এবার তবে যেতে হবে

Words
559
Reading
3 min
Listen
Play
5y

সেই দশ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে ঢাকা শহরে চলে যাওয়ার পর, এই প্রথম এতো বড় ছুটি পেলাম,করোনার সুবাদে।স্কুল-কলেজের ছুটি এক সপ্তাহ থেকে এক মাসের বেশি পাওয়া যায়নি আগে।এই এক সপ্তাহখানেক বাড়িতে থেকে মন ভরতো না,মনে হতো ইশ্ আর কয়দিন বেশি যদি থাকতে পারতাম।সেই চাওয়া বিধাতা পূরণ করলেন এইবার।সেই যে গত বসন্তের আগের বসন্তে বাড়িতে আসলাম আর যেতে হয়নি।মেডিকেল যে বন্ধ হয়েছিল আর খুলেনি।ডাক্তারি পড়া সবেমাত্র শুরু করেছি এমন সময়ই বন্ধ হয়ে গেলো।বাড়িতে এখন প্রায় দেড় বছর হতে চললো।তবে এবার যেতে হবে।

শহরে যখন থাকতাম তখন মনে হতো,কবে বাড়ি যাবো,কবে বাড়ি যাবো।তখন এও মনে হতো হয়তো শহরে বেশিরভাগ সময় থাকার কারণে মনে হয় বাড়ি যায়,বাড়িতে যদি বেশিদিন থাকি তবে হয়তো মনে হবে না শহরই ভালো,শহরে ফিরে যায়।কিন্তু এই দেড় বছরে আমার একবারও মনে হয়নি যে শহরে ফিরে যাওয়াই ভালো হবে।হ্যাঁ হয়তো পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে এইভেবে খারাপ লেগেছে,তবে কখনও মন চাই নি শহরে যেতে।এর কারণ হয়তো আমার জন্ম গ্রামে,জন্মের পর শৈশব পার করেছি গ্রামে।গ্রামেই আমার শিকর।তাই শিকরের টানের কারণে শহর আমাকে তেমন আকৃষ্ট করে না।

গ্রামের প্রকৃতির যে রুপ সে রুপের বর্ণনা কবিতা,গল্পে অনেক পড়েছি কিন্তু এর পূর্বে একদম কাছ থেকে এভাবে নিরীক্ষণ করা হয়নি।হ্যাঁ,ছোট সময় হয়তো গ্রামে ছিলাম,কিন্তু তখন প্রকৃতির সৌন্দর্য বুঝার বয়স হয়নি।আবার যখন শহরে থাকতাম তখন ছুটিতে হয়তো কিছুদিনের জন্য বাড়িতে আসতাম,কিন্তু ঐ অল্প কয়দিনের ছুটিতে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার সৌভাগ্য কখনও হয়ে উঠতো না।এইবার সেই সৌভাগ্য হয়েছে,প্রতিটাক্ষণ বাংলার এই আসল রুপ যা গ্রামের প্রকৃতিতে বিরাজমান তা দু-চোখ ভরে দেখেছি।

গ্রামের একজন মানুষ যে জন্মগ্রহণ করেছে গ্রামে, শৈশব,কৈশোর পার করেছে গ্রামে এবং সর্বোপরি সে সবসময় গ্রামেই থাকে,এমন মানুষ গ্রামের এই অপরূপ সৌন্দর্য কখনই উপলব্ধি করতে পারে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।গ্রামের এই অতীব সুন্দর রুপকে সে বা তার মন ধরে নেই প্রকৃতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে।তবে আমার মতো যারা জীবনের বেশিরভাগ সময় শহরে কাটিয়েছে তারা গ্রামের এই রুপকে প্রকৃতির অসাধারণ সৃষ্টি হিসেবেই উপভোগ করবে।

সকালে পুকুরপাড়ে বসে যেদিকেই তাকায় সবুজ আর সবুজ, সবুজের সাথে নীল।গাছপালা সবুজ সাথে দেখা যায় নীল আকাশ।আকাশ অবশ্য সবসময় নীল থাকে না,একেক ঋতুতে আকাশের রং হয় একেক রকম।তবে এখনকার শরৎকালীন আকাশ নীল আর সাথে সাদা মেঘের পাহাড়।বর্ষাকালেতো বেশিরভাগ সময় আকাশ কালো হয়ে থাকে,তবে বৃষ্টি শেষে নির্মল পরিষ্কার নীল আকাশ দেখা যায়।যাইহোক,পুকুরের শেষ সীমানা থেকে ফসলের জমির শুরু।ফসলের জমি বলতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা ধানের ক্ষেত।এই বঙ্গদেশেতো ধানই প্রধান ফসল।ধানের গাছ যখন ছোট থাকে তখন হালকা সবুজ আর তারপর থেকে পাকার আগপর্যন্ত গাঢ় সবুজ।আর ধানের গাছ যখন গাঢ় সবুজ থাকে তখন পুরো গ্রামকেই মনে হয় সবুজের স্বর্গ রাজ্য।তখন গাছপালা সবুজ,ধানের ক্ষেত সবুজ আর আকাশ নীল এই তিনের মিলনে যে দৃশ্যের উৎপত্তি হয় তার দিকে তাকিয়ে থেকে দিন পার করা যায়।

কিছুদিন আগে বর্ষাকাল গেলো,বর্ষাকালে চারপাশে পানি আর পানি।ফসলের ক্ষেতেও পানি থাকে।আর পুকুর,খাল,বিলতো পানিতে টাইটুম্বুর।সর্বত্র মাছ ধরার একমাত্র মৌসুম।যেখানে সেখানে মাছ পাওয়া যায়।
আজকালতো শহরে শীতই অনুভূত হয় না।শীতের আসল স্বাদ পাওয়া যায় গ্রামে।গ্রামের ভাষায় বলা "মাঘ মায়া শীত" এর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দিগন্তে চোখ ভুলালে কুয়াশার কারণে অস্পষ্ট প্রকৃতির যে রূপ দেখতে পাওয়া যায় তা শরীরের পাশাপাশি মনকেও ঠান্ডা করে।

অনেকেই বলে থাকে যে ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ কথাটা নাকি শুধু বই এর নিরস পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ, বর্তমানে বাস্তবে এর দেখা নেই।হ্যাঁ হতে পারে শহরে ষড়ঋতু বলতে কিছু নেই,কিন্তু বাংলার গ্রামে বই পুস্তকে লিখা ষড়ঋতুর প্রতিটা বৈশিষ্ট্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং এই দেড় বছর আমি করেছি তা বারংবার,প্রতিটা মূহুর্তে।

সে যাইহোক,এই মায়াবী প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য ছেড়ে এখন আমাকে চলে যেতে হবে সেই যান্ত্রিক শহরে।কোনো একদিন হয়তো আবার কোন এক ছুটিতে দেখা হবে এই সৌন্দর্যের লীলাভূমির সাথে,তবে এবারের মতো এতোভালোভাবে হয়তো আর তার রূপের মায়ায় পড়তে পারবো না,পারবো না গভীরভাবে উপভোগ করতে।

IMG_20210907_134959.jpg

এবার তবে যেতে হবে | Ecency