ফুফুর বাড়ির স্মৃতি

Words
765
Reading
4 min
Listen
Play
5y

আমার বাবা-চাচারা ছিলেন চারবোন,দুইভাই।বড় আপার জন্মের পর আমার দাদা ইন্তেকাল করেন।আমার চাচা তার পরিবার নিয়ে ঢাকা থাকেন।আমরা বাড়িতে থাকতাম।দাদু আমাদের সাথে থাকতেন,আমি যখন ছোট ছিলাম তখনি আমার দাদু মারা যান।আমার আব্বা সৌদি আরবে থাকতেন।আর আম্মা আমাদের চার ভাইবোনকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন।আম্মা একা থাকায় আমাদের ফুফুর বাড়িতে একদমই যাওয়া আসা ছিলোনা।ফুফুরা মাঝেমধ্যে আসতেন তাও দুইবছরে হয়তো একবার।

আমার ছিলেন চারফুফু।আমার দাদা আমার বড় ফুফুকে বিয়ে দিয়েছিলেন নেত্রকোনা।আমাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ।কিশোরগঞ্জ থেকে নেত্রকোনা অনেক দূর।আমার বড় ফুফুর দুইমেয়ে,তাদের জন্মের পর ফুফু নাকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং আমাদের বাড়িতে ফুফু মারা যান।দিনাজপুর অনেক দূর হওয়ায় আমাদের কবরস্থানে ফুফুকে কবর দেওয়া হয়।আমার ফুফু মারা যাবার পর ফুফা আবার বিয়ে করেন,তাঁর আরও তিনটা ছেলে হয়।কিন্তু আমার বড়ফুফা বছরে দুইতিনবার আমাদের বাড়িতে আসতেন,ফুফুর কবর দেখার জন্য।আমার ফুফা যখন ফুফুর কবর দেখতে আমাদের বাড়িতে আসতেন তখন ফুফা খাওয়া আর নামাজের সময় ব্যাতিত বাকি সময় ফুফুর কবরের পাশে বসে থাকতেন।আমাদের এলাকায় কথিত আছে,তিনি আমার ফুফুর সাথে কথা বলতেন,তিনি ছিলেন মাওলানা।

বাকী তিনফুফুর বিয়ে হয়েছে আমাদের উপজেলার ভিতরেই।আমার যখন সাত-আট বছর বয়স তখন থেকেই আমি একা একা চলে যেতাম আমাদের ফুফুদের বাড়িতে।আর আমার ডানপিটে স্বভাব, তাই আম্মা কখনও নিষেধ করতেন না।যদি বলতাম ফুফুদের বাড়িতে যাবো,আম্মা তখন বিভিন্ন ফল দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন।যেহেতু আমাদের জন্মের অনেক পূর্বেই আমাদের বড়ফুফু মারা যান,তাই আমরা দ্বিতীয় ফুফুকে বড় ফুফু বলতাম।

একবার আমি বড়ফুফুর বাড়ি গেলাম,বড়ফুফুর দুই মেয়ে, তিনছেলে।দুই ছেলে আর একমেয়ে আমার থেকে অনেক বড়।আর এক মেয়ে আমার চার-পাঁচ বছরের বড় হলেও সে আমার বন্ধু, আরেকছেলে আমার থেকে ছয়মাসের ছোট সেও আমার বন্ধু।ফুফুর মেয়ে মণি খুব দুষ্ট প্রকৃতির,সে তখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে।ও আমাকে বলল, "কাল তোমাকে নিয়ে মেলায় যাবো,তুমি আম্মাকে বলবে,আমি তোমার সাথে তোমার মামাতোবোনের শ্বশুর বাড়ি যাবো"।আমি প্রথমে মিথ্যা বলতে রাজি হয়নি,কিন্তু ও এমনভাবে ধরলো যে রাজি হয়ে গেলাম পরবর্তীতে।

পরে সকালে ফুফুকে বলে আমি আর মণি আপা মেলায় যাচ্ছি।রাস্তায় ও হঠাৎ রিক্সাওয়ালাকে বলে থামান থামান।রিক্সা থামার সাথে সাথে ও রিক্সা থেকে নেমে দৌড়ে রাস্তা থেকেও নেমে একটু ভিতরে চলে গেলো,আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না,বসে থাকলাম চুপ করে।একটুপর আসে বললো,সাইকেল দিয়ে নাকি ওর চাচাতো ভাই এইদিকে আসছিলো তাই ও দৌড়ে লুকিয়ে গেলো।ও চুলের ব্র্যান্ড,লিপস্টিক,নেইলপালিশ অনেক কিছু কিনলো।আমি কিছু কিনলাম না।আমার ভয় পরে ফুফু যদি দেখে নেয়,তখন কি বলবো।

দুপুর তিনটার দিকে আমরা বাড়ি আসলাম।বাড়িতে ঢুকার আগেই ওর চাচাতো বোনের সাথে দেখা,আমার সমবয়সী।ও বলে,তোমরা কোথায় গিয়েছিলে,আজকে বাড়িতে যাও বুঝতে পারবে কতো ধানে কতো চাল।আমাদের বুঝতে বাকি নেই ওর চাচাতো ভাই বাড়িতে এসে বলে দিয়েছে।আমি মণি আপাকে বললাম,আমি আর ফুফুর সামনে যাব না।আমি এখনি বাড়িতে চলে যাবো।তখনি ফুফু সামনে এসে হাজির।গোসল করে খেতে আস পরে এসব কথা,আমার দিকে তাকিয়ে এই বলে ফুফু চলে গেলেন।গোসল করে,খাওয়া দাওয়া শেষেও ফুফু কিছু বলেনা,আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।শেষে ফুফু পান খাচ্ছে, সেখানে গিয়ে বসলাম।আমাকে দেখে ফুফু বলে,মন খারাপ?আমি জানি তুমি আমার ভাইয়ের রক্ত, খারাপ কিছু করবে না,মণি তোমাকে মিথ্যে বলতে বলেছে তাই তুমি বলেছো।ওকে আমি মানুষ করতে পারছি না।তবে ভবিষ্যতে কারো কথাই মিথ্যে বলবে না,সে যাই হোক।পরের দিন সকালে আমি বাড়ি চলে আসি,খুব খারাপ লেগেছিলো কয়েকদিন,শুধু ফুফুর কথাগুলো মনে পড়ছিল।

এর কিছুদিন পর আমি মেঝু ফুফুর বাড়িতে গেলাম।ওখানে গিয়ে দেখি সেখানেও মণি আপা,ও খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে।আমার মেঝু ফুফুর ছেলে মোখলেস ভাইও নবম শ্রেণিতে পড়ে।সারাদিন আমরা তিনজন একসাথে সাইকেল চালিয়েছি,মাছ ধরেছি।বিকালে "হান্ড্রেড" খেলেছি।এটা একধরনের খেলা ৬০,৭০,৮০,৯০,১০০ কার্ড দিয়ে খেলতে হয়।মোখলেস ভাই বললো সন্ধ্যার পর বই পড়ে আবার খেলবো।রাত নয়টার দিকে ফুফু আমাদের খাওয়া দাওয়া করিয়ে বিছানা বিছিয়ে ঘুমাতে দিলেন,ফুফুও ঘুমিয়ে গেলেন।মোখলেস ভাই পড়ালেখা করছে টেবিলে বসে।

ফুফু ঘুমানোর সাথে সাথে ও বলে তোমরা চলে এসো আমরা খেলবো এখন।খেলা শুরু হলো,খেলতে খেলতে কখন রাতের তিনটা বেজে গেছে আমরা বুঝতেও পারিনি।হঠাৎ ফুফুর গরম লেগেছে হাতপাখা খুঁজছে,মোখলেস ভাই ভয়ে ফুঁ দিয়ে কেরোসিনের কুপিবাতি বন্ধ করে দিলো।গ্রামের বাড়ির পাকা দালান ঘর দিনের বেলায় দরজা-জানালা বন্ধ করে কিছুই দেখা যায় না,আর এটাতো রাত।কালো মিসমিসে অন্ধকার।মণি গিয়ে খাটের নিচে লুকিয়েছে,মোখলেস ভাই অন্ধকারে বুঝতে পারেনি খাটের নিচ ভেবে মুরগীর খাঁচার ভিতর ঢুকে পড়লো।মুরগীতো ভয়ে খকখকানি চিৎকার শুরু করলো।

ফুফু ভাবলো যে মুরগীর খাঁচার ভিতর হয়তোবা বিড়াল ঢুকেছে তাই তাড়াতাড়ি উঠে বাতি জ্বালাচ্ছে,আমি এই ফাঁকে চুপিচুপি বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান ধরে পড়ে রইলাম।ফুফু আলো জ্বালিয়ে দেখে বিছানায় কার্ড পড়ে আছে,আর ওরা লুকিয়ে আছে খাটের নিচে আর মুরগীর খাঁচার ভিতর।ওরা যে ঘুম রেখে কেরোসিন তেল পুড়িয়ে কার্ড খেলছিলো,তা ফুফুর বুঝতে বাকি রইলো না।এদিকে ফুফু দেখে আমি ঘুমিয়ে আছি।এবার ফুফু ওদেরকে বকা দিচ্ছে, "আয় তোরা দেখ, সম্মানি মানুষের বাচ্চা, মানুষের মতো ঘুমায় আর তোরা এখানে এতো রাতে আকাম করিস,ও তোদের সাথে বিকেলে খেলেছে,তাই বলে মাঝরাতেও কি খেলতে বসবে!।"

মণি আর মোখলেস ভাই হা করে তাকিয়ে আছে।কিছু বলেনা আমাকে দেখে,মোখলেস ভাই শুইতে যাওয়ার সময় আমার পায়ে জোরে একটা চিমটি খেটে গেলো।পরেরদিন দিন সকালে মোখলেস ভাই কাঁঠাল পাড়ছে একা একা, আমি গেলাম।মোখলেস ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে তারপর বলে,তোর মাথার খুলি খোলে আমি তোর বুদ্ধি দেখতে চাই।

আমি অন্ধকারে হাঁটতে পারি,কারণ আমি বাড়িতে প্রায়ই চোখ বন্ধ করে হাঁটতাম,অবশ্য এটাও আমার একটা খেলা ছিলো।

সমাপ্ত

Screenshot_2021_0619_212752.png