আমার মা

Words
672
Reading
3 min
Listen
Play
4y

IMG_20210708_172704.jpg

মাকে নিয়ে কিছু বলতে বললে সবাই একি ধরনের কথা বলে।আমার মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা,আমি আমার মাকে খুব ভালোবাসি কিংবা আমার প্রিয় ব্যক্তি আমার মা।কথাগুলো চিরন্তন সত্য,কারণ সবার মা সবার কাছে এমন ই হয়।কিন্তু আমি বলবো আমার মা এক মহীয়সী নারী।আমি এক ভাগ্যবান সন্তান যে আমার মায়ের গর্ভে আমার জন্ম।

কিশোরগঞ্জ জেলার ছোট্ট এক গ্রামের স্বচ্ছল এক পরিবারে আমার মায়ের জন্ম।আম্মারা দুইবোন, দুইভাই।আম্মা দুই ভাই এর পর তিন নম্বর সন্তান।
আমার মায়ের বয়স যখন তিন বছর তখন আমার নানা মারা যান,এরপর আম্মার বড়চাচা যিনি চিরকুমার তার দায়িত্বে আম্মারা চার ভাইবোন বড় হয়ে ওঠেন।আম্মার বড় চাচা যাকে আমরা রাজ্জাক নানা বলে ডাকি তিনি ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।তাই পড়ালেখার প্রতি ওনি খুব যত্নশীল ছিলেন।কিন্তু মামাদের গ্রামে কোনো উচ্চবিদ্যালয় নেই।তাই আমার আম্মা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছিলেন।উচ্চ বিদ্যালয় অনেক দূর হওয়াই ষষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হওয়া হয়নি।আরবি থেকে আবার "কারিয়ানা" পাশ করেছেন।এরপর আম্মাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র দেখা শুরু হয়ে যায়।

আমাদের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়।আমার দাদাছিলেন মাওলানা।আমার দাদারা ছিলেন উচ্চমধ্যবিত্ত।আমার বাবা ছিলেন লম্বা,উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ সুদর্শন পুরুষ।আম্মাকে যখন আমাদের বাড়ি থেকে দেখতে গেলো,পায়জামা পাঞ্জাবি পড়ে সবাই এমনভাবে গেলো যে, রাজ্জাক নানা ওদের দেখেই বিয়ে দেওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেলেন।খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না।কিন্তু বড়মামা খোঁজ নিয়ে দেখলেন সব ঠিক আছে,কিন্তু জামাই কোনো কাজ করে না।তাই মামা এই বিয়েতে রাজি না।তিনি তার বোনকে বেকার কোনো ছেলের হাতে দিবেন না।আর রাজ্জাক নানার ভাষ্য এমন পরিবারে মেয়ে না দিলে কোন পরিবারে দিবো?মামা নাছোরবান্দা বিয়ে দিবে না।

রাজ্জাক নানা কান্নাকাটি শুরু করলো,যে ছেলে এখন বুঝিয়ে দিচ্ছে আমি তার চাচা।আমার নিজের মেয়ে হলে কি এমন করতে পারতো।এসব কথা শুনে বড়মামা রাজি হয়ে গেলো।আম্মা-আব্বার বিয়ে হয়ে গেলো।বিয়ের পর আব্বা তেমন কাজ না করলেও ভালোই দিন কাটছিলো।বছর ঘুরতেই বড় দিদির জন্ম হলো।বড় দিদির জন্মের তিনমাস পর আমার দাদা মারা গেলেন।আমার দাদা মারা যাবার পর শুরু হলো দুর্গতি।আমার চাচা তখন "টাইটেল" পাশ মাওলানা।কিন্তু তিনি চাকরি করবেন না বলে, ঠিক করলেন যে, বিদেশ যাবেন।মাত্র পনের হাজার টাকা বিঘা দামে জমি বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার জন্য টাকা জমা দিলেন।আব্বাকে বুঝালেন বিদেশ গিয়ে এসব জমি আবার ফেরত নিয়ে আসবেন।আব্বা ছোট ভাই এর কথায় রাজি হয়ে নিজের ভাগের জমিও দিয়ে দিলেন।এভাবে চাচা তিনবার দালাল কে টাকা দিলেন কিন্তু বিদেশ আর যেতে পারলেন না।তারজন্য বাড়িতে যে বড় ঘর ছিলো তা পর্যন্ত বিক্রি করে ছিলেন আমার চাচা।এরপর তিনি ঢাকা চলে গেলেন।

আম্মা একচালা একটা ঘর বানিয়ে এই বাড়িতে থাকতে লাগলেন।আমার বাবা দর্জির কাজ জানতো।তাই বড়মামা বাজারে দোকান ভাড়া নিয়ে মেশিন কিনে বাজারে কাপড়ের ব্যবসার ব্যবস্থা করে দিলেন।কিন্তু আব্বা ঠিকমতো ব্যবসা করেন না।দোকান একদিন খোলেন আর তিনদিন বন্ধ রাখেন।এই অবস্থা যে দোকানের ভাড়াই দিতে পারেন না,সংসার চালানো অনেক পরের বিষয়।রাজ্জাক নানা এসব দেখে আম্মাকে বাড়িতে নিয়ে আসলো।তিনি বলতে লাগলেন," আমি বিয়ে দিয়েছিলাম এখন ভালো হয়নি।আমি এখান থেকে এনে আবার ভালো বিয়ে দিবো,প্রয়োজনে আমার সব জমি আমি দিয়ে দিবো।"কিন্তু আম্মা তার মেয়েকে রেখে আসবে না,নানা বলেন, ঠিক আছে মেয়েকে নিয়ে চলে আস,তাতেও আম্মা রাজি না।আম্মার বিয়ে হয়ে গেলে ওনার মেয়েকে অনাদরে বড় হতে হবে।তাই নানা বাড়ি থেকে বড় আপাকে নিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গেলো।সেখান থেকে শুরু হলো আম্মার একা পথ চলার লড়াই।

আব্বা চাকরি করার জন্য ঢাকা চলে গেলেন।আম্মা বড় দিদিকে নিয়ে এই বাড়িতে একা।একাচালা একটা ঘর ছাড়া কিছুই নেই।আম্মা সেইখানে থেকে ছোট বাচ্চাদের পড়ানো শুরু করলো।ছাগল,হাঁস,মুরগি পোষা শুরু করলো।আমার আরও দুইবোন জন্ম হলো।আম্মার এখন তিন মেয়ে।আম্মা একটা বড় ঘর বানিয়েছে,টিউবওয়েল দিয়েছে।বড় দিদিকে তখন স্কুলে ভর্তি করেছে।আম্মার স্বপ্ন তখন তিন মেয়েকে ঘিরে।তিন মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করতে হবে,করতে হবে প্রতিষ্ঠিত।নিজের যত কষ্টই হউক মেয়েদের পড়ালেখায় কোনো আঁচ লাগতে দেইনি।

আমার ছোট বোনের বয়স যখন দশ বছর তখন আমার জন্ম হয়।আমার মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তান।আমাকে নিয়ে আমার মায়ের তখন নতুন স্বপ্ন, আমাকে ডাক্তার বানাবেন।আমার তিনবোন আজ উচ্চশিক্ষিত।তাদের স্বামীরা উচ্চশিক্ষিত,প্রতিষ্ঠিত।আমার বোনেরা আজ স্বাবলম্বী।আমি মেডিকেল তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।আমার মা আজও আমাদের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।আমাদের যেকোনো সমস্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তার সমাধান বের করেন।আমার বাবা ভালো মানুষ ছিলেন কিন্তু দায়িত্ববান নয়,কখনও সংসার সন্তানের দায়িত্ব বহন করেননি।দুইহাজার বিশ সালে আমার বাবা মারা যান।মা এখন বেশিরভাগ সময় বাড়িতে একা থাকেন।আম্মা নিজের এই সংগ্রামী জীবনের মাঝে আবার এলাকার বাচ্চাদের বিনা বেতনে কোরআন শিক্ষা দেন।এলাকার মানুষ আম্মাকে সম্মান করে,এলাকার মানুষের কাছে আম্মা এক আদর্শের উদাহরণ।আম্মার জন্যই আমরা পেয়েছি সম্মানিত জীবন।সব মা তার সন্তানদের ভালোবাসে।কিন্তু আমার মা ব্যতিক্রম বিধাতার অনন্য সৃষ্টি এক মহীয়সী নারী।