দশের কাজ যেটা সেটাকে সবাই অবজ্ঞা করে।দশের কাজ বলতে বুঝাচ্ছি সামাজিক কাজ কর্ম।যে কাজ ব্যক্তিগত না,করলে উপকার পাবে সবাই।আর না করলে ক্ষতি হবে সবার। পৃথিবীর অন্য কোথাও এইধরনের দশের কাজকে অবজ্ঞা করার স্বভাব আছে কিনা জানি না।তবে বাংলাদেশে বা বাঙালিদের মধ্যে এই স্বভাব চরম আকারে উপস্থিত তা লক্ষ্য করা যায়।
আমি কাজ করবো আর সবাই বসে বসে তা ভোগ করবে এটা হতে পারে না,এই ভাবনা থেকে কেউই আর কাজ করে না।ফলে কারোরই আর সেই সুবিধাটা ভোগ করা হয় না।
ছোট পরিসর থেকে বড় পরিসর সবজায়গায় মানুষের এই একি চিন্তাধারা।পরিবারের কথা বাদ সেখানে সবাই নিজের কাজ নিজে করে বা পরিবারে সবার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া থাকে।তবে যারা মেসে থাকে, বিভিন্ন পরিবারের,বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ একসাথে থাকে সেখানে এই সমস্যাটা দেখা যায়।যেসব কাজ সবার করার কথা সেটা কেউ করতে চায় না,অন্যের উপর ভরসা করে বসে থাকে।সে যাদের উপর ভরসা করছে,তারাও তার উপর ভরসা করে বসে আছে।পরে আর কাজটাই করা হয়ে উঠে না।যেমন,একটা মেসে যদি ছয়-সাত জন সদস্য থাকে,আর তাদের যদি কমন একটি পানি খাওয়ার উপকরণ থাকে,তবে সেক্ষেত্রে এই সমস্যাটি দেখা যায়।
হয়তো একটি ফিল্টার আছে,দিনে ছয়-সাত জগ পানি ঢালতে হয়।অতি সামান্য কাজ।দিনে একজন সদস্য যদি এক জগ করে ঢালে তাহলেই বেপারটা স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং খুবি সহজ হয়ে যায়।কিন্তু তারপরও দেখা যায়,ফিল্টার সবসময় খালি থাকে।খালি থাকার কারণ হচ্ছে সবাই কাজটাকে অতি সামান্য ভেবে কেউ আর করে না,অন্যের উপর ভরসা করে থাকে।সাতজন সদস্যই একে উপরের উপর ভরসা করে থাকে।
আবার বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করলে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও এই অনিয়ম লক্ষ্য করা যায়।
এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষের কারিকুলামের অংশ স্বরুপ "পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউট" এ ফিল্ড ভিজিট ছিলো।সেখানে যাওয়ার পর আমার এই উপলব্ধি হয়েছিলো যে, দশের কাজ যেটা, সেটা কতো যে অবহেলার সেটা বলার ভাষা নেই।ঢাকা শহরের ভিতর মহাখালীতে এটি অবস্থিত।এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিঘার বিঘা জমি তারা নিয়ে বড় বড় দালান তৈরি করে রেখেছে।কিন্তু সেইসব দালানে কোনো কাজ নেই।তারা নাকি আগে স্যালাইনের ব্যাগ বানাতো,সেটা দেখাতে গেলো।ভাবলাম হয়তো দেখবো কিভাবে সেটা বানায়।নিয়ে দেখালো একটা কাঁচের বাক্স।সেখানে বিভিন্ন ব্যাগ যেগুলো তারা আগে বানাতো।যিনি দেখাচ্ছিলেন,তিনি বললেন এটা আমরা আগে বানাতাম এখন আর বানায় না।
লাখলাখ টাকার যন্ত্রপাতি অনাদরে পরে রয়েছে দেখলাম।
এবার গেলাম "IV fluid" বানানোর সেক্টরে,সেখানে যাওয়ার পরও একি কথা, এটা আমরা আগে তৈরি করতাম এখন আর করি না।
রেভিস ভ্যাক্সিন তৈরির সেক্টরে গিয়ে দেখলাম সেখানেও একি অবস্থা,এখন আর তৈরি হয় না।
সব জায়গায়ই এসব তৈরির যন্ত্রপাতিগুলো অনাদরে পরে আছে।বড় বড় দালানগুলোও অনাদরে পরে আছে।
যিনি ঘুরে দেখাচ্ছিলেন তাকে জিজ্ঞেস করলাম,এখন তাহলে সরকার ঐসব স্যালাইন ব্যাগ বা আইভি ফ্লুইড কোথায় পায়।তিনি বললেন সরকার এখন ভর্তুকি দিয়ে প্রাইভেট সেক্টর থেকে এগুলো কিনে।
যেখানে সব কিছু তৈরির যন্ত্রপাতি ব্যবস্থা আছে,সেটা কিছু অসামঞ্জস্যতা আর অবহেলার কারণে তৈরি হচ্ছে না।এতে দেশের যেমন অনেক ক্ষতি হচ্ছে,তেমন জনগণকেও অনেক ভোগান্তির স্বীকার হতে হচ্ছে।
এভাবেই সবার কথা,দশের কথা না ভাবার কারণে আমাদের দেশে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়,বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়,দেশের অনেক ক্ষতি হয়।আমরা ছোট ছোট ক্ষেত্রেও এরজন্য ক্ষতিগ্রস্ত হই।সবাই যদি দশের কথা ভেবে কাজ করতো তখন সেই মেসের ফিল্টার সবসময় ভর্তি থাকতো পানি দিয়ে আবার সেইসব বন্ধ হওয়া ফ্যাক্টরির যন্ত্রপাতির ধুলাবালি আর মাকড়সার জাল সরে গিয়ে যন্ত্রগুলো সচল হয়ে উঠতো।