মানুষের জীবন ঘটনাবহুল।জীবনে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি ঘটনা তার উপর প্রভাব ফেলে।যার সাথে যেমন ঘটনা ঘটে জীবনটা তার কাছে তেমন।আসলে মানুষ চলতে চলতে শিখে।এমন অনেক ঘটনা থাকে যার ফলে ধারণা পাল্টে যায়।এমন কি আচারণও পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।আমার বোনদের মধ্যে ছোট যে,অবশ্য আমার বড়,ছোটো ডাকি তাকে, সে শহরের ঝলমলে আলোতেও প্রচুর ভয় পায়।এর কারণ যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তখন সে এই ঘটনাগুলো বলে সবসময়,অবশ্য আমি আগে থেকেই জানি।
তার সাথে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা থেকে পরবর্তীতে তার জীবনের অনেক কিছু বদলে গেছে।ঐ ঘটনাগুলোই আজ বলবো।
আমরা গ্রামে বড় হয়েছি। গ্রামে বড় বড় দালান কোঠা নেই। অধিকাংশ বাড়ি কাঁচা বা আধা পাকা।এখন অনেকটা পরিবর্তন হলেও আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন একটা গ্রামে হয়তো একটা বা দুইটা পাকা বাড়ি থাকতো। আর সব বাড়িগুলো কুঁড়ে ঘর বা বাঁশ দিয়ে তৈরি টিনের ঘর। তাই বৈশাখ মাস মানে ঝড়ের ভয়ে সবাই অস্থির থাকতো।আমাদের বাড়ি ছিলো বাঁশের তৈরি টিনের বাড়ি। আমার দিদি ঝড়কে খুব ভয় পেতো।বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যমাসে আকাশ অন্ধকার হলেই দিদি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যেতো। আর মৃদু বাতাসেই তার চিৎকার শুরু হয়ে যেতো। আব্বা ওকে নিয়ে দাদুদের পাকা ঘরে চলে যেতে বলতো কিন্তু সে সবাই কে না নিয়ে যাবেনা।যেদিন ঝড় শুরু হতো সেদিন আব্বা না হয় আম্মা ওকে অনেকটা কোলে করে দাদুদের ঘরে নিয়ে যেতো।অবশ্যই তাতে খুব একটা লাভ হতো না ঝড় শেষ না হওয়া পর্যন্ত দিদির চিৎকার কোনোদিনও থামেনি।আমার বোনদের মধ্যে মেজু বোন যাকে আমি ডাকি মেজু তার সাহস একটু বেশি বলা যায়, ঝড় দেখে ভয় পাওয়া সম্ভাবনা নেই। আর বোনদের মধ্যে ছোট যে,ছোটো ডাকি যাকে,তার এতো বেশি সাহস না থাকলেও, ঝড়ে ভয় পেতো না, সে ভাঙা ঘর হোক আর পাকা ঘর।তার মনে নাকি একটা ধারণা ছিলো ঝড়ে যদি ঘর ভেঙে পড়ে, তাহলে আমরা দৌড়ে বের হয়ে যাবো। এতো ভয় পাওয়ার কি আছে।
কিন্তু সে যখন কলেজে পড়ে তখন সে এক জায়গায় বেড়াতে যায়। ঐখানে যাওয়ার পর ঝড় হয়।সে যে ঘরে ছিলো এই ঘরের উত্তর পাশে যাদের ঘর তারা তিন ভাই বোন ছিলো ঘরের ভিতর। ছোটোরা দরজার ফাঁক দিয়ে ঝড় দেখার চেষ্টা করছিলো।এমন সময় তার চোখের সামনে ঘরটা ভেঙে পড়লো। দুই ভাই বের হতে পারলেও বোনের উপর পড়ে। এতে বোন আহত হয় মাথা ফেটে যায়, হাত ভেঙে যায়, ভাই গুলো হাতে পায়ে আঘাত পায়। এরপর থেকে ছোটোর ঝড়ের কথা শুনলে ও ভয় লাগে।আমি সেটা প্রায়ই লক্ষ্য করেছি।পাকা ঘরে থাকলেও নাকি তার বুকের ভিতরটা ধুপ ধুপ করে।
সড়ক দুর্ঘটনার কথা আমরা প্রায়ই শুনি।সেটা নিয়েও তার ধারণা আগে এক রকম ছিলো এখন নাকি আরেক রকম।ছোট বেলা থেকে কোনো দুর্ঘটনার কথা শুনলে তার খুব কষ্ট হতো।শুধু ভাবতে থাকতো ইস কতো কষ্ট পেয়েছে। মরে গেলে ভাবতো, স্বাভাবিক ভাবে মারা গেলেতো এতো কষ্ট পেতোনা!সে যখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে তখন একদিন টিউশনি থেকে বাসায় ফিরার সময় রাস্তা পার হচ্ছিলো। হঠাৎ দেখে একদিকে সিএনজি অটোরিকশা, অন্য দিকে কুকুর, এরপর সে আর কিছু বলতে পারেনা,মানে অজ্ঞান হয়ে যায়।দুই তিন ঘন্টা পর সে নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পায়। ছোটোর মাথায় সেদিন আট দশটা সেলাই পড়েছিলো।তারপর থেকে দূর্ঘটনা সম্পর্কে ছোটোর ধারণা পাল্টে যায়,এখন দুর্ঘটনায় যদি কেউ মারাও যায় তবুও সে কষ্ট পায়না, দুর্ঘটনায় কেউ চলে গেলে কষ্ট পায় তবে কষ্ট পেয়েছে বলে কষ্ট পায়না।মানে মোট কথা দুর্ঘটনাতে মারা গিয়েছে বলে ভয়াবহ কষ্টের মৃত্যু হয়েছে বলে তার মনে হয় না,কারণ সেদিন সে বুঝতেই পারেনি তার দুর্ঘটনার বেপারটা।
আমাদের বাড়িতে নাকি জ্বীন আছে।এ গল্প ছোট বেলা থেকে অনেক শুনেছি।এর নাম নাকি বৌ।আমরা সবাই এটা নিয়ে ভয় পেতাম।ছোটোও ভয় পেতো।কিন্তু সেটা খুবই স্বাভাবিক ছিলো।শুধু রাতে একা বাইরে যেতে পারতো না।একদিন বাড়িতে শুধু ছোটো আর আম্মা ছিলো। শনিবার ছিলো। সন্ধ্যার পর আম্মা পিঠা বানাচ্ছে,ছোটো আম্মার সাথে রান্না ঘরে বসে ছিলো। পিঠা বানানো শেষ করে আম্মা ভাত রান্না করেছে।কাজ শেষে ঘরে এসে ছোটোকে খেতে দিয়ে, আম্মাও খেয়েছে। এরপর আম্মা ওযু করে এশার নামাজ পড়তে বসেছে।ছোটো আম্মার কাছে বসে ছিলো। হঠাৎ ছোটো শুনতে পায় "এই এই" করে তাকে কেউ ডাকছে। প্রথমে সে ভাবলো আমাদের চাচাতো ভাই। ছোটো বললো, "ঘরে আয়।"না সে উত্তর দেয় না। আরও বেশি ডাকে, ছোটো এবার ভয় পেয়ে আম্মাকে বলছে, "আম্মা আমাকে কে ডাকে।"আম্মা দুই রাকাত নামজের বিরতিতে ছোটোকে বললো,"এসব কি বলিস কেউ ডাকেনা।"এটা বলে আম্মা আবার নামাজ শুরু করে। তখন নাকি ছোটোকে নাম ধরে ডাকা শুরু করলো,এরপর আরও জোরে জোরে ডাকা শুরু করলো।পরে আর সে সহ্য করতে না পেরে লাফ দিয়ে খাটে উঠে কান্না করা শুরু করলো।আম্মা নামাজ ছেড়ে ছোটোর কাছে এসে দেখে সে ঘেমে ভিজে গিয়েছে।
এরপর থেকে ছোটো যেখানে যায় সেখানেই ভয় পায়।গ্রামেতো ভয় পায়ই, শহরে ও ভয় পায়।
একটা বিষয় সম্পর্কে আমাদের ধারণা এক রকম থাকে,যখন ঘটনাটা আমাদের সাথে ঘটে তখন নিজের সাথে যেমন ঘটেছে সেই অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আমরা বিষয়টাকে ভাবা শুরু করি,ধারণা পাল্টে যায়।