ভাইরাস,ভ্যাক্সিন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাঃ দেশ এবং সেনাবাহিনী
প্রতিটি দেশের সেনাবাহিনী রয়েছে।আর সেনাবাহিনী থাকার প্রধান কারণ তারা দেশকে শত্রু বাহিনির হাত থেকে রক্ষা করবে।
বহির্শত্রুরা যখন আক্রমণ করবে তখন তাদের সাথে যুদ্ধ করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা,দেশকে শান্তিতে রাখা সেই সেনাবাহিনীর প্রধান দায়িত্ব।আমাদের দেহেও এইরকম একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে যেখানে সেনাবাহিনি আছে,আছে বিভিন্ন পদের সেনা এবং তারা প্রতিনিয়ত আমাদের দেহকে বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে যাচ্ছে আমাদের অজান্তেই,এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বলে Immune system.ভ্যাক্সিন বা টিকা সেই ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
আমাদের দেহের ভিতর সর্বত্র রক্ত প্রবাহ বিদ্যমান।রক্ত প্রবাহিত হয়,শিরা,উপশিরা,ধমণি ইত্যাদি দিয়ে।তো রক্তের উপাদানগুলোর মধ্যে একটি উপাদানের নাম শ্বেত রক্তকণিকা(White blood cell)।শ্বেত রক্তকণিকার একটি সেলের নাম লিম্পোসাইট এর মধ্যে রয়েছে B cell,T cell,Memory cell নামের কিছু সেল বা কোষ যা সম্মিলিতভাবে আমাদের দেহের সেনাবাহিনী হিসাবে কাজ করে।বাহির থেকে যখন কোনো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া,ভাইরাস বা রোগজীবাণু দেহে প্রবেশ করে নাক,কান,মুখ,চোখ,যৌনাঙ্গ ইত্যাদি পার হয়ে তখন প্রথমেই বি সেল এবং টি সেল শনাক্ত করার চেষ্টা করে " ফরেন পার্টিকল" বা বহিরাগত কণাটি কি দেহের জন্য ক্ষতিকর নাকি উপকারি।এটা অনেকটা সীমন্তের চেকপোস্টের মতো।
যদি উপকারি হয়,তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়,কিন্তু অপকারী হলে B cell এন্টিবডি তৈরি করে ঐ কণাটির বিরুদ্ধে, যা কণাটির সাথে বন্ধন তৈরি করে কণাটিকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে বা ফ্যাগোসাইটোসিস নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হজম করে ফেলে বা মেরে ফেলে।এর মাঝে আরেকটি কাজ হয়,মেমোরি সেল নামে একটি সেল সেই বিহরাগত কণাটির বৈশিষ্ট্যগুলো স্মৃতিহিসাবে জমা রাখে যাতে পরবর্তীতে ঐ কণাটি আবার প্রবেশ করলে যাচাই-বাছাই করে সময় নষ্ট করতে না হয়,সরাসরি আক্রমণ করা যায়।যেমন, কারো একবার বসন্ত রোগ হয়ে গেলে পরবর্তীতে আর হয় না।এর কারণ হচ্ছে,দেহের শ্বেত রক্তকণিকার মেমোরি সেলগুলো বসন্তরোগের জীবণুকে চিনে রাখে, ফলে পরবর্তীতে বসন্তরোগের জীবাণু দেহে প্রবেশের সাথে সাথেই অন্যান্য লিম্পোসাইটগুলো ঐ জীবাণুকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে।
কিন্তু সবরোগের জীবাণু সাধারণ বৈশিষ্ট্যের হয় না,কিছু আছে বৈচিত্র্যময়,যা মেমোরি সেলের চিনতে পারা ক্ষমতার উর্ধ্বে।তাদের ক্ষেত্রে দেহে অবস্থিত স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়।তো সেক্ষেত্রে কি হবে?সেলগুলোকে পূর্ব থেকে শত্রুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।সেটি কিভাবে করা যাবে?
সেক্ষেত্রে ভ্যাক্সিন বা টিকা দেওয়া হয় বাহির থেকে।সেই টিকার কাজ কি?অনেকেই মনে করেন যে ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে হয়তোবা শরীরে এন্টিবডি ঢুকানো হয় বা ভ্যাক্সিন এমন কিছু যা শরীরে এন্টিবডি তৈরি করে।কিন্তু আসলে বেপারটা এমন না।
সত্যি বলতে ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো হয় কোনো নির্দিষ্টরোগের জীবাণুর মৃত অংশ।সেটা হতে পারে রোগজীবাণুটির নিউক্লিয়াস,স্পাইক বা যেকোনো অংশ তবে মৃত।তো এই মৃত অংশ ঢুকানোর কারণ কি?এর কারণ হচ্ছে পূর্বে যে বলা হল,বি সেল আর টি সেলগুলো রোগজীবাণুকে শনাক্ত করতে কাজ করে।কিন্তু বৈচিত্র্যময় ভাইরাসের ক্ষেত্রে সেগুলোকে শনাক্ত করতে সময় বেশি লাগে এর মধ্যে সেই ভাইরাস দেহে বংশবিস্তার করে শক্তিশালী হয়ে যায়,যার কারণে বি সেল আর টি সেলের সেনাবাহিনী যুদ্ধে পরাস্ত হয়।এখন ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে যে মৃত অংশ শরীরে ঢুকানো হল সেটাকে শনাক্ত করতে কাজ শুরু করে দেয় সেই সেলগুলো।জীবাণুটিকে ক্ষতিকর হিসাবে শনাক্ত করার পর তারা দুটি কাজ করে,প্রথমমত মেমোরি সেলে স্মৃতি শনাক্ত করে রাখে যে এই কণিকাটি ক্ষতিকর,দ্বিতীয় এর বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করে রাখে।
বর্তমানে সারা বিশ্বে করোনা মহামারি চলছে।এটি করোনা নামক ভাইরাস ধারা সংক্রমিত একটি রোগ।করোনার ভ্যাক্সিন উদ্ভাবিত হয়েছে।এটি কিভাবে কাজ করে এই প্রশ্ন অনেকের মনে।
যখন কোনো ব্যক্তির শরীরে করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন ঢুকানো হবে,মানে করোনা ভাইরাসের একটি মৃত অংশ প্রবেশ করানো হবে।মৃত অংশটির প্রবেশ আঁচ করে বি সেল এবং টি সেল হানা দিবে এবং এটিকে ক্ষতিকর হিসাবে শনাক্ত করবে,শনাক্ত করার সাথে সাথেই মেমোরি সেলে সেই স্মৃতি জমা হবে আর এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি সৃষ্টি শুরু হবে।কিন্তু সেই ভাইরাসের মৃত অংশটিতো শরীরের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না,আর সেটিকে ধ্বংস করার জন্য কোনো এন্টিবডির কাজ করতে হবে না,সেগুলো শরীরে জমা থাকবে।পরবর্তীতে কোনো করোনা ভাইরাস প্রবেশ করার সাথে সাথে এন্টিবডিগুলো ভাইরাসটিকে মেরে ফেলবে।তাছাড়া ভাইরাস প্রবেশ করার সাথে সাথেই ভাইরাসটিকে ক্ষতিকর হিসাবে শনাক্ত করে প্রচুর এন্টিবডি তৈরি শুরু করবে,কারণ তারা আগে থেকেই শত্রুর সাথে পরিচিত।
এখন যদি করোনার কোনো ভ্যাক্সিন দেওয়া হয় নি এমন শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করে তখন কি হবে?তখন বি সেল আর টি সেল ভাইরাসটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা করবে,আর সেটা করতে যে সময় লাগবে তার মধ্যে করোনা ভাইরাস দেহে বংশবিস্তার করে বড় দল গঠন করে ফেলবে যা দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেহকে তার দখলে নিয়ে নিবে আর সেই ব্যক্তি ঐ রোগে আক্রান্ত হবে।
সহজ কথায় ভ্যাক্সিন দেহকে আগে থেকেই শত্রুকে চিনিয়ে রাখে যাতে শত্রু আক্রমণ করলে, যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য সময় নষ্ট না করে,সরাসরি পাল্টা আক্রমণ করে শত্রুকে তৎক্ষনাৎ পরাজিত করা যায়।