বাড়িওয়ালী

Words
843
Reading
4 min
Listen
Play
4y

bari20160512075912.jpg

নার্গিস গ্রামের মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে।চার ভাইবোনের মধ্যে ও সবার ছোটো।বড় দুই ভাই স্কুলের গন্ডই পার হওয়ার আগেই বাবার সাথে ব্যবসায় যোগ দেয়।বড় বোনকে দশম শ্রেণীতে উঠার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।নার্গিস সবার খুব আদরের।ওকে নিয়ে বাবা-মা, ভাই-বোনের অনেক আশা।ওকে উচ্চশিক্ষিত করবে।বড় চাকরি করবে,পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে।নার্গিসও পড়ালেখায় খুব ভালো।তারও ইচ্ছা পড়ালেখা করে বিসিএস ক্যাডার হবে।

এসএসসি ও এইচএসসিতে নার্গিস খুব ভালো ফলাফল করলো।এরপর অনার্স ভর্তির জন্য ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকার এক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগও পেয়ে যায়।নার্গিসের বড় বোন স্বামীর সাথে ফার্মগেট থাকেন।নার্গিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বোনের বাসায় থাকতে শুরু করলো।ভালো চলছিলো তার পড়ালেখা।ওরা যে বাসায় থাকতো সে বাসার পাশে বাড়িওয়ালারাও থাকতো।বাড়িওয়ালাদের সাথে তার বোনের ভালো সম্পর্ক,তাই যাওয়া আসা লেগেই থাকে।

বাড়িওয়ালার একমাত্র ছেলেকে নতুন বিয়ে দিয়েছে।বউ নার্গিসের সমবয়সী। পরিচয় হওয়ার পর বউ এর সাথে নার্গিসের ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো।তার উপর বাড়িওয়ালীর ছেলের বউ নার্গিসের সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করে।ওদের নিজস্ব গাড়ি আছে,বউ সেটা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়।এখন নার্গিসকে প্রতিদিন নিয়ে যায়।দুইজন মেয়ে যখন একসাথে চলাফেরা করে তখন তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।বিশেষ করে শাড়ি-গহনা,সুখ সাচ্ছন্দ্য ইত্যাদি।আর এখানে বাড়িওয়ালীর পুত্রবধূর নতুন বিয়ে হয়েছে,সে বিয়েতে কি গহনা পেয়েছে,কতগুলো শাড়ি পেয়েছে,কি কি আসবাবপত্র পেয়েছে এ পর্যন্ত কতো টাকা সালামি পেয়েছে এসব গল্প নার্গিসের সাথে করতো।

নার্গিস মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে এসব শুনে ওর খুব ভালো লাগতো।খুব আগ্রহ সহকারে ওর গল্প শুনতো।বাড়িওয়ালীর পুত্রবধূ একদিন বললো,তোমার ভাই ব্যবসায়ের কাজে বাহিরে গেছে,আজ ফিরবে না, আজ তুমি আমার সাথে ঘুমাবে।নার্গিস বললো,আচ্ছা ঠিক আছে।রাতের খাওয়াদাওয়ার পর নার্গিস ওর বোনের কাছে বলে বাড়িওয়ালীর পুত্রবধূর সাথে ঘুমাতে গেলো।নার্গিস গিয়ে দেখে ওরা এখনো ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত না।সবাই ড্রয়িং রুমে বসে গল্প করছে।বাড়িওয়ালীর পুত্রবধু সবার খাওয়া দাওয়ার পর কাজের মেয়েকে থালা বাটি ধোঁয়ার জন্য দিয়ে বাড়তি খাবার গুলো ফ্রিজে উঠিয়ে রাখছে।নার্গিস লক্ষ্য করলো তিন দরজার বড় একটা ফ্রিজ।ফ্রিজের ভিতরে বিভিন্ন ফল,ফলের জুস আরও কত কি।

এর মধ্যে বাড়িওয়ালী নার্গিসকে বললো, চলো আমার রুমে।বৌমা সব গুছিয়ে নিতে নিতে তুমি আমি মিলে গল্প করি।নার্গিস ওনার সাথে গেলো।তিনি নার্গিসকে ওনার ঘরে নিয়ে সোফায় বসতে বললেন।বিভিন্ন ধরনের গল্প করতে করতে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।খুব সুন্দর একটা নাইট ড্রেস পড়ে,রাতের বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করে যখন নার্গিসের কাছে বসলেন নার্গিসের কাছে মনে হচ্ছিল যেনো একজন মহারাণী।ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।বাড়িওয়ালী বললো,তুমি কি আমাকে কিছু বলবে?নার্গিস বললো,না মানে আপনার নাইটি টা খুব সুন্দর।
ও এটার কথা বলছো!এটা তোমার আঙ্কেল কিছুদিন আগে সিঙ্গাপুর থেকে আট হাজার টাকা দিয়ে কিনে এনেছেন।আমারও খুব পছন্দ হয়েছে,পড়তেও খুব আরামদায়ক।

এর মধ্যে বাড়িওয়ালীর পুত্রবধূ ডাকলো,নার্গিস আসো আমরা শুয়ে পড়ি।
আচ্ছা আন্টি আমি তাহলে শুতে যায়,বলে নার্গিস চলে গেলো।
বাড়িওয়ালীর পুত্রবধূর রুমটা বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করছিলো।দামী দামী আসবাবপত্র,ড্রেসিংটেবিলের উপর নামি-দামি প্রসাধনী,নার্গিস অবাক দৃষ্টিতে দেখছে।এর মধ্যে আবার বাড়িওয়ালীর পুত্রবধূ বলে উঠলো,আজ আমি আমার সব শাড়ি গহনা তোমাকে দেখাবো।
ও আলমারী থেকে গয়নার বাক্স আর শাড়ি বের করতে শুরু করলো।নার্গিস ভেবে পাচ্ছেনা এটা কি গয়নার দোকান নাকি,ও চুপচাপ সব দেখলো।তারপর ঘুমিয়ে গেলো।

সকালে বোনের বাসায় আসলো,তারপর সারাক্ষণ গতরাতের কথা ভাবছে।এটা কি স্বর্গরাজ্য!কি নেই ওদের?এতো কষ্ট করে পড়ালেখা করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে কি হবে,এর চাইতে ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালী হতে পারলেইতো রাণী হওয়া যাবে।আমি রাণী হতে চাই।
এমনিতেও নার্গিস খুব সুন্দরী আর শৌখিন,নিজেকে সাজিয়ে রাখতেও খুব পছন্দ করে।বাড়িওয়ালীর পূত্রবধুর নাম বনি।কাল থেকে নার্গিসের মাথায় একি চিন্তা, বনি কি আমার চাইতে সুন্দরী! বনি যদি এতো কিছু পেতে পারে,তাহলে আমিও পাবো,নার্গিসের এখন পড়ালেখায় কোনো মন নেই।ওর চিন্তা বাড়িওয়ালার কোনো ছেলের সাথে সম্পর্ক করতে হবে।তাহলেই বাড়িওয়ালী হওয়া সম্ভব।

বাড়িওয়ালার বোনের ছেলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।সে প্রায়ই মামার বাড়িতে বেড়াতে আসে।নার্গিস ওর সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করে।কৌশলে ওর ফোন নাম্বার জোগাড় করে,এরপর একদিন লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে নেজেই ওকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়।বাবু তক্ষুনি প্রস্তাব গ্রহণ করে,ওদের মধ্যে সম্পর্ক শুরু হয়।নার্গিস ভীষণ খুশি।সম্পর্কের তিন মাস না পেরোতেই বাবু নার্গিসকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিলো।নার্গিস ভাবলো ওর প্রস্তাবে রাজি না হলে যদি ও আমাকে ছেড়ে দেয় তাই রাজি হয়ে গেলো।বাবু ওকে আবাসিক হোটেলে নিয়ে এক রাত থাকলো।বাবু নার্গিসকে বললো,তুমি আর তোমার বোনের বাসায় থাকবে না,আলাদা রুম নাও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে,তাহলে আমি সব সময় যেতে পারবো।

নার্গিস বোনকে বুঝিয়ে আলাদা রুম নিলো।সেখানে বাবুকে স্বামী হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিলো বাড়িওয়ালার কাছে।বাবু সব সময় যাওয়া আসা করে,এভাবে তিন বছর কেটে গেলো।হঠাৎ একদিন নার্গিস বোনের বাসায় গেলো,গিয়ে দেখে সবাই বাবুদের বাসায় যাচ্ছে।বনি নার্গিসকে দেখে বলে,তুমি এসেছো,আজতো বাবুর বউ ভাত,চলো ঘুরে আসবে আমাদের সাথে।নার্গিসের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। বাবুকে ফোন দিলো,বাবু ফোন ধরে বলে, পরে কথা বলবো।নার্গিস চিৎকার শুরু করলো।
বাবু খুব স্বাভাবিকভাবে বললো,বিয়ে করেছি কি হয়েছে,তোমার সাথে আমার সম্পর্ক থাকবে।আমি কি কখনও বলেছি তোমােকে বিয়ে করবো?আমি কি তোমাকে জোর করেছি শারীরিক সম্পর্ক করতে?আমি প্রস্তাব করেছি,তুমি রাজি হয়েছো,তাই করেছি।
নার্গিস বাসায় চলে গেলো।একা একা কান্নাকাটি করলো।

ওর পাশের বাসার বাড়িওয়ালার ছেলে ওকে পছন্দ করে।ছেলেটা অশিক্ষিত,বাবা নেই তিন বোন আর মা,টিনের একটা বাসা আছে ওদের।ছেলেটা ভালো না,নেশা করে।নার্গিস তৎক্ষনাৎ ওকে ফোন দিয়ে বললো,তুমিতো আমাকে পছন্দ করো,আমাকে বিয়ে করবে?ও এক কথায় রাজি হয়ে গেলো।ওরা পরের দিন সকালে কোর্ট ম্যারিজ করলো।প্রায় বিশ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেলো।নার্গিস ওর স্বর্ণের চেইন বিক্রি করে টাকা দিলো।ফারুকের মা বোন প্রথমে বকাবকি করলেও পরে ঘরে তুলে নিলো।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নার্গিসের ছেলে হলো।নার্গিসকে সব কাজ করতে হয়,একটু ভুল করলেই শ্বাশুড়ি ননদের অত্যাচার।ছোটো একটা বাড়িই তাদের সম্বল,সংসারে তেমন স্বাচ্ছন্দ নেই।এদিকে ফারুক মাতাল হয়ে এসে নার্গিসকে শারীরিক নির্যাতন করে।এসব সহ্য না করতে পেরে নার্গিস এখন নিজের ছেলেকে নিয়ে গ্রামে বাবার বাড়িতে থাকে।বাড়িওয়ালী হওয়ার স্বপ্ন নার্গিসের জীবনে দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।মরে গিয়েও বেঁচে আছে একমাত্র ছেলের জন্য।