শিক্ষাক্ষেত্র পাল্টালে বা কর্মক্ষেত্র পাল্টানোর সাথে সাথে আশপাশের মানুষ যেমন পাল্টে যায়,বন্ধুও পাল্টে যায়।পাল্টে যাওয়া বলতে নতুন জায়গায় নতুন মানুষ,সেখান থেকে নতুন বন্ধু।এখন ফেলে আসা বন্ধুদের সাথেতো নিয়মিত কথা হবে না এটাই স্বাভাবিক,বর্তমান নিয়ে মানুষ বেশি ব্যস্ত থাকে।তো সেই পুরাতন বন্ধুর সাথে হয়তো হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাক্ষাৎ হলো,তো তাদের প্রথম কথাটা এমন হয় যে,"কিরে ভুলেইতো গেলি,একদিনও খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিস না,তাই না"।
শুধু বন্ধুদের ক্ষেত্রে না যেকোন আত্মীয়,সে নিকটাত্মীয়ই হোউক বা দূর সম্পর্কের আত্মীয় দেখা হলেই বলে তাকে নাকি ভুলে যাওয়া হয়েছে,তার খোঁজ নেওয়া হয় না।ভালো কথা, আমি ভুলে গেলাম,কিন্তু তিনিওতো মনে করতে পারতেন,তিনিও খোঁজ নিতে পারতেন!
ধরা যাক ছয় মাস যাবৎ আমার এক আত্মীয়ের সাথে আমার দেখাতো হয়ইনা আবার কথাও হয় না।হয়তো তাকেও আমার প্রয়োজন পড়েনি,তারও আমাকে প্রয়োজন পড়েনি।এখন হঠাৎ তার সাথে কোন মাধ্যমে কথা হচ্ছে,সে প্রথমেই আমাকেই দোষ দিয়ে বসবে আর বলবে,"কি খবর,কোনো খোঁজ নাই,একবারও মনে পড়ে না।"
হ্যাঁ বুঝলাম আমার দোষ হয়েছে,আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়া নৈতিক দায়িত্ব, সেটা আমি পালন করিনি।কিন্তু আমিওতো তার আত্মীয়, আমার খোঁজ নেওয়াওতো তার দায়িত্ব।সে নিজেওতো তার দায়িত্ব পালন করেনি।সুতরাং আমি দোষী হলে সে নিজেও দোষী।একই দোষে দোষী হওয়া সত্ত্বেও আরেকজন দোষীকে কিভাবে কেউ ভৎসনা করতে পারে!
মানুষ এমন করে কেনো?এটা করার কারণ খুঁজতে গিয়ে আমার মনে হলো,মানুষ সব সময় নিজের দোষ ঢাকতে চায়।এখন নিজের দোষ ঢাকার জন্যই সে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়।ভাবখানা এমন যে, সে অনেক চেষ্টা করেছে আমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য,কিন্তু বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সম্ভব হয়নি,কিন্তু আমার অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি যোগাযোগ করিনি।তাই সে নির্দোষী,আমি দোষী।
আমার বড় মামার ছোট ছেলে, সে একবার তার জীবনের একটা ঘটনা বলেছিলো।সে নাকি এক সময় সবার খুব খোঁজ খবর নিতো।বন্ধু থেকে শুরু করে, সব আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নিতো।খোঁজ নেওয়া বলতে নিয়মিত তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতো এই আরকি,মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বা সরাসরি যেভাবেই পারতো সেভাবেই।
হঠাৎ তার মনে হলো,আমিই শুধু নিজে উদ্যোগ নিয়ে সবার খোঁজ নিই,একটা পরীক্ষা করে দেখি,
আমি খোঁজ না নিলে,কেউ আমার খোঁজ নেয় নাকি!
সে কিছুদিন সবার খোঁজ নেওয়া বন্ধ করে দিলো,মোবাইল ফোনেও কাউকে ফোন দিলো না বা নিজে উদ্যোগ নিয়ে সরাসরি কারো সাথে দেখা করতেও গেলো না,তখন দেখা গেলো কেউ তার খোঁজ নিচ্ছে না,মাস পেরিয়ে গেলো কিন্তু কেউ একবারও তার সাথে ফোনেও যোগাযোগ করলো না।অথচ যখন সে নিজে উদ্যোগ নিয়ে ফোনে যোগাযোগ করতো,প্রতিদিনই কয়েকজন আত্মীয়,বন্ধুর সাথে তার কথা হতো।এরপর থেকে সে নিজে থেকে কারো খুঁজ খবর নেওয়া বন্ধ করে দিলো,দরকার হলে খুঁজ নেয়, না হলে,চলুক যে যার মতো।
আসলে বেপারটা হচ্ছে,সব মানুষই বর্তমান নিয়ে ব্যস্ত থাকে।বর্তমানে তার আশপাশে যেসব মানুষ আছে তাদের সাথে সময় কাটানোরই সময় হয়ে উঠে না,সবাইই তার নিজের জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার যুদ্ধে ব্যস্ত,আর সেই যুদ্ধের সাথীদের সাথেই তার যোগাযোগ,কথাবার্তা,আলাপ-আলোচনা,উঠাবসা বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক।এখন ফেলে আসা বন্ধু বা আত্মীয় যারা সেই যুদ্ধের অংশ নয় তাদের সাথে প্রতিদিন যোগাযোগ হবে না এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু এই স্বাভাবিক বিষয়টাকে অনেকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না।আধুনিক ছেলেমেয়েদের ভাষায় বলতে হয়,"হুদাই তারা সেন্টি খেয়ে বসে থাকে।"
তবে,বর্তমান যুগে যোগাযোগ করার মাধ্যম খুব সহজ।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব সহজেই কারো সাথে যোগাযোগ করা যায়,তার ভালমন্দ জানা যায়।একটা সময়তো কারো কোন খুঁজ নিতে হলে পায়ে হেঁটে বা যানবাহনে করে তার বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়া লাগতো,তারপর মোবাইল ফোন আসলো,আর এখন ইন্টারনেট।
যেহেতু এতো সহজ যোগাযোগ করা,আর আত্মীয়ের, বন্ধু বান্ধবের যোগাযোগ রাখা নৈতিক দায়িত্ব তাই তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা উচিত।একটু ভালোমন্দের খুঁজ খবর নেওয়াইতো লাগবে,অর্থ দিয়েতো আর সাহায্য করা লাগবে না।তাই বলে,আবার প্রতিদিনতো আর সবার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব নয়।হয়তোবা সপ্তাহে বা মাসে একবার যোগাযোগ করা গেলে তারাও খুশি,আমরাও দায় থেকে মুক্ত।