বুক রিভিউঃ আয়নামহল

Words
509
Reading
3 min
Listen
Play
5y

"মোহ জাগবে,ঘুচে যাবে,সম্পর্ক গড়বে,ভাঙবে,আবার নতুন করে তৈরি হবে,কিংবা হবে না...জীবন তো এরকমই হওয়া উচিত"
"এনি ড্যাম রিলেশনশিপ...জীবনের একটা পার্ট মাত্র।গোটা জীবন নয়।"
"প্রেম কখনও অক্ষয় হয়নারে ভাই।ভেরি মাচ পেরিশেবল।নশ্বর।কোল্ড স্টোরেজে রেখে দিলে কিছু দিন থাকে বটে,তবে শেষ পর্যন্ত পচেই যায়।তখন তার থেকে দুর্গন্ধ বেরোয়।তার চেয়ে উবে যাওয়া ঢের ভালো।"(আয়নামহল,সুচিত্রা ভট্টাচার্য)

উপরের উক্তিগুলো সুচিত্রা ভট্টাচার্যের উপন্যাস আয়নামহলের।আয়নামহল উপন্যাসটি লেখিকার 'কাছের মানুষ','আমি মাধবী' উপন্যাসের মতো এতো জনপ্রিয় নয়।জনপ্রিয় না হলেও উপন্যাসটি পড়লে ভাবনার সাগরে ডুব দিতে হবে এটা নিশ্চিত।জীবন সম্পর্কে গভীর কথা রয়েছে এই উপন্যাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়।

লেখার শুরুতেই যে উক্তিগুলো ছিলো সেগুলো উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দিব্যজ্যোতি সিংহের।দিব্যজ্যোতি একজন নামি চিত্রশিল্পী।উপন্যাসের শুরু হয় গ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করে বিমোহিত হওয়া দিব্যর বর্ণনা দিয়ে।বয়স পঞ্চাশ পার হলেও যার দেহ ও মন পঁচিশ বছরের তরুণের মতো।আর্ট কলেজে দিব্যজ্যোতির জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে তখন সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে আসে গ্রামের দুঃস্থ মহিলাদের সাহায্য করার জন্য।"সুবর্ণলতা" নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলে যেখানে মহিলাদেরকে হাতের কাজসহ বিভিন্ন কাজ শিখানো হয়,যাতে তারা সাবলম্বী হতে পারে।সুবর্ণলতা নিয়েই তার সব স্বপ্ন।এসব বর্ণনা দেখে প্রথম দিকে মনে হচ্ছিল লেখিকা বোধহয় কোন মহান সমাজসেবক এর কাহিনি শুনাতে যাচ্ছেন।

কিন্তু ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে দিব্যজ্যোতির আসল চরিত্র।বিবাহিত হওয়া সত্বেও পরকীয়া যার নিত্যসঙ্গী।ছাত্রী পারমিতা,মাসতুতো বোন রোহিণীর সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক।রোহিণীর ছোট বোন কৃতিকার সাথেও তার দৈহিক সম্পর্ক হয়।উপন্যাসের শুরু থেকে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দেখা যায়,কল্পনা নামে।কল্পনা দিব্যর বাড়ির হোমমেইড এর মেয়ে।কাজের মেয়ে হলেও দিব্যর পরিবাবের একজন সদস্য হিসাবে সে বড় হয়ে উঠে।দিব্যকে সে মামা বলে ডাকে এবং পিতৃতুল্য ভক্তি করে।উপন্যাসের প্রথম থেকে এই ভক্তি দেখা যায়।উপন্যাসের মাঝের দিকে দিব্য যে চরিত্রহীন সেটা জানার পর আমি ভাবছিলাম তাহলে কি কল্পনার সাথেও দিব্যর শারীরিক সম্পর্ক আছে!পরক্ষণেই আবার এটা ভাবছিলাম, না, যে মেয়েটা দিব্যকে মামা বলে ডাকে,পিতৃতুল্য মনে করে তার সাথে অন্তত দিব্য এমন করবে না।কিন্তু আমাকে হতাশ করে দিয়ে লেখিকা জানিয়ে দেয় যে,হ্যাঁ কল্পনার সাথেও দিব্য একি কাজ করেছে যা সে অন্যদের সাথে করেছে।এর মাধ্যমে দিব্যর চরিত্রহীন হওয়ার চুড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়।আর এই চরিত্রহীন হওয়ার কারণেই প্রেম করে বিয়ে করা স্ত্রী পৃথা তাকে ছেড়ে চলে যায়।কেইবা এইরকম চরিত্রহীনের সাথে সংসার করবে।

তের অধ্যায়ের এই উপন্যাসের প্রথম এগারো অধ্যায়েই একজন চরিত্রহীন ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে খেলতামাশা দেখে পাঠক বিরক্ত হওয়ার কথা।একজন চরিত্রহীন যার নিজের সন্তানের প্রতি বিন্দুমাত্র মায়া নেই সেই ব্যক্তিকে লেখিকা কেনো উপন্যাসের মূল চরিত্র করলেন এবং একের পর এক তার রাসলীলার বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছেন!কিন্তু শেষের দুই অধ্যায় পড়ে পাঠকের সেই বিরক্তি কেটে যাবে।জীবন সম্পর্কে সেখানে রয়েছে গভীর চিন্তা-ভাবনা।
দিব্যর জীবন সাদা এবং কালো মিশ্রিত।ছোটবেলায় সে একটি ফড়িং ধরে সেটি কাঁচের বোতলে রেখে ঘন্টার পর ঘন্টা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে,ফড়িংটির ছবি আঁকে, পরক্ষণেই আবার ফড়িংটিকে বের করে একটি একটি করে ডানা ছিঁড়ার বর্ণনাটি দিব্যর পুরোজীবনের প্রতিফলন।

দিব্য কি শুধুই চরিত্রহীন আর বাকিসব ক্ষেত্রে সে নীতিবান?সুবর্ণলতা প্রতিষ্ঠার একমাত্র উদ্দেশ্য কি গ্রামের দুঃস্থ মহিলাদেরকে সাবলম্বী করে তুলা?
কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত সুবর্ণলতার?দিব্যর মাসতুতো বোন কৃতিকার গর্ভে জন্ম নেওয়া তার সন্তান যে কিনা অন্য আরেকজনকে বাবা হিসাবে জেনে বড় হচ্ছে তারইবা কি হবে?

উপন্যাসের নাম আয়নামহল কেনো রাখা হলো?উপন্যাসের কাহিনি চাপিয়ে দিব্যর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে দিব্যর গাওয়া লালন সাঁই এর গান,"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়" এর একটি শব্দ আয়নামহল থেকেই উপন্যাসর নাম নির্বাচন করেন লেখিকা,যেটি দিব্যর মুখে বলা এই পার্থিব জীবনের শেষ শব্দ।

IMG_20210830_210534.jpg

বুক রিভিউঃ আয়নামহল | Ecency