এক হাসপাতালের একজন রোগী অনেক রাত পর্যন্তও ঘুমাতে পারছে না । নার্স এবং জুনিয়র ডাক্তার এসে তাকে কয়েক দফা ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পড়ানোর চেষ্টা করছেন, কাজ হয়নি। খবর পেয়ে সিনিয়র ডাক্তার আসলেন। তিনি রোগীকে বললেন, আপনার রোগটা অনেক জটিল। সাধারন ওষুধে কাজ হবে না। তবে সিঙ্গাপুর থেকে আনা খুব ভাল একটা ওষুধ আছে আমাদের কাছে। আপনাকে সেটা দেওয়া হবে। অফিস থেকে সিঙ্গাপুরের স্পেশাল ওষুধ এনে রোগীকে খাওয়ানো হলো। রোগী একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়লো।
প্রকৃতপক্ষে ডাক্তার যে ওষুধটা দিয়েছিলেন, সেই ট্যাবলেটে চিনির দানা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। রোগীকে জাস্ট মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে এই বলে যে, এই ওষুধে তোমার কাজ হবেই। রোগী ডাক্তারের কথা বিশ্বাস করেছে। বিশ্বাস করার কারণে হাই পাওয়ারের মেডিসিন যে কাজ করতে পারেনি, সাধারণ গ্লুকোজ সেই কাজ করে ফেলেছে।আর এই বিষয়টাকে বা এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে বলে placebo effect(প্লাসিবো ইফেক্ট)।
Placebo হচ্ছে এমন এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি কিংবা ওষুধ, যার আসলে কোনো ঔষধী গুণাগুণ নেই; কিন্তু তারপরেও সেটা রোগীর উপরে কাজ করে এবং রোগ সারিয়ে ফেলে।
অর্থাৎ বিশ্বাস কে পুঁজি করে রোগীকে সুস্থ করে তোলা।
প্লাসিবো ল্যাটিন শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে- I shall Please, অর্থাৎ, ব্যাপারটা সন্তুষ্টির সাথে জড়িত। সম্ভবত ভণ্ড সাধু-সন্ন্যাসীরা অনেক আগে থেকেই প্লাসিবোর ব্যবহার জানতো। প্লাসিবো ব্যবহার করেই তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে ঝাড়-ফুঁক নিয়ে ব্যবসা করতো।অনেক সময় শুনে থাকবেন, পানি পড়া খেয়ে মানুষজন সুস্থ হয়ে পড়ে।এটাও আসলে একধরনের প্লাসিবো ইফেক্ট। তারা যার কাছ থেকে পানি পড়া নেয়,সেই মানুষটাকে সে প্রচন্ড বিশ্বাস করে এবং সেই বিশ্বাসের জোড়েই সে সুস্থ হয়ে পড়ে।পানি পড়ার কোনো কেমিকেল বা আধ্যাত্মিক গুনাগুণ মানুষকে সুস্থ করতে পারবে বলে জানা নেয়।
গলার মধ্যে কাটা বিঁধলে, যার ফুঁক করলে গলার কাটা ভিতরে চলে যায়,বা বিড়ালের পা ধরলে কাঁটা ভিতরে চলে যায় শুনেছেন নিশ্চয়।এগুলোই সবি প্লাসিবোর খেলা।বেপারটা হচ্ছে সে যখন বিশ্বাস করে যে আমার গলার কাটা বিধার সমাধান হয়ে গিয়িছে তখন তার ব্রেইন গলার মধ্যে সংকেত পাঠায় যে গলায় আর কাটা নেই,তারফলে গলায় কাটা যদি থেকেও থাকে তারপরও সাময়িক সময়ের জন্য সেটা অনুভূত হবে না।আর কয়েকদিন পর কাটা আপনা আপনিই চলে যাবে। যে যেটাতে বিশ্বাস করে তার সেই পদ্ধতিটা কাজ করে।
আরেকটা ঘটনা বলি। এক লোক গেছেন ডাক্তার এর কাছে, তার হাঁটুতে ব্যথা। দীর্ঘদিন ধরেই নাকি এই ব্যথা তাকে ভোগাচ্ছে। কিন্তু ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন তার হাঁটুতে কোন সমস্যাই নাই। কিন্তু লোকটার মনে তীব্র বিশ্বাস, ছোটবেলায় একদিন তিনি সাইকেল থেকে পড়ে গেছিলেন, তাতেই হয়তো তার হাঁটুতে ইনজুরি হয়েছে। ডাক্তার সাহেব ঘটনা শুনে রোগীকে বললেন আপনার একটা ছোট অপারেশন করাতে হবে। নির্ধারিত দিনে রোগীকে অপারেশন রুমে নেয়া হলো। অ্যানেশথেশিয়া করা হলো। তার হাঁটুতে কাটা-ছেঁড়া করা হলো। সেলাই দিয়ে ডাক্তার হাসি মুখে বললেন আর কোনো সমস্যা নাই । এরপর ঐ লোক আর কোনোদিন তার হাঁটুতে ব্যাথা অনুভব করলেন না। আসলে ডাক্তার কিছুই করেননি। শুধু রোগীর বিশ্বাসকে নাড়া দিয়ে তার আত্ববিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই প্রক্রিয়াটার নামই হলো প্লাসিবো পদ্ধতি। এবং এই ধরনের ভুয়া অপারেশনকে বলে Sham Surgery বা প্লাসিবো সার্জারী।
অন্য একটা বাস্তব উদাহরণ দেয়,, এক রোগী আসলো ডাক্তারের কাছে।এসে বললো,সে মুখ খুলে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।আর তখন তার মুখের ভিতর দিয়ে হয়তো কতগুলো মশা ঢুকে গেছে এবং সেগুলো এখন পেটের ভিতর অনেক কামড়াচ্ছে, খুব ব্যাথা।(ব্যাথায় রোগী গড়াগড়ি দিচ্ছিল)।
ডাক্তার ত
খন শ্যাম সার্জারির ব্যবস্থা করলেন। সিরিঞ্জ, ক্যাথেটার, রাবার টিউব আনলেন। রোগীর পায়ুপথ থেকে মশা বের করার অভিনয় করলেন। পিওনকে দিয়ে বাইরে থেকে কিছু মশা মেরে নিয়ে আসলেন। তারপরে একটি পানিভর্তি গামলায় সেই মশাদের ডেডবডি রেখে রোগীকে বললেন, “দেখ দেখ তোমার পেট থেকে সবগুলা মশা বের করে এনেছি”। প্লাসিবো ইফেক্টে কাজ করল রোগীর উপরে। সে বলল যে তার আর কোনো পেট ব্যথা নেই।
তবে সকল রোগের ক্ষেত্রে প্লাসিবো দিয়ে কাজ হয়না। মূলত নিউরোবায়োলজিকাল রোগগুলা সাময়িকভাবে সারতে পারে প্লাসিবো। এই রোগগুলার মধ্যে আছে ব্যথা (পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, কোমর ব্যথা ইত্যাদি), হতাশা, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি। ক্যান্সার কিংবা জটিল সার্জারির কাজ প্লাসিবো দিয়ে কমপ্লিট করা যাবেনা কখনোই।
কিছু কিছু ওষুধ কোম্পানি ও প্লাসিবো ইফেক্টের কথা মাথায় রেখেই ওষুধ ডিজাইন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কম দামী পেইনকিলারের চেয়ে বেশি দামী পেইনকিলার ভাল কাজ করে, ছোট ট্যাবলেটের চেয়ে সাইজে বড় ট্যাবলেট বেশি কাজ করে, সাদা ট্যাবলেটের চেয়ে রঙ্গিন ট্যাবলেট ভাল কাজ করে। ওষুধ কোম্পানিগুলোও এইভাবে আকর্ষণীয় করে ওষুধ বানায়।
সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ এর লালসালু উপন্যাসের মজিদের কথা বলতে পারি। তিনি জানতেন যে গ্রামে কোনো পুরনো কবর নেই, তারপরেও জোর গলায় বললেন, “গ্রামের কোণায় মোদাচ্ছের পীরের মাজার রয়েছে। স্বপ্নে মোদাচ্ছের পীর আমাকে দেখা দিয়ে বলেছেন যে আমার কবর বাঁধাই করে এখানে মাজার বানাও”। সেই কথিত স্বপ্ন অনুযায়ী মজিদ সেখানে মাজারের ব্যবসা গড়ে তুলল । গ্রামের মানুষ তাকে বিশ্বাস করা শুরু করলো। দূর দুরান্তের মানুষ তাদের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে মজিদের কাছে আসতো। মজিদও মাজারের উছিলায় পানি পড়া দিতো, সেই পানি পড়া খেয়ে সবার হালকাপাতলা রোগগুলো ভাল হয়ে যেতো। (তবে সিরিয়াস রোগ গুলা পানিপড়া দিয়ে মজিদ সারাতে পারতো না। যেমন- বন্ধ্যা মেয়েদের সন্তান এনে দিতে পারত না মজিদের প্লাসিবো পানিপড়া ) ।
সুতরাং, প্লাসিবো সম্পূর্ণ মনের উপর কাজ করে।