মেডিকেলে ভর্তির তিন মাসের মধ্যেই করোনা মহামারি চলে আসলো।ক্লাস বন্ধ হয়ে গেলো।তিন মাসে ডাক্তারি বিদ্যার কিছুই শিখা হয় নাই।
মানুষের হাতের ধমনিতে যে রক্ত চলাচল হয় সেটা হাত ধরে অনুভব করা যায়।ডাক্তাররা খুব সহজেই হাত ধরেই পালস রেট বলে দিতে পারে।একজন রোগী কি মারা গেলো কিনা সেটার তাৎক্ষণিক নিশ্চয়তা হাতের পালস দেখে ডাক্তার বলে দেয়।এই বিদ্যা শিক্ষা এমবিবিএস এর প্রথম বর্ষের সিলেবাসে নেয়,তারপরও মেডিকেলে ভর্তির কিছুদিন পর কোনো এক সেমিনারে,বড় ভাইরা আমাদের শিখিয়েছিলো কিভাবে পালস রেট মাপতে হয়।সেটুকু শিক্ষা যথেষ্ট ছিলো হাতে রক্ত চলাচল করছে কিনা তা বুঝার জন্য।
করোনার কারণে দীর্ঘ নয় মাস যাবৎ বাড়িতে আছি।আব্বার শরীরটা ভালো ছিলো না,অসুস্থ ছিলেন।হার্ট এবং লাংসের বিভিন্ন রোগে ভোগছিলেন।হঠাৎ একদিন সকালে আম্মা ডাক দিলেন।দেখে যাও তো,তোমার আব্বা কেমন জানি করছে।আমি গেলাম,গিয়ে দেখি চোখ-মুখ উল্টিয়ে দিয়েছেন,অর্থাৎ তার সময় শেষ হয়ে এসেছে।আম্মা বললো,মুখে একটু পানি দিতে। আমি এক চামচ পানি দিলাম।সাথে সাথেই দেখা গেলো তিনি আর শ্বাস নিচ্ছেন না।আম্মা কান্নাকাটি শুরু করলো।আর বলতে থাকলো,শ্বাস নিচ্ছেন না কেনো কি হয়েছে।আমি হাতটা ধরলাম,ধরে মেডিকেলে বড় ভাইদের শিখানো নিয়মে পালস চেক করলাম।দেখলাম রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।আম্মাকে শুধু বললাম,আব্বা আর নাই।
সিনেমা নাটকে দেখেছি,ডাক্তার অপারেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে বলেন,হি/সি ইজ নো মোর...
আমার ডাক্তারি শিক্ষার শুরুতেই যে এই কথা নিজের মাকে নিজের বাবার মৃত্যু সম্পর্কে বলতে হবে সেটা ভাবিনি।
ডাক্তারদের নাকি মানুষের মৃত্যু কাবু করতে পারে না,মৃত্যুকে নাকি খুব স্বাভাবিকভাবে নেন।কেনো স্বাভাবিকভাবে নেন,তার সম্পর্কে অনেক যুক্তি রয়েছে।প্রথমেই যখন মেডিকেলে ভর্তি হয়,এনাটমি ডিপার্টমেন্টে প্রথম দিন ক্লাসে যাওয়ার পরই দেখতে হয় কেডাভার,লাশ।প্রতিটা দিন এই লাশ সামনে রেখে ক্লাস করতে হয়।লাশটা কেটে ছিড়ে বিভিন্ন কিছু শিখতে হয়।এভাবে লাশ আর জ্যান্ত মানুষের মধ্যে ভয় ভীতির যে পার্থক্য সেটা বুঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
তারপর আসে হাসপাতালের বিভিন্ন রোগীর মৃত্যু। প্রতিদিনি প্রায় মৃত্যু দেখতে হয়।একটা জিনিস বার বার দেখতে থাকলে, একটা ঘটনা বার বার আপনার জীবনে ঘটতে থাকলে,সেই ঘটনা যত ভয়ংকরি হোক না কেনো,কিছু দিন পর সেটা আপনার কাছে ডাল-ভাত মনে হবে।যেটা অন্যের কাছে ভয়ংকর আপনার কাছে তা খুবি সামান্য ঘটনা মনে হবে।এসব কারণেই মৃত্যু ডাক্তারদের মনে কোনো দাগ কাটতে পারে না।
আব্বার মৃত্যুটা সামনে থেকে দেখার পর আমার এখন মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে আমার কাছে বোধহয় মৃত্যু বেপারটা আরো বেশি স্বাভাবিক বলে মনে হবে বা হচ্ছেও।দৈনন্দিন কাজকর্মের মতো অতি স্বাভাবিক ঘটনা।কারো মৃত্যুর খবরে চোখে জল আসা দূরে থাক,দীর্ঘশ্বাসও পড়বে না ভবিষ্যতে।