে বুঝাতে সচেষ্ট হলো যে ঐ জমি নিয়ে দ্বন্ধের কারণেই মতিন মিঞা তাদের মাকে খুন করেছে।
থানায় খবর দেওয়া হলো,পুলিশ আসলো।সকলের কথা শুনে মতিন মিঞাকে ধরার জন্য লোক পাঠানো হলো।
মতিন মিঞা বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারলো না,ধরা পড়লো,পুলিশ থাকে ধরে নিয়ে গেলো।
আসমারা যা চেয়েছিলো তাই হয়েছে,তাদের পথের কাঁটা পরিষ্কার হয়েছে।মতিন মিঞার নিজের বাড়ি-ঘরই পড়ে রইলো, আর ঐ রাস্তার পাশের জমি কে দেখে।কিছুদিনের মধ্যেই আসমারা ঐ জমি নিজেদের দখলে নিলো।
মার মৃত্যুর গন্ধ বাতাস থেকে যাওয়ার আগেই সেই জমিতে তারা ঘর তুললো।এইদিকে মতিন মিঞা জেলে বন্ধি।আদালতে মামলা চলতে লাগলো।
কিছুদিন পরের কথা।এক ডাকাত দল তাদের ডাকাতির পরিকল্পনা করছে,সদর এলাকায় ডাকাতি করবে।ডাকাত দলের এক সদস্যের সাথে মতের অমিল হওয়ায় ডাকাত দলের অন্যান্যরা তাকে দল থেকে বের করে দেয়।এরপর তারা যেদিন ডাকাতি করতে যাবে,সেদিন দল থেকে বহির্ভূত সদস্য পুলিশকে ফোন করে ডাকাতির যে পরিকল্পনা তার সঙ্গীরা করেছিলো,তা বলে দেয়।পুলিশ আগে থেকে ঐ জায়গায় গিয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকে,ডাকাত দল আসতেই সবাইকে তারা গ্রেফতার করে।
এই ডাকাত দলের মধ্যে ছিলো জহির বেপারি সাথে থাকা তিনটা ছেলের একজন যে কিনা আসমাদের মাকে চুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে।
পুলিশ ডাকাত দলের সব সদস্যদের রিমান্ডে নেয়।
পুলিশ নাকি একবার কোনো আসামি ধরলে ঐ থানায় যতগুলো মামলা আছে সবগুলোর বেপারেই কড়াভাবে জিজ্ঞেস করে।কারণ অপরাধ জগতের সবার একে অপরের সাথে যোগাযোগ থাকে।
পুলিশ তাদেরকে আসমাদের মায়ের খুনের মামলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।পুলিশ সদস্যগুলো ছিলো খুবি চতুর।তারা মতিন মিঞার ব্যবহার দেখে বুঝতে পারে যে এই ব্যক্তি খুন করতে পারে না।কিন্তু প্রমাণের অভাবে তাকে আটক রাখতে হয়।যার কারণে অন্যান্য দিকেও সেই খুনের বেপার খুঁজ খবর নিতো তারা।গ্রামের কিছু লোক এই বেপারে বলেছিলো যে,জহির বেপারি আসামাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করতো এই খুনের কিছুদিন আগে।আর জহির বেপারির সাথে এই ছেলের সম্পর্ক আছে তা গ্রামের লোক জানতো।এইজন্য কঠোরভাবে জিজ্ঞেসাবাদ করা হয় ডাকাত দলের ঐ ছেলেটাকে।
পুলিশ এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে যে সে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে আসমাদের মায়ের খুনের সম্পর্কে সে জানে এবং সে নিজেও জড়িত ছিলো।অতঃপর সে সব ঘটনা খুলে বলে।তখন পুলিশ এসে তিন বোন আর জহির বেপারিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় আর মতিন মিঞাকে বেকসুর খালাস দেয়।মানুষ সত্য ঘটনাটা জানতে পারে,আসলে কি হয়েছিলো সেদিন ভোরে।মতিন মিঞা তার জমি ফেরত পায়।
আসমারা নারী হওয়ার কারণে হয়তো তাদের বড় কোনো শাস্তি হবে না,কিন্তু এই ঘটনা ঐ এলাকার ইতিহাসে নিকৃষ্টতম ঘটনা,আর এই তিনবোন এলাকার নিকৃষ্টতম মানুষ হিসাবে পরিচিতি পায়,বিশেষ করে পিশাচী আসমা।
হাইরে আসমা,এই সামান্য জমির জন্য নিজের মাকে খুন কেমনে করতে পারলি,তুই কি মানুষ নাকি বিবেকহীন,লোভী নরপশু...এলাকার আকাশে-বাতাসে শুধু এই প্রতিধ্বনি।
সমাপ্ত