আমার আম্মারা ছিলেন দুইবোন।খালাম্মা ছিলেন ছোটো।খালাম্মার নাম ছিলো জাহারা।খালাম্মার গায়ের রং নাকি ছিলো ফর্সা,গোলগাল গঠন,দেখতে খুব মিষ্টি।আর চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোটো হওয়ায় মামাদের আদুরে ছিলেন।ছোটোবেলা থেকে খালাম্মা পড়ালেখা করতে একদম পছন্দ করতেন না,ঘরের কাজ করতেও নাকি একদম পছন্দ করতেন না।কিন্তু বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজে ছিলেন পারদর্শী।হাতপাখা,রুমাল,বালিশের কভার,রুমাল,বিছানার চাদর এসবে নকশা তুলতেন।গল্প আড্ডা এসব খুব ভালোবাসতেন,কারণে অকারণে শুধু হাসতেন।উনার জীবনে কোনো কষ্ট ছিলোনা।বেশি হাসাহাসি করতেন বলে নানু নাকি খুব বকাবকি করতেন।
বাড়িতে কোনো বড় ধরনের সমস্যা হলেও ওনি নিজের মতো স্বাভাবিক থাকতেন।আম্মা যদি বলতেন,বাড়িতে এতো সমস্যা তার জন্য তোর কি চিন্তা হয়না,মন খারাপ হয়না!
"আমি চিন্তাও করতে পারি না,মন খারাপও করতে পারি না,কি করবো!" বলে হেসে লুটিয়ে পড়তেন।আম্মা তখন খুব বিরক্ত হতেন।যখন খালাম্মার বয়স পনের হলো,তখন বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো আপন মামাতো ভাই এর সাথে।
খালাম্মার শ্বশুর বাড়ি বড় গেরস্ত পরিবার।এক মৌসুমে ধান উঠে দুইশো-আড়াইশো মণ।এছাড়াও আলু,মরিচ,পেঁয়াজ,রসুন,সবজি এসবতো আছেই।যে মানুষটার ঘরের কাজ করতে একদমই ভালো লাগতো না,যেখানে সেখানে শুয়ে ঘুমিয়ে যেতো।তার এখন কাজ শুরু করতে হয় ফজরের আজানের পর,আর শেষ করতে হয় মধ্যরাতে।সদা হাসোজ্জল কাজ ফাঁকি দেওয়া মেয়েটা সংসারের এই ঝামেলা হাসি মুখেই মেনে নেয়।এসব তার মুখের হাসি কেড়ে নিতে পারে না।
এর মধ্যেই মাস ছয় পার না হতেই খালাম্মা গর্ভবতী হলেন।তখনতো আর গর্ভবতী হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে,চেকআপ করাতে হবে এসব ছিলো না।বাচ্চার পজিশন কিংবা লিঙ্গ কিছুই আগে থেকে জানা যেতো না।অভিজ্ঞ ধাত্রীর মাধ্যমে বাচ্চা খালাশ হতো।ধাত্রীও ট্রেনিং প্রাপ্ত থাকতো না।খালাম্মা বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য মামা বাড়িতে চলে আসলেন।একদিন প্রসব বেদনা শুরু হলো।কিন্তু বাচ্চার পজিশন ছিলো উল্টো।তারপর ধাত্রী চেষ্টা করে বাচ্চা খালাশ করলো।মেয়ে হলো।কিন্তু ধাত্রী কিভাবে না জানি বাচ্চার হাত ধরে টান দিয়েছে,বাচ্চার ডান হাতের শিরা বিছিন্ন হয়ে যায় আর ওর ডান হাত বিকলাঙ্গ হয়ে যায়।
বাচ্চা জন্মের দুই মাস পর নানু লক্ষ্য করলো মেয়ের ডান হাত অবশ।যেমন করে রাখা হয় তেমন পরে থাকে উঠাতে পারে না।হাত অনেক ভারী,তখন ডাক্তার ডাকলো।ডাক্তার বললো হাতের সব শিরা বিছিন্ন হয়ে গিয়েছে,এটা আর সেরে উঠবে না।একথা শুনার পর খালাম্মা চিৎকার করে কান্না।এরপর থেকে খালাম্মা ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করে না,ঘুমায় না শুধু কান্না করে।আর সারাক্ষণ বলতে থাকে,আমার মেয়ের কি হবে,মেয়ে বড় হলে বিয়ে দিতে হবে,ডান হাতভাঙা মেয়েকে কে বিয়ে করবে!
কারণে অকারণে হাসতে থাকা খালাম্মার হাসি হারিয়ে গেলো।যে মেয়েটা বলতো আমি চিন্তা করতে পারি না কি করবো তার কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠলো।মাস তিনেক যেতে না যেতেই খালাম্মা আবার গর্ভবতী হলো।মেয়ে জন্মের সময় হাত ভেঙে গিয়েছে,তাই খালাম্মার শ্বাশুড়ি বলে দিয়েছে এবার বাচ্চা হবে উনাদের বাড়িতে।সেইমতে এবার খালাম্মা শ্বশুর বাড়িতে রয়ে গেলো।এবার খালাম্মার ছেলে হলো।বাচ্চা আর মা দুইজনই অসুস্থ। এক সপ্তাহ পর ছেলে মারা গেলো,এতে খালাম্মা আরও ভেঙে পড়লো।
ছেলের জন্য খালাম্মা এতো চিৎকার করে কান্না করতো যে আশপাশের মানুষ অবাক হয়ে যেতো।বলতো এক সপ্তাহের ছেলের জন্য কেউ এভাবে কাঁদে!দিন যেতে লাগলো,খালাম্মা এখন আর ভালো নেই।ছেলে হারানোর শোক,মেয়ের চিন্তা, নিজের অসুস্থতা,শ্বশুর বাড়ির কাজের চাপ সব মিলিয়ে খালাম্মার খুব খারাপ দিন যাচ্ছিলো।শ্বশুর বাড়ির লোক বাপের বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন থাকার অনুমতিও দিতো না।আজ গেলে কাল চলে আসতে হবে।এর মাঝে খালাম্মা আবার গর্ভ ধারণ করলেন।
এবার খালাম্মা ভীষণ অসুস্থ।বাচ্চা পেটে আসার দুইমাসের মধ্যে সারা শরীর ফুলে গিয়েছে।খাওয়া-দাওয়া করতে পারে না,হাঁটা চলা করতে কষ্ট হয়।বড় মামা কয়েকবারই খালাম্মাকে বাড়িতে নিয়ে আসতে গেলো,কিন্তু শ্বশুর শ্বাশুড়ি রাজি না হওয়ায় আনতে পারে না।সেই মেয়ের হাত ভেঙে গেছে এই অজুহাতে খালাম্মাকে মামা বাড়িতে থাকতে দিতে নারাজ।কিন্তু ওদের বাড়িতে থেকে যে ছেলে মারা গেলো এ বেলায় কোনো হিসাব নেই।
খালাম্মা অসুস্থ, আবার শ্বশুর বাড়িতে থাকলে এ অবস্থায় কাজও করতে হয়।তাই নানু গিয়ে থেকে আসলো,আবার আম্মা গেলো।আম্মা আসার পর নানু গেলো।এভাবে সময় কেটে গেলো।
এবার আবার খালাম্মার মেয়ে হলো।কিন্তু খালাম্মার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ।রক্তপাত বেশি হচ্ছে,উঠে বসতে পারে না,শরীরে শক্তি নেই।বড় মামা উপজেলা সদর থেকে ডাক্তার নিয়ে আসলেন,ডাক্তার ঔষধ পত্র দিলেন।কিন্তু ঔষধে কোনো কাজ হচ্ছে না,খালাম্মার অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে।মেয়ে জন্মের বিশ দিনের রাতে,আমার খালু খবর নিয়ে আসলো,জাহারার খুব খারাপ অবস্থা,শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
মামা তাড়াতাড়ি উপজেলা সদরে গিয়ে ডাক্তার নিয়ে গেলো।ডাক্তার বললো ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।তখন আমাদের কিশোরগঞ্জে ভালো কোনো হাসপাতাল ছিলো না।তাই ময়মনসিংহ নিয়ে যেতে হবে।তখন প্রায় মধ্যরাত এম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছিল না।তাই রাতে আর হাসপাতালে নেওয়া যাবে না।ভোর হওয়ার সাথে সাথে নিয়ে যাওয়া হবে।ছোটো মামা আমাদের বাড়িতে গেছে আম্মাকে আনতে।ছোটো মামা আম্মাকে বললো,তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হো।ভোর হলে জাহারাকে নিয়ে ময়মনসিংহ হাসপাতালে রওনা দেব,তুইও সাথে যাবি।ছোটো মেয়েকে রাখতে হবে।
আম্মাকে নিয়ে ছোটো মামা ফজরের আজানের আগেই রওনা দিলো খালাম্মাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।তখন প্রচন্ড শীত।আম্মাকে নিয়ে খালাম্মাদের বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই খালাম্মা জগৎ সংসারের মায়া কাটিয়ে পরপারে চলে গেলেন,হাসপাতালে আর নেওয়া হলো না।খালাম্মা মারা যাবার পর মেয়ে আর বিশ দিন বেঁচে ছিলো।চল্লিশ দিন বয়সে সেও চলে গেলো।আমার নানু ছোট মেয়ের এই অকাল মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে এক মাস বিশ দিন পর মারা গেলেন।খালাম্মা মারা যাবার পর খালু আবার বিয়ে করলেন,তাদের জীবন আবার একই ছন্দে চলতে লাগলো।ছন্দ কেটে গেলো আমার খালাতো বোনের জীবন থেকে,দাদির কোলে আদরে-অনাদরে বড় হতে লাগলো সে।