আমার জন্ম গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে।ছোটবেলায় দাদুর কাছ থেকে গল্প শুনেছি শহরের বাচ্চারা নাকি ধান গাছ চিনেনা।কবে নাকি একজন জিজ্ঞেস করেছিল,ধানের গাছ দিয়ে কি আসবাবপত্র তৈরি করা যায়!ছোটবেলা এ গল্প শুনে খুব মজা পেতাম।তাই প্রায়ই দাদুর কাছে একি গল্প বার বার শুনতে চাইতাম।সেই তখন থেকে ঢাকা কল্পনা জগতের এক রঙিন শহর।তার উপর আবার দ্বিতীয় শ্রেণিতে "আজব শহর" কবিতায় ঢাকা শহরের বর্ণনা পড়ে এ শহর হয়ে উঠেছিলো স্বপ্নের রাজ্য।
আমার ছোট চাচা ঢাকা থাকেন।তিনি মাওলানা মানুষ।সবসময় সুগন্ধি লেগে থাকে তার পোশাকে।তিনি যখন বাড়িতে আসতেন সবার থেকে আলাদা মনে হতো তাকে।তখন আমি ভাবতাম নিশ্চয়ই ঢাকা এমন বিশেষ কিছু যার জন্য মানুষের গা থেকে এতো সুন্দর গন্ধ বের হয়।আমাদের গাঁয়ে একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন।তারা কোথায় থাকতেন জানিনা,কিন্তু শহরে থাকতেন,আর তখন শহর বলতে ঢাকাকেই বুঝতাম।ওনারা যখন গ্রামে আসতেন তখন ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আসতেন।আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যেতেন।গাড়ির শব্দ শুনে আমরা দৌড়ে যেতাম একনজরে দেখার জন্য,পিছনে দৌড়াতাম।
গ্রামের মানুষের মুখে প্রায়ই শুনতাম ঢাকায় নাকি টাকা উড়ে।তখন চোখ বন্ধ করে ভাবতাম টাকার কি পাখা আছে,পাখির মতো উড়ে নাকি গাছের পাতার মতো ঝরে পড়ে সবজায়গাই আরও কতকি।
আমি যখন খুব ছোট ছিলাম আম্মা তখন একবার কাকার বাসায় গিয়েছিলেন।যদিও তখন আমার বয়স ছিলো চার-পাঁচ মাস।আম্মার কাছে এই গল্প শুনেছি অনেকবার।তাই আমি বন্ধুদের সাথে গল্প করতাম,আমিতো ঢাকায় গিয়েছি,পনেরো দিন আমি ঢাকায় ছিলাম জানিস তোরা।তারা তখন আমার কাছে ঢাকার গল্প শুনতে চাইতো,আমি তখন আম্মার কাছে শুনে বলে দিতাম।
আমি যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি তখন আমার মামাতো ভাই বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়।যদিও এই প্রতিষ্ঠান সাভারে,তবুও তখন সেটা আমাদের কাছে ঢাকা।তখন মামা-মামী মাসে একবার যেতো ঢাকায় আমার মামাতো ভাই মারুফ এর সাথে দেখা করতে,এটাকে 'পেরেন্টস ডে' বলা হতো।মামা প্রতি মাসে একজনকে নিয়ে যেতেন শহর দেখানোর জন্য।সবার শেষে আসলো আমার পালা।মামা আগেই বলেছিলেন এ মাসের পেরেন্টস ডেতে আমাকে নিয়ে যাবেন।মাসের শেষ শনিবার পেরেন্টস ডে।আমি শুক্রবার সকালে মামা বাড়িতে চলে গেলাম।শনিবার ভোর পাঁচটায় মামীআম্মা ডেকে উঠালেন,সেদিন আমরা চারজন যাবো,সকাল সকাল দুটো রিক্সা ডেকে আনা হয়েছে।রিক্সা দিয়ে প্রথমে উপজেলার বাজার সেখান থেকে নৌকা দিয়ে ছোট্ট একটা নদী,নদী পাড় হয়ে সেখান থেকে রিক্সা দিয়ে বাস স্টেশন।
বাস স্টেশন টোক নামক জায়গায়।সেখান থেকে বাসে উঠলাম।বাস ছাড়ার পর বাসের জানালা দিয়ে যখন বাহিরে তাকালাম আমার মনে হচ্ছে গাছপালা,বাড়িঘর সব ছুটে চলেছে আমার সাথে।ত্রিশ মিনিটের মতো যাওয়ার পর আমার শুরু হলো মাথা ঘুরানো।কিছুতেই মাথা উঠাতে পারছিলাম না।এক ঘন্টার মতো যাওয়ার পর শুরু হলো জ্যাম,পাঁচমিনিট পর পর ধাক্কা মেরে মেরে গাড়ি থামে।চারদিকে হর্ণের বিকট শব্দ।এভাবে প্রায় দেড়ঘন্টা যাওয়ার পর আমরা পৌঁছালাম।আমরা যখন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকি তখন এগারোটা বাজে।সেদিন কোনো একটা কারণে পেরেন্টস মিটিং বন্ধ রাখা হয়েছিল।তখন মোবাইল ছিলো না,কর্তৃপক্ষ মামাকে চিঠি দিয়েছিলেন,কিন্তু চিঠি মামা হাতে পাননি,তাই ভুল করে চলে গেলেন।
তারপর গেইটে বলার পর আমাদের ঢুকতে দেওয়া হলো,মারুফ ভাইকেও ডেকে দেওয়া হলো।মামারা প্রতিমাসে যান,কিন্তু আমাকে দেখানোর জন্য মারুফ ভাই ওর অনুশীলনের মাঠ,ক্লাস রুম,হল সবই ঘুরালো।অনেক বড় জায়গা আসলেই অন্য রকম।আমার কল্পনার শহরের সাথে মিলে যাচ্ছে।দুই ঘন্টা পর আমরা বিকেএসপি থেকে বের হলাম।মামা নিয়ে যাচ্ছেন খাবার হোটেলে খাওয়ানোর জন্য।
রাস্তার পাশ দিয়ে খোলা ড্রেন,প্রচন্ড গন্ধ,কালচে রঙের একটা পাখি কা কা করছে,ডাক শুনে বুঝা যাচ্ছে কাক।কিন্তু আমাদের গ্রামের কাকতো কুচকুচে কালো বড় আকারের একটি পাখি।সেটার সাথেতো এর কোনো মিল নেই।মামা বললেন এটা দাঁড় কাক।চারদিকে মানুষের হট্টগোল,যানবাহনের হর্ণ,দাঁড় কাকের বিভৎস চিৎকার,প্রচন্ড গরম সব মিলিয়ে আমার যেন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা।সেদিন আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছিল খোলা ড্রেনের দুর্গন্ধ।
তারপর এখান থেকে আমরা যাই এক হেফজ খানা মাদ্রাসায়,যেখানে আমার এক দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই এর ছেলে হাফেজিয়া পড়তো।ওর মা একা ছেলেকে দেখতে যেতে পারে না,তাই মামার সাথে এসেছেন।সেখানে আরও খারাপ অবস্থা ছোট ছোট সব গলি।গলির রাস্তার পাশ দিয়ে খোলা ড্রেন।সত্যিই বীভৎস লেগেছিল সেদিন।
এই অল্প দেখে আমার মনে হয়েছিলো,ঢাকা শহর খুব নোংরা একটা জায়গা।তাই এর পর থেকে আমার আর এইখানে আসার কোনো ইচ্ছা ছিলো না।কিন্তু আমার বড় আপা যখন অনার্স করার জন্য ঢাকা আসে,তখন থেকে আবার ঢাকা শহর ভালো লাগতো।সেই ধারাবাহিকতায় আমিও আজ ঢাকা শহরের বাসিন্দা।যদিও এটা আমার কাছে খুব দুর্ভাগ্য মনে হয়।গ্রাম যে আমার বড়ই আপন প্রাণের চেয়ে প্রিয়।তাই বলে কেউ ভুল করে ভুল বুঝবেন না প্রিয় শহরবাসীগণ।ঢাকা শহরের গুণাবলী আমারও আছে জানা,
এখানে আছে সাদাসাদা সুখ,
রঙিন বিলাসিতা।
সাগরেরসম চাওয়া সেখানে,
পাহাড়েরসম পাওয়া।
কিন্তু এই যে কাঁদামাটিতে জন্ম আমার,
সবুজ গাছের ছায়ায়।
সোনার খাট,রুপার পালঙ্ক,
আমাকে কি মানায়!
সমাপ্ত