সময়তো দেখি খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে।শেষ কোনদিন লিখেছিলাম মনে পড়ছে না।এমবিবিএস ফার্স্ট প্রফেশনাল এক্সাম এর জন্য সময়টা ব্যস্ততায় গিয়েছে।পড়ালেখা নিয়ে নাকানিচুবানি অবস্থা।করোনার কারণে অনলাইনে ক্লাস হয়েছে,গ্রামের বাড়িতে বসে বসে ক্লাস করেছি।যার কারণে পড়ালেখায় অনেক ফাঁক ফোকর রয়ে গিয়েছে।
মেডিকেল খোলার পর গিয়ে বুঝতে পারলাম পড়াতো অনেক বাকি।পড়া শুরু করলাম জোরেশোরে।দেড় বছরের পড়া এই চার-পাঁচ মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে।প্রফে সেন্ট আপ হতে না পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।করোনা এমনিতেই এক বছর সময় নষ্ট করে দিয়েছে।আর সময় নষ্ট করা যাবে না।তাই খেয়ে না খেয়ে পড়তে লাগলাম।কিন্তু এর মধ্যেই প্রফের রুটিন দিয়ে দিলো।আর প্রফের তারিখও অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে।আমার মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়লো।
আমার অনেকগুলো টার্ম বাকি ছিলো।বেশিরভাগ স্টুডেন্ট অনলাইনে ভিডিও কলেই সব টার্ম ক্লিয়ার করে রেখেছিলো।কিন্তু আমি বোকার মতো অনলাইনে কয়েকটা টার্ম দিইনি,পরবর্তীতে ভালো করে পড়ে দিবো বলে।কিন্তু সেই ভালো করে পড়া আর অনলাইন চলাকালীন সময় হলো না।
এখন সমস্যা হচ্ছে টার্ম ক্লিয়ার করতে না পারলে প্রফে বসতে দিবে না।এই অল্প সময়ে কিভাবে এতোগুলো টার্ম ক্লিয়ার করবো,তা ভেবেই অস্থির হয়ে যাচ্ছি,এমন সময় আবার নোটিশ আসলো শুধু টার্ম ক্লিয়ার থাকলেই হবে না,প্রফে সেন্ট আপ হতে হলে সামনে অনুষ্ঠিতব্য লিখিত পরীক্ষায়ও পাশ করতে হবে।
মেডিকেল জীবন শুরুর দিকেই করোনার আবির্ভাব।তাই মেডিকেলের লিখিত পরীক্ষা কেমন হয় সে সম্পর্কে ধারণা ছিলো না,যদিও ভিডিও কলে ভাইভা দিয়ে ভাইভা সম্পর্কে ধারণা ছিলো,সেই ভাইভাই ক্লিয়ার করতে পারছি না এখন আবার রিটেন।
প্রথমবারের মতো লিখিত এক্সাম দিলাম।পঁচাশিভাগ স্টুডেন্টই ফেইল করলো।আমিও তাদের মধ্যে একজন।তারপর তার সাপ্লিমেন্টারীতে অনেকেই পার হয়ে গেলো,কিন্তু আমি পার হতে পারলাম না।এর কারণ করোনার সময়টুকু বাড়িতে থেকে ঠিকমতো পড়াশোনা করা হয়নি,হবেই বা কিভাবে না নিয়ে গেছি বই,না নিয়ে গেছি বোনস।তার উপর বাড়িতে নেটওয়ার্কের সমস্যা,বাগানে বসে ক্লাস করেছি,অর্ধেক করা গিয়েছে, অর্ধেক করা যায় নি।আর যারা শহরে ছিলো তারা তাও মোটামুটি পড়ালেখা করার সুযোগ পেয়েছে।তো এইভাবে সাপ্লিমেন্টারীতেও ফেইল করার পর আবার রি-সাপ্লির তারিখ দিলো।এর মধ্যে আবার ভাইভা টার্মগুলো বার বার দিয়ে ক্লিয়ার করতে পেরেছিলাম।
অতঃপর রিসাপ্লি দিলাম।আর তার মধ্যেই আবার সেন্ট-আপ লিস্ট দেওয়ার তারিখও দিয়ে দিলো।রিসাপ্লির আর রেজাল্ট দেয় নি।এর মধ্যে সেন্ট-আপ লিস্ট দেওয়ার একদিন আগে, এক ম্যাম আমাকে আনঅফিশিয়ালি ডেকে নিয়ে বললো,রোল থ্রি,তোমার আর মনে হয় এইবার সেন্ট আপ হওয়া হবে না।তুমি ছয় মাস পর পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নাও।এটা শোনার পর ভেঙে পড়লাম।আবার ছয়মাস বসে থাকতে হবে,যেখানে করোনাতে এক বছর পিছিয়ে গেলাম।পরের দিন সেন্ট আপ লিস্ট দিবে,সকলের মুখেই চিন্তার বলিরেখা।সেদিন রাতটা আমার খুব কষ্টে কাটলো।শুধু নিজের উপর রাগ হচ্ছিল।করোনার উপরও খুব রাগ হচ্ছিল।সব যদি স্বাভাবিক থাকতো তাহলে আমার এই পরিস্থিতিতে পরতে হতো না।এসব ভাবতে থাকলাম।
সকালে মেডিকেলে গেলাম।দুপুর পর্যন্ত এক ডিপার্টমেন্ট থেকে আরেক ডিপার্টমেন্ট ঘুরাঘুরি করলাম,তারপর হোস্টেলে ফিরে আসলাম।হোস্টেলে ফিরে জামা-কাপড় না পাল্টিয়েই কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলাম।একটু পরই এক বড় ভাই ডাকছেন,"আশরাফ,আশরাফ,দেখো সেন্ট আপ লিস্ট দিয়েছে,তুমি তো সেন্ট আপ হয়ে গিয়েছো।"
আমি লাফ দিয়ে উঠে নোটিশটার দিকে তাকালাম।উপরের দিকেই আমার নাম।আমার রোল নম্বর "তিন" কিনা।অতঃপর স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।ম্যাম কেনো যে আমাকে এভাবে ভয় দেখালো!হয়তো ম্যাম চেয়েছিলেন যদি সেন্ট আপ সত্যিই হতে না পারি,তাহলে আগে থেকে বলে রাখলে লিস্ট দেওয়ার পর আর কষ্ট পাবো না,তাই আগে থেকে সতর্ক করে রেখেছিলেন।
সে যাই হোক,করোনা মহামারী মানুষের জান-মালের যেমন ক্ষতি করেছে।শিক্ষা ব্যবস্থারও বিরাট ক্ষতি করেছে,এই ক্ষতি কি পোষণ করা যাবে অদূর ভবিষ্যতে?