মাওলানা সাহেব জীবিত থাকা অবস্থায় ছাদিকের লোভাতুর অগ্নি দৃষ্টি ভস্ম করতে পারেনি মাওলানা সাহেবের বিষয়-সম্পত্তি।তিনি নিজ প্রচেষ্টায় সব আগলে রেখেছিলেন আর তার দুই ছেলের মধ্যে সাম্যতা বজায় রেখেছিলেন।কিন্তু আলীর মেয়ের যখন তিন মাস বয়স তখন হঠাৎ এক কোরবানি ঈদের দিন মাওলানা সাহেব মারা গেলেন আর তখন থেকেই বিপত্তির শুরু।
মাওলানা সাহেবের মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর ছাদিক বলতে শুরু করলো,ভাইসাবের বউ আছে,বাচ্চা আছে, আমি একা।ভাইসাব কোনো কাজ করে না,আমরা পৃথক হয়ে যাবো।মাওলানা সাহেবের স্ত্রী ছোটো ছেলের পক্ষ নিলো।একদিন পাড়ার মুরুব্বিদের ডেকে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ভাগ করতে বসলো।নিয়ম অনুযায়ী সব জিনিস সমান দুইভাগ হওয়ার কথা,প্রথমে জমি ভাগ হবে।ছাদিক বললো,মা আমার সাথে থাকবে তাই মায়ের অংশ আর আমার অংশ একসাথে থাকবে।ভাইসাবেরটা আলাদা করে দেন।ভালোভালো জমিগুলো নিজের ভাগে নিয়ে বাকিগুলো আলীকে দিতে বললো।
আলী কিছুই বললো না,যা দিলো তাই নিলো।এরপর গরু ভাগ করবে,চারটা গরু।ছাদিক বলে উঠলো,"গরু ভাগ হবে কি,এসব গরু আম্মা পালন করছে,তাই এই সব গরু আমার।" ঘরের জিনিস ভাগ করতে গেলে বললো,এসব জিনিস আম্মা যতদিন আছে আম্মার সাথে থাকবে,আম্মা না থাকলে পরে ভাগ হবে।
ঘর ছিলো দুইটা,একটা বড় ঘর,আরেকটা ছোট। ঘরের প্রসঙ্গ আসার আগেই ছাদিক বলে উঠলো,বড় ঘরে আম্মা থাকবে।ঘর ভাগ করা যাবে না।এতোক্ষণে আলী বললো,তাহলে কি ভাগ হলো?ছাদিক সাথে সাথে বলে উঠলো,জমি পেয়েছেন এটাই বেশি,আপনি সংসারের জন্য কি করেছেন! আলী আর কিছু বললো না।আসলে পৃথক হওয়া ছিলা অজুহাত মাত্র।মাওলানা সাহেবের মৃত্যুর পর ছাদিক আলীকে বঞ্চিত করে কিভাবে সব দখল করবে সেটা ভাবছিলো,মাকে সাথে নিয়ে এই মিশন সফল করার জন্যই ছিলো এই ভাগ বাটোয়ার নাটক।
সব নিজের মতো করে নিলেও সামান্য যেটুকু জমি আলীকে দিতে হয়েছে তাতেও ছাদিকের সহ্য হচ্ছিল না,কিন্তু কিছু করার নাই তাই দিতে হলো।
এখন দুইভাই এর আলাদা সংসার।আলীর সংসার ভালোই চলছিলো।বাবার কিছু জমি পেয়েছে আর শ্বশুর বাড়ি থেকে সমর্থন ছিলো,সাহায্য সহযোগীতা করতো।কিন্তু কিছু দিন যেতেই ছাদিকের মাথায় নতুন বুদ্ধি এলো।ও বিদেশ যাবে।বিদেশ গিয়ে প্রচুর টাকা আয় করবে,বাড়ি কিনবে,গাড়ি কিনবে।প্রথমে মায়ের অংশের জমি ও নিজের অংশের কিছু জমি বিক্রি করে দালাল কে টাকা দিলো।দালাল ছিলো অনেক দূরের সব টাকা পয়সা নিয়ে পালিয়ে গেলো,বিদেশ যাওয়া আর হলো না।আবার অন্য দালাল ঠিক করলো।
এবার আলীর কাছে এসে ছাদিক বললো,ভাইসাব এবার পরিচিত দালাল ঠিক করেছি,এবার কোনো সমস্যা হবে না।কিন্তু আমার যা জমি আছে তা দিয়ে হবে না,আপনার জমি বিক্রি করে টাকা দেন আমি বিদেশ গিয়ে সব ফিরিয়ে দিবো।আলী রাজি হয়ে গেলো ছাদিকের এক কথায়।আলীর স্ত্রী, বড় শালা সবাই খুব নিষেধ করলো কিন্তু আলী শুনলো না জমি সব বিক্রি করে ছাদিককে টাকা দিয়ে দিলো।কয়েকদিন পর ছাদিক বললো, এই টাকায় হবে না,আরও টাকা লাগবো,এবার আর জমি নাই,তারজন্য বড় ঘরটা বিক্রি করে দেই,আমি বিদেশ গিয়ে এর থেকে বড় ঘর বানিয়ে দিবো,ভাইসাব আপনার চিন্তা করার কোনো দরকার নাই।আলী তাতেও রাজি হয়ে গেলো,ঘর বিক্রি করে টাকা দিয়ে দিলো।
তারপর একদিন তারিখ নির্ধারিত হলো,বাড়ি থেকে বিদায় জানিয়ে ছাদিক চলে গেলো।জার্মান গেলো।কিন্তু জার্মান এয়ার্পোটের ইমিগ্রেশন বিভাগ আটকে দিলো।নকল ভিসা তাই দেশে ফেরত পাঠানো হলো।এবার ছাদিক আর বাড়িতে আসলো না,ঢাকায় রয়ে গেলো।
জাল ভিসা দেওয়ার কৈফিয়ত চাইতে গেলে দালাল নিজের শালীকে ছাদিকের সাথে বিয়ে দিয়ে ছাদিককে শান্ত করলো।ঢাকাতেই সংসার পাতলো ছাদিক।নিজের মায়ের কিংবা ভাইসাবের খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না।ছাদিকের অতিলোভে জায়গা-জমি,ঘরবাড়ি হারিয়ে আলীর পরিবার ধ্বংসের মুখে পড়লো,ভাঙা ঘরে না খেয়ে তারা জীবনযাপন করতে লাগলো।আর অন্যদিকে শহরে সাদিকের স্ত্রী সন্তান আরাম আয়েশে দিন কাটালো।
পরবর্তীতে অবশ্য আলীর স্ত্রী কষ্ট করে,নিজের বাপেরবাড়ির সাহায্য নিয়ে হলেও সব সামলে নিয়েছে,আর নিজের পরিবারকে আদর্শ পরিবার রুপে গড়ে তুলেছে।
নিজের লোভের শাস্তি অন্যের উপর চাপিয়ে শহরে গিয়ে বাসা বেঁধে, দালালের কাছ থেকে টাকা আদায় করে, সেই টাকা দিয়ে শহরে সংসার পেতে, শুধু নিজের সুখের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা ছাদিকের এই অভিপ্রায়কে উপরওয়ালা হয়তো কবুল করেন নাই।তাই ছাদিক এখন ভালো নেই,ভালো নেই তার পরিবার।তার সন্তানেরা মানুষের মতো মানুষ হতে পারিনি,তার কথা কখনোই শুনে নি।তার ছেলে হয়ে যায়,নেশার জগতের বাসিন্দা।আর অন্যদিকে আলী ভাই এর কাছ থেকে প্রতারণার শিকার হয়েও,তার স্ত্রীর দুরদর্শিতায় সন্তানদের মাধ্যমে নাম-ডাক পেয়ে সম্মানের সাথে পার করলো জীবন।