ভ্রমণ করার মাধ্যমে মানুষ অচেনা কে চিনে,অদেখাকে দেখে আর অজানাকে জানে।ভ্রমণ করার মাধ্যমে যে মানুষ শুধু জ্ঞান অর্জন করে তেমন নয়,বরং পর্যাপ্ত বিনোদনও পেয়ে থাকে।প্রাকৃতিক কোনো স্থান ভ্রমণ করার পর মনে যে রসের সঞ্চার হয় তা গুটিকয়েক সিনেমা দেখার পরও পাওয়া যায় না।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পর মনে যে তৃপ্তি পাওয়া যায়,তা প্রেমিকার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে পাওয়া তৃপ্তির চেয়ে ঢের গুণ বেশি।শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশ নয়,মানবসৃষ্ট এমন অনেক স্থান আছে যা দেখে হা করে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হয়।কারণ স্বাভাবিকভাবে চোখ যা দেখে অভ্যস্ত,তা থেকে ভিন্ন কিছু,নতুন কিছু দেখলে মনে আনন্দের সৃষ্টি হওয়া ই স্বাভাবিক।
তবে ভ্রমণ করার জন্য সরস মন থাকা প্রয়োজন।সবাই ভ্রমণ করে মজা পায় না।নতুন কিছু দেখার পর যাদের মনে কোনো আলোড়ন সৃষ্টি হয় না ভ্রমণ তাদের জন্য নয়।যারা একটা নতুন রং এর, নতুন প্রজাতির ফুল দেখে,পাখি দেখে আনন্দিত হয়,ভ্রমণ তাদের জন্য।
একবার গ্রাম থেকে আসা এক মধ্যবয়সী চাচাকে বললাম,"চলেন চাচা বিমানবন্দরের বেরিবাঁধ এলাকা থেকে ঘুরে আসি,আপনিতো বিমান দেখেননি কখনও সামনাসামনি,সেখানে থেকে খুব কাছে থেকে বিমান দেখা যায়।"
চাচার সহজ উত্তর,"বিমান দেখলে কি অইবো,যদি বিমানের দিকে তাকায়া তাহি তাইলে কি একটা বিমান আমারে দিয়া দিবো!"
আমি তখন মনে মনে বললাম,থাক বাবা,আমার বড্ড পাপ হয়েছে আপনাকে বিমান দেখতে যাওয়ার কথা বলে।
তবে এই কথাটা আমাকে প্রায়ই মনে করিয়ে দেয় যে ভ্রমণ সবার জন্য না বা সবাই যে নতুন কিছু,ভিন্ন কিছু দেখে মজা পাবে তেমন নয়।ঐ চাচা বিমান দেখে মজা পাবে না,যদিও সে তার জীবনে আগে কোনদিন সেটা দেখেনি।বরং তার মনে আনন্দের সৃষ্টি হবে,যদি সেই বিমানগুলো থেকে একটা বিমান তাকে দিয়ে দেওয়া হয়।
আমার এক ভাইগ্নিকে নিয়ে একবার ঘুরতে বের হলাম।এক কলেজের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়,কলেজের বাগানে একটা ফুল দেখে ও চিৎকার করে উঠলো আর আনন্দ আত্মহারা হয়ে বলতে লাগলো,"মামা দেখো দেখো কতো সুন্দর গোলাপি গোলাপ ফুল,একটা ছবি তুলে দাও।"
আমি বললাম,আরে গোলাপ ফুলতো গোলাপি হবেই,এতে এতো লাফানোর কি আছে!
ও বললো,আমি এর আগে শুধু লাল গোলাপ দেখেছি,গোলাপি গোলাপ দেখিনি।
এই বিষয়টাও আমাকে ভাবায়,এই সামান্য গোলাপ তার মনে কতোটা আনন্দের সৃষ্টি করেছে!যেনো মনে হচ্ছিলো,সে কোটি টাকার সম্পদ পেয়ে গিয়েছে।সে যখন সৃষ্টিকর্তার আরও অপরুপ সৃষ্টি গুলো দেখবে,সাগর-মহাসাগর,পাহাড়-পর্বত,ঝর্ণা,তখন তার মনে যে বাধভাঙ্গা উল্লাস,সীমাহীন আনন্দ দেখা দিবে তা তার এই ক্ষুদ্র গোলাপের প্রতি আকর্ষণ দেখেই বুঝা যায়।ভ্রমণ তার মতো মানুষের মনের জন্য উপযুক্ত আনন্দের খোরাক।
সৃষ্টিজগতের ক্ষুদ্র এক সৃষ্টি হিসাবে হয়তো পুরো সৃষ্টিজগতটাকে দেখা সম্ভব নয় তারপরও যতটুকু দেখা যায় এই ছোট্ট জীবনে ততটুকু দেখা উচিত মনকে নির্ভেজাল আনন্দ দেওয়ার জন্য।প্রাকৃতিক সৃষ্টিতো আছেই তার উপর মানুষ আদিমকাল থেকে নিজে যেসব আশ্চর্য জনক স্থাপনা,স্থান,জিনিসপত্র তেরি করেছে তার মধ্যেও রয়েছে মনের তৃষ্ণা মেটানোর পানীয়।আদিমকালে হয়তো কেউ নিজের মতো করে তার থাকার জন্য একটি ঘর বানিয়েছিলো যা কিনা বর্তমানের ঘরগুলো থেকে আলাদা তা দেখেই মানব মন আনন্দ পায়।
তবে ঐ যে বললাম,সবাই এই আনন্দ পাবে না।ঐ চাচার মতো কেউ হয়তো বলে উঠবো,এই ভাঙা ঘর দেখে আমি কি করবো,নিজে একটা ঘর বানাতে পারলে খুশি হতাম।
তবে ভ্রমণ করার মন থাকলেইতো আর ঘুরা যায় না,তার জন্য শারীরিক সক্ষমতা লাগে,লাগে মানবজীবনের এক অপরিহার্য প্রয়োজনীয় চাহিদা অর্থ।ভ্রমণ করার জন্য সরস মন আছে,শারীরিক সক্ষমতাও আছে কিন্তু অর্থ নেই।তার জন্য কি ভ্রমণ করার আশা ছেড়ে দিতে হবে নাকি।আমার সেই ভাইগ্নির মতো প্রকৃতির ছোট্ট ছোট্ট জিনিসের মধ্যে আনন্দ খুঁজতে হবে।নিজের সামর্থ্যে যতটুকু কুলোয় ততদূর পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি,তার উপর সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সৃষ্টিকে উপভোগ করতে হবে মনকে সুস্থ রাখার জন্য,আর আনন্দময় এক জীবন কাটানোর জন্য।