"চাচা অন্যের প্রাণ বাঁচা"

Words
1141
Reading
6 min
Listen
Play
4y

প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরীক্ষা।পরীক্ষার মাধ্যমে যা পড়ানো হয় তার মান যাচাই করা হয়,শিক্ষার্থীরা কি সঠিকভাবে পড়াশোনা করছে কিনা এর প্রমাণ পাওয়া যায় পরীক্ষার সময়।তবে আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় যে পরীক্ষা হয় তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা একে অপরের সাহায্য নিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করে।এই সাহায্য নেওয়াটা কি অসদুপায় অবলম্বন এর মাঝে পড়ে কিনা জানি না।কারণ পরীক্ষার প্রবেশ পত্রের নিচে যে নিয়মাবলি থাকে সেখানে এ ধরনের কোনো কথা থাকে না যে পরীক্ষার্থীরা একে অপরের খাতা থেকে দেখে লিখতে পারবে না।আসলে এটা কোন লিখার ভাষাও না।এটা কি আর লিখা যায়।তবে পরীক্ষার হলে যে শিক্ষক গার্ডে থাকেন তিনি অবশ্য জানেন যে এই দেখে লিখালিখিটা অসদুপায় অবলম্বন।আর তারা এই বেপারে খেয়াল রাখেন।

তবে প্রবেশ পত্রে এটা অবশ্যই লিখা থাকে কোনো প্রকার নকল সাথে বহন করা যাবে না।কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটা সময় এই নকল বহন করা একটা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে।পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীরা নকল মানে প্রশ্নের উত্তর লিখে নিয়ে যেতো এবং সেখান থেকে কপি করতো।তারপর কর্তৃপক্ষ এই বেপারে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং এই নকল পদ্ধতির নির্মূল করতে সক্ষম হন।

যাইহোক শিক্ষাব্যবস্থার এসব ফাঁকফোকর নিয়ে কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়।পরীক্ষার রুমে দেখে লেখা লেখি ভুল কাজ নাকি,ভুল কাজ হলে কতবড় ভুল তাও বলা আমার উদ্দেশ্য নয়।আমি শুধু বলতে চাচ্ছিলাম পরীক্ষার রুমে শিক্ষার্থীদের একে অপরের খাতা দেখে লেখা নিয়ে কিছু শিক্ষামূলক ঘটনা।পরীক্ষার রুমে হয়তো একজন শিক্ষার্থী কোন একটা প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারছে না,পিছনে সামনে বা পাশে অন্য কোন শিক্ষার্থী হতে ঐ প্রশ্নের উত্তরটা দেখে লিখে ফেললো।এতে অবশ্য পরীক্ষা নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য যেটা শিক্ষার্থীকে যাচাই করা সেটা পুরোপুরি ভাবে কিংবা নিখুঁত ভাবে করা সম্ভব হয় না।তবে
স্বাভাবিকভাবে সব শিক্ষার্থীই শিক্ষাজীবনে এটির সাথে জড়িত থাকে।মানুষ যতই বলুক তারা এর সাথে কোনদিন জড়িত ছিলো না,তবুও এটাই সত্য যে কোনো না কোনো ভাবে এটার সাথে জড়িত ছিলোই।হয়তো নিজে কারো খাতা থেকে দেখে লিখেনি,কিন্তু সে হয়তো অন্যকে নিজের খাতা দেখতে দিয়েছে।

এই পরীক্ষার খাতা দেখাদেখির বেপারটায় শিক্ষার্থী মূলত চার ধরনের।এক ধরনের শিক্ষার্থী রয়েছে যারা নিজে কারো কাছ থেকে দেখে লিখে না,আবার কাউকে নিজের খাতা দেখতেও দেয় না,আবার একধরনের শিক্ষার্থী রয়েছে যারা নিজে কারো কাছ থেকে দেখে না কিন্তু নিজে অন্যকে দেখায়,আবার আরেকধরনের শিক্ষার্থী রয়েছে যারা অন্যের খাতা দেখে লিখেতো ঠিক কিন্তু নিজে কাউকে দেখায় না।আবার আরেকধরনের শিক্ষার্থী রয়েছে যারা নিজেও দেখে লিখে আবার নিজে যা পারে তা অন্যকে দেখায়।

তো আমরা যদি এই বিষয়টা পরীক্ষার নিয়ম ভঙ্গের 'পয়েন্ট অব ভিউ ' বা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি তাহলে প্রথমে যে ধরনের শিক্ষার্থীদের কথা বলা হয়েছে তারা বাদে বাকি সবাই ভুলের মধ্যে ছিলো।এদের মধ্যে সব দিক দিয়েই নিকৃষ্ট তৃতীয় ধরনের লোকেরা।
আবার এই বেপারটাকে যদি শিক্ষার্থীদের একে অপরকে সাহায্য করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি তাহলে হিসাবটাতে একটু গোলমাল লাগবে।দ্বিতীয় ধরনের লোকেরা এইক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভালো,সাথে চতুর্থ ধরনের লোকেরাও।

তখন স্কুলে ভর্তি হয়নি,তবুও স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি পরীক্ষা দিতে যেতাম,আম্মা বাড়িতেই প্রথম শ্রেণীর বই পড়িয়ে ফেলে।তো ছোট মানুষ, আম্মা আর আমার বোনেরা ভরসা করতে পারতো না যদি কোনো বিপদ হয়,তাই আরেকটা পরিচিত ছেলে যে কিনা আমার থেকে বড় তার কাছে দায়িত্ব দেয় যে আমাকে দেখে রাখার এবং তার সাথে বসানোর।সে দেখলো যে আমি সব পড়ে এসেছি,তাই এরপর থেকে পরীক্ষার সময় সে আর পড়ে আসতো না আমার কাছ দেখে লিখতো।আবার যখন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম তখন আমার পাশের বাড়ির একটা ছেলে যে কিনা আমার সাথে পড়তো যদিও সে আমার থেকে চার-পাঁচ বছরের বড় ছিলো আর আকার-আকৃতিতে ও বড় ছিলো।তো এরপর বিদ্যালয়ে আমার কোন সমস্যা হলে সেই ছেলেটাই দেখাশোনা করতো এবং সবদিক দিয়ে সে আমার বেপারে খেয়াল রাখতো বিদ্যালয়ে থাকা কালীন। কিন্তু পরীক্ষার সময় আমার খাতা সে পুরোপুরি কপি করতো আমারও কিছুই বলার ছিলো না,আমার উপকার করে বলে কথা।

পিএসসি পরীক্ষায় যে ছেলেটা আমার পাশে একি বেঞ্চে বসে সে অন্য একটা বিদ্যালয়ের ছিলো এবং পিছনে যে বসে সে আমাদের বিদ্যালয়ের।তারা দুইজন আমার খাতা পুরোপুরি কপি করে,একজনতো অপরিচিত থাকে কোন কিছুর বলার সাহস আমার ছিলো না,আবার একজন তার পারিবারিক অবস্থা খুব করুণ,কষ্ট করে পড়ালেখাটা চালিয়ে যাচ্ছে আরকি।তারজন্য তাকেও দেখাতে হয়।

তারপর ঢাকার স্কুলে এসে ভর্তি হলাম।সেখানে প্রথমে ভর্তি হওয়ার সময় রোল নাম্বার খুব পিছনে থাকে,পরবর্তীতে সামনের দিকে চলে আসে,আর সেখানেও প্রচুর ছেলেরা আমার খাতা দেখে কপি করে,কিন্তু আমি কোনদিন কারো খাতা দেখিনি,কারণ তারাই আমার উপর এতোটা নির্ভরশীল হয়ে আসতো যে তাদের কাছ থেকে আমার দেখার উপায় থাকতো না।কিন্তু আমার খাতা অন্যকে দেখে লিখতে দিতে আমার বড় একটা উপকার হতো, আমার উত্তরপত্রে কোনদিন কোনো বানান ভুল থাকতো না বা কোন প্রশ্নের উত্তর ভুল দিতে পারতাম না,কারণ আমার খাতা তারা প্রুফ রিডিং এর মতো পড়তো এবং ভুলগুলো ধরিয়ে দিতো।

সে যাইহোক,তারপর একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে একি বিষয় ঘটে,আমাকে দেখেই মানুষ বুঝে যেতো এই ছেলে পরীক্ষার সময় কোনো ঝামেলা করবে না দেখাবে,তাই তারা আমার উপর ভরসা করে চলে আসতো,কিন্তু একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে প্রথম দিকে আমি তেমন পড়ালেখা করি নি,তাই অর্ধ বার্ষিকিতে ফলাফল খুব খারাপ হয়,সাথে সাথে আমার আশপাশের গুলোরও ফলাফল খারাপ হয়,তারপরও তারা পরবর্তীতে আমার উপর ভরসা রাখে কারণ আমি কখনওই দেখাতে কার্পণ্যবোধ করতাম না।এভাবে এইচএসসি পরীক্ষা শেষে হলো ভালো ফলাফল করে, সাথে অন্যদেরও।

মেডিকেলে ভর্তি হলাম,করোনা আসলো, বাড়িতে চলে গেলাম,পড়ালেখা প্রায় বন্ধই হয়ে গেলো,অনলাইনে যা পড়াতো আমি তেমন পড়তাম না।অনলাইন শেষে অফলাইন শুরু হলো,এই পুরো লিখাটার ঘটনার মূল বিন্দু এখানেই,অফলাইন শুরুর হওয়ার সাথে সাথে যে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিলো সেটা নিয়ে।

ঢাকা আসলাম,মেডিকেলে গেলাম,বেশিরভাগ মানুষই অনলাইনে তেমন পড়ালেখা করে নি,কারণ অনলাইনে মেডিকেলের মতো এমন বাস্তবিক পড়াশোনা করা কঠিন।কিন্তু মেডিকেল খোলার সাথে সাথেই পরীক্ষা।মানে অনলাইনে যা পড়ানো হয়েছে তার উপর।মেডিকেলে অবশ্য ঐ যে পরীক্ষার রুমে দেখাদেখির বেপারটার কোন সুযোগ থাকে না কোন সময়, কারণ লিখিত পরীক্ষার পড়াগুলো আবার শিক্ষকদের কাছে মৌখিক দিতে হয়,তাই কেউ আর এসব অসদুপায় অবলম্বন করে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারে না।কিন্তু এইবার পরিস্থিতি ভিন্ন,কেউ পড়ালেখা করে নি,সবাই তুমুল পড়াশোনা শুরু করলো এবং কার কেমন পড়াশোনা হয়েছে যাচাই করে নিলো।

জীবনে যত পরীক্ষা দিয়েছি, পরীক্ষার দিন পরীক্ষার রুমে ঢুকার আগে আমার সিট খুঁজে তা প্রস্তুত করে রাখতো সেসব ছাত্ররা যারা আমার কাছ থেকে দেখে লিখবে।তো এই পরীক্ষার দিন আমি গেলাম,দেখি সবাই নিজের নিজের মতো করে যে ভালো পারে তার সাথে বসার চেষ্টা করছে,ঐ পরীক্ষাটাতে সিট প্ল্যান করা ছিলোনা।যাইহোক,আমি একা গিয়ে সবার সামনে একটা কোণায় গিয়ে বসলাম।আমি জানি, আমি কোনদিন কারো কাছ থেকে দেখে লিখিনি,আজও লিখবো না, হয়তো অকৃতকার্য হবো এই পরীক্ষায়,কারণ সত্যিই আমি পড়াশোনা করিনি।আর তাই হলো একদম সাদা খাতা জমা দিলাম,কিছুই লিখতে পারিনি।আর সেদিন ভাবছিলাম,আহারে আজ কেউ একবার জিজ্ঞেসও করলো না এটার উত্তর কি হবে বা আমি কোথায় বসবো,সবাই নিজের ভালো আসন ঠিকই খুঁজে বের করে নিয়েছে।আসলে এইরকমই হয়,মানুষের স্বভাবই হয়তো এরকম,চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।

পরীক্ষা চলাকালে অন্যের খাতা দেখে লিখা হয়তো অপরাধ,কিন্তু কথাগুলো বলেছি শিক্ষার্থীদের একে অন্যকে সাহায্য করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।আর বললামইতো,মেডিকেলে এসব দেখা দেখির সুযোগ নেই,যেমন ঐ পরীক্ষায় যারা দেখে পাশ করেছিলো,তারা পরের মৌখিক পরীক্ষায় ঠিকই ফেইল করেছিলো।আমি লিখতে ফেইল করে যা,তারা পাশ করেও তা।
হয়তো অনলাইন ব্যাচ হওয়ায় আমরা মেডিকেলের নিয়মগুলো তেমন বুঝতে পারিনি বিদায় প্রথম অফলাইন পরীক্ষায় তারা এই উপায় অবলম্বন করে,কিন্তু পরবর্তী মোট ফলাফল শূন্য দেখে,নিজের উপার্জনকেই সবাই পূঁজি করতে শুরু করে এবং ফাইনালের আগে করেও ফেলে।

তারপরও দিনশেষে ঐ কয়েকটা দিনের ঘটনা আমাকে এই শিক্ষাই দেয় যে,আপনি মানুষের জন্য যতই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন না কেনো,আপনার প্রয়োজনে সাহায্যের হাত পাওয়া কঠিন কাজ,কারণ সাহায্যের হাত দুনিয়ায় স্বল্পসংখ্যক রয়েছে,তারমধ্যে হয়তো আপনারটাও রয়েছে,তাই আপনি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।তাই বলে যাদের সাহায্য করার মনমানসিকতা আছে তারা পরবর্তীতে সাহায্য পাবে না ভেবে নিজের হাতকে গুটিয়ে নিবে এটা কখনওই কাম্য নয়।

bdmorning1549726149bdm42839428394234.jpg

"চাচা অন্যের প্রাণ বাঁচা" | Ecency