ঘরকুনো শব্দটা আমাদের চার ভাই-বোনের সাথে একেবারে মানানসই।মা এবং আমরা ভাইবোন একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড।আমাদের নিজেদের মধ্যে কোন ব্যক্তিগত বিষয় নেই। বোনেদের সংসার আর ভাই এর পড়াশোনা তাই এখন আমরা একেক জন একেক জায়গায় বসবাস করি।এটা বাহ্যিক দুরত্ব।আত্মিক ভাবে আমরা কখনো দূরে যায় না। আম্মা যেমন আমাদের বন্ধু, তেমনি শিক্ষা গুরু, ধর্ম গুরু।আমরা বিশ্বাস করি আমাদের ভাই বোনদের সাথে খারাপ কিছু হলেও তা কখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় না। কারণ আম্মার দোয়া আর আম্মা মানুষের ভালো করার চেষ্টা করে সবসময়। তাই এর প্রতিদান গুলো আমরা পাই।
বার বার আম্মার কথা বলাতে একটা প্রশ্ন আসতে পারে আমাদের কি বাবা নেই? আমাদের বাবা ছিলেন। ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর আমাদের রেখে পরপারে পারি জমিয়েছেন। তবে আমরা বাবার সান্নিধ্য পায়নি বললেও চলে।জন্মের পর থেকে শুনেছি বাবা ঢাকা থাকেন।তিন মাসে ছয়মাসে আসতেন দুই একদিন থাকতেন তারপর চলে যেতেন। এরপর আমার বয়স যখন দেড় বছর তখন বাবা সৌদি আরব চলে যান এরপর আসেন তের বছর পর।ততদিনে বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে আর নিজের পড়াশোনার জন্য ঢাকা থাকতে হয়।তাই বাবার সাথে আমাদের সম্পর্কটা অনেক টা লং ডিস্টেন্স সম্পর্কের মত।
বাবার এই অপূর্ণতা আমাদের চারভাইবোনকে করে তুলেছে মা পাগল।মা আমাদের একমাত্র অবলম্বন। আমাদের প্রতিবেশিরা সব সময় বলে মা আর ছেলে মেয়েরা যেন বন্ধু। অবশ্যই এই কথাটা অনেকে ভালোবেসে বলতো আবার অনেকে হিংসা করেও বলতো।
যাইহোক আমরা আসলে কেমন বন্ধু এর কয়টা উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে।আমার বড় আপা ছোট বেলা থেকে মেধাবী ছাত্রী। আম্মার ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। তাই গ্রামে হলেও ওকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করিয়েছে।ও যখন কলেজে পড়ে তখন আমাদের গ্রামের কলেজে মাত্র দুই জন ছাত্রছাত্রী ছিল। একজন ছেলে একজন মেয়ে।দুই জন ছাত্রছাত্রী হওয়ায় ওরা খুব ভালো বন্ধু ছিল। ছেলেটার নাম ছিল আসাদ। আমরা তাকে আসাদ ভাই বলে ডাকতাম। ওনি মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসতেন।খুব আদর করতেন। ইন্টার পাশ করার পর আপা ঢাকা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ ও পায়। কিন্তু তখন আমাদের ঢাকায় কেউ ছিলনা তাই থাকার জায়গার অভাবে ভর্তি হতে পারেনি। কিন্তু আসাদ ভাই ভর্তি হয়ে যায়।আপা আর কি করবে আমাদের উপজেলা সদরের ডিগ্রি কলেজে বিএসসি তে ভর্তি হয়।সে বছর ঈদের ছুটিতে আসাদ ভাই বাড়িতে আসলে আমাদের বাড়িতে আসেন,আপা কোথায় ভর্তি হয়েছে জানতে।তখনতো আর হাতে হাতে মোবাইল ছিলনা।
আপার এসব কথা শুনে খুব মন খারাপ করলেন।বললেন আামার ভাই ভাবি অনেকে থাকেন ঢাকা। আগামী বছর আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।সেই কথা ঠিক থাকলো, পরের বছর আপা গনিতে অনার্সে ভর্তি হয়।
আসাদ ভাই থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।কিছু দিন পর হঠাৎ আসাদ ভাই আপাকে বলে তুমি যদি রাজি থাক পড়াশোনা শেষ করে আমরা বিয়ে করব। তখন আমাদের মোবাইল ছিলনা।বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে প্রথমেই আপা চিঠি লিখে আম্মার কাছে।আসাদ ভাই ওকে বিয়ে করতে চাই।আম্মা আবার আপাকে চিঠি লিখে এসব পরে দেখা যাবে।পরে যদিও আসাদ ভাই এর সাথে আপার বিয়ে হয়নি।
আর আমার ছোট আপাও ভালোবেসে বিয়ে করেছে। ওদের যখন সম্পর্ক ছিল তখন ভাইয়া মেসে থাকতো। আমি প্রায়ই তাদের মেসে বেড়াতে যেতাম। দুই তিন দিন থাকতাম। আমরা তিন জন বেড়াতে যেতাম।ভাইয়া বাড়িতে গেলে আমাদের জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসত।
কয়েক দিন আগে আমার একটা মেয়েকে ভালো লাগে।কিন্তু আমি যখন আমার বোনদের বললাম ওরা খুশি হলো না। আমাকে অনেক কিছু বুঝাতে লাগল।ওদের পরিবার এমন, ওর নানা বাড়ি তেমন আরও অনেক কিছু।তুমি যদি পছন্দ করার মত কাউকে পছন্দ করতা আমরা একবার ও না বলতাম না।এসব কথা শুনে আমি ওদের ভুল বুঝতে শুরু করলাম।ওদের দূরের মানুষ ভাবতে লাগলাম। আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে বিষয় টা শেয়ার করলাম। ও আমাকে সাপোর্ট করল।দুই বছর এভাবে কেটে গেল। দুই বছর পর মেয়েটার আসল চেহারাটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি যাকে ফেরেস্তা ভাবতাম সে আসলে এর বিপরীত।আমার আম্মা এবং আপারা যা বলত তাই সত্যি হিসাবে আমার সামনে ফুটে উঠলো।কেন ওরা অখুশি ছিল আমি বুঝতে পারলাম।
আমরা তাদের কে বেস্টফ্রেন্ড ভাবি যারা আমাদের হ্যাঁতে হ্যাঁ বলে না তে বলে না।সে হয় ভালো-মন্দ বিবেচনা করার প্রয়োজন বোধ করে না। না হয় সে ও আমার মত,ভালো মন্দ বোঝার বয়স এখন ও হয়নি।কিন্তু আমারা যদি মা-বাবা, ভাই বোনকে বেস্টফ্রেন্ড ভাবতে পারি এবং তাদের কাছে সব কিছু শেয়ার করতে পারি তাহলে আমরা যেমন বড় বড় ভুল করা থেকে রক্ষা পেতে পারি তেমনি নিজের জীবনকে সুন্দর করে গড়েও নিতে পারি।
আমি আমার ছোট্ট জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছি প্রতিটি মা বাবার উচিত সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা ভয়ভীতির নয়।