আমার ছোটবেলা

Words
701
Reading
4 min
Listen
Play
5y

IMG_20200721_175452.jpg

সুশীতল এক গ্রামের মাঠে প্রান্তরে হেসে খেলে আমি বড় হয়েছি।যেখানে ছিলনা নগর জীবনের চাকচিক্য।ছিলনা তিন বছর বয়সে পড়াশোনার বাধ্যবাধকতা।আমাদের বাড়ি আর মামাদের বাড়ি পাশাপাশি গ্রাম।ছোটবেলার বেশিরভাগ সময় কেটেছে মামার বাড়িতে।মামাদের ছিলো প্রচুর আবাদি জমি।তাই সারাবছর চাষাবাদ লেগেই থাকতো।আবার একটু নিচু এলাকা হওয়ায় বর্ষার সময় ফসলি জমি,বাড়ির আশপাশ পানিতে থৈ থৈ করতো।

মামার বাড়ি রাস্তার ঠিক পাশেই।রাস্তার পশ্চিম পাশে মামাদের বাড়ি,আর পূর্ব পাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়।তখন বিদ্যালয়ে টিনের তৈরি একটি মাত্র ঘর ছিলো।আমার সমবয়সী চাচাতো মামাতো বোনেরা এই স্কুলে পড়তো।আমি ওদের সাথে স্কুলে যেতাম।ক্লাস করার সময় মেহমান থাকলেও খেলাধুলার সময় ওদের সহচর হয়ে যেতাম।কলম টুকাটুকি, বাবু পুলিশ,হান্ড্রেড এসব খেলতাম।স্কুল থেকে আসার পর বিকালে আবার স্কুলঘরে যেতাম।স্কুলের পিছনের টিনের দেয়ালের অনেকটা অংশ কাটা ছিলো।সেই কাটা অংশ দিয়ে ভিতরে ঢুকতাম।আমাদের সময় "সৃজনশীল" পরীক্ষা থাকতো।সে পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রীরা ঝাড়ু,পাখা,বেতের তৈরি বিভিন্ন জিনিস,কাগজের তৈরি বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে নিয়ে যেতো।এসব স্কুলঘরে সাজানো থাকতো।আমরা দেওয়ালের ফাঁকা দিয়ে ঢুকে এসব চুরি করতাম।এখন বড় হয়ে বুঝতে পারি,এসব খারাপ কাজ করতাম,কিন্তু তখন খুব মজা পেতাম।

গরমের দিনে আমি,ছোটো আর দুই চাচাতো মামাতো ভাই পুকুরে নেমে সাঁতরাতাম,বিভিন্ন ধরনের খেলা খেলতাম,তারপর পুকুর থেকে উঠে চারজন একসাথে গোসলখানায় ঢুকতাম।গোসলখানায় চারজনমিলে দরজা দিয়ে এমন গল্প-গুজবে মেতে উঠতাম যে বাহির থেকে বড়রা দরজায় ধাক্কা ধাক্কি শুরু করতো।তখন আমাদের যেনো হুশফিরতো,তাড়াহুড়ো করে কাপড় পরিবর্তন করে যখন বের হতাম তখন সবাই হাসিঠাট্টা করতো,যে চারজন যখন একসাথে তাহলে দরজা লাগানোরইবা কি দরকার!

যখন গম বপনের সময় হতো তখন আগে থেকেই আমরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতাম।কারণ গম বপনের সময় সারা মাঠ ফাঁকা থাকে।আর গম বপনের পর পনের থেকে বিশ দিন পাখি যাতে গম খেতে না পারে তার জন্য পাহাড়া দিতে হতো।তাই তখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গম পাহাড়া দেওয়ার নাম করে মাঠে যেমন খুশি তেমন খেলাধুলা করতে পারতাম।আমরা সেখানে ধানের খড় দিয়ে ছোটো ছোট ঘর বানাতাম।সবার বাড়ি থেকে অল্প অল্প চালডাল এনে চড়ুইভাতি খেলতাম।সেসব খাবার আবার কলাপাতায় একসাথে বসে খেতাম।এছাড়াও মা-বাবা,ভাই-বোন সেজে পরিবার বানাতাম।একপরিবার আরেকপরিবারকে দাওয়াত করে খাওয়াতাম।নিমন্ত্রিতদের খাওয়ানোর জন্য ধুলো আর ঘাসলতা পাতা দিয়ে, পোলাও,মাংস,ডাল সবই রান্না হতো।ওরা খেয়ে রান্নার প্রশংসা করতো।ওরা আবার আমাদের দাওয়াত করতো।

আর বিকাল মানে ছিলো গোল্লাছুট,বৌছি,আর দাড়িয়াবান্দা খেলার ধুম।আর শীতকালে যখন নদী খাল বিলের পানি শুকিয়ে যেতো,তখন আমরা শালুক,বেঁট(শাপলার ফল) তুলতে যেতাম অনেকে মিলে।সেখানে থাকতো বিভিন্ন ধরনের ভয়। যেমন,শাপলা গাছে নাকি সাপ পেঁচিয়ে থাকে,সেখানকার সাদা বক নাকি মানুষের চোখ খেয়ে নেয়,বাজপাখি কামচে দেয়,ঝোঁক ধরতে পারে।তারপরও যেতাম আর সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে এসব কুড়াতাম।

IMG_20200721_175402.jpg

আর বর্ষাকালে তেমন খেলাধুলা করা হতো না।বর্ষাকালে আমি হতাম আমার মামাতো ভাই এর মাছ ধরার সাথী।আমার বড় মামার ছোট ছেলে, ও মাছ ধরতে খুব ভালোবাসে।আগেই বলেছি মামার বাড়ি নিচু এলাকায় তাই বাড়ির আশপাশ আর ফসলি জমি পানিতে টাইটম্বুর করে।ওর থাকতো এক-দেড়শো ছোট বড় বড়শি,আর আমাদের এলাকার বিভিন্ন মাছ ধরার হাতিয়ার।বিকাল বেলায় এসব বড়শি নিয়ে আমাকে নিয়ে যেতো পাশের মাঠে,সেখানে আমাকে বসিয়ে সে কেঁচো ধরতে যেতো।কেঁচো নিয়ে এসে এসব বড়শিতে লাগিয়ে দুই তিন হাত ফাঁক করে করে কলাগাছের ভেলায় ছড়ে এসব বড়শি ছড়িয়ে দিতো।এর পর আমরা বাড়িতে চলে আসতাম।

পরদিন ভোরবেলা একটা বড় মাছ রাখার পাত্র নিয়ে আমরা চলে যেতাম।আবার কলাগাছের ভেলায় চড়ে সব বড়শির কাছে গিয়ে বড়শি উঠিয়ে মাছ ধরার পাত্রে রাখতো আমার মামাতো ভাই।সবকিছু ও করতো আমি শুধু মাছ রাখার পাত্র ধরতাম।বড় বড় বড়শিগুলোতে ধরতো বোয়াল আর শোলমাছ আর ছোট বড়শিগুলোতে ধরতো টাকিমাছ,কৈ মাছ,শিং মাছ ইত্যাদি।এসব মাছ নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে হতো বড় ঝামেলা।কারণ বড় মামার পছন্দ ছিলো না সকাল সকাল পড়ালেখা না করে মাছ ধরতে যাওয়া।তাই ও মাছ নিয়ে বাহিরে অপেক্ষা করতো আর আমি বাড়িতে ঢুকে দেখতাম মামা কোথায় আছেন।তারপর ও লুকিয়ে রান্না ঘরে মাছগুলো রেখে পড়তে বসে যেতো।মামা অফিস যাওয়ার পর এসব মাছ বড়শি থেকে খুলতো।অবশ্য সারারাত বড়শিতে থেকে বেশিরভাগ মাছ মারা যেতো।

যেদিন দুপুরবেলা বৃষ্টির ভাব দেখতো,সেদিন আমাকে নিয়ে "লার" নামক একটি মাছ ধরার যন্ত্র দিয়ে ছোট ছোট লালচাঁদা মাছ ধরতে যেতো।লার দিয়ে মাছ ধরতে তিন জন লাগে।তাই আরেকজন কাউকে খুঁজে শরীক নিতে হতো।লম্বা দড়িতে ছোট ছোট ইটের টুকরো ফাঁকা ফাঁকা করে বেঁধে দড়ির দুইপ্রান্তে দুইজন ধরে টানতে হয়।সামনে একজন তিনকোন জাল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।দড়ি দুইপাশ থেকে টেনে জাল পর্যন্ত নিয়ে গেলে ছোট ছোট লাল চাঁদা মাছের ঝাক জালের ভিতর ঢুকে যায়।সাথে কিছু চিংড়ি আর পাঁচমিশালি মাছও থাকতো।এসব মাছ ধরে বাড়িতে আসার পর প্রচন্ড শরীর চুলকাতো।তখন দুইজন কান্না করা শুরু করতাম।আম্মা গোসল করাত আর বকাবকি করতো কেনো গেলাম মাছ ধরতে।পরেরদিন আবার যেতাম।

এভাবেই কেটে যেতো বছরের প্রতিটা দিন।কতসুখী ছিলাম তখন।অল্প পাওয়াতেই আনন্দে মেতে থাকতাম।এখন চারদিকে দায়িত্ব কর্তব্য ব্যস্ততা সব মিলিয়ে যখন পাগল প্রায় অবস্থা তখন এসব ভাবতে বেশ ভালো লাগে।ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলি,কতোই না ভালো ছিলো সেসব দিন।

আমার ছোটবেলা | Ecency