আমি মালয়েশিয়া প্রবাসী।ছয়-সাত বছর যাবৎ এখানে আছি।প্রথমে পড়ালেখার জন্য এসেছিলাম,পরবর্তীতে অর্থের কারণে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি।তখন ভাবলাম পড়ালেখা চালিয়ে যেতে যে অর্থ বাড়ি থেকে নিয়ে আসা লাগবে,যদি ব্যবসা করতে পারি তাহলে সেই অর্থ বা তার চেয়ে বেশি অর্থ বাড়িতে পাঠাতে পারবো।এইভেবে বাড়ি থেকে পাওয়া কিছু পুঁজি নিয়ে রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করলাম।প্রথমে একটি দিয়ে শুরু করি,তারপর দুইটি রেস্তোরাঁ।দিনকাল মোটামুটি ভালোই যাচ্ছিলো।
হঠাৎ একদিন শুনলাম চীনে এক নতুন রোগ দেখা দিয়েছে।বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই রোগের লক্ষণ,সতর্কীকরণ নিয়ে লিখালিখি হচ্ছে।চীনে এই রোগের ভয়াবহতা দিনদিন বাড়তে লাগলো।মানুষের দুর্দশা দেখে আঁতকে উঠতে লাগলাম।রোগটির নাম চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো,যে শব্দটা আগে কেউ শুনেনি বা পরিচিত ছিলো না,হঠাৎ সেটিই সবচেয়ে পরিচিত শব্দ হয়ে উঠলো।চারপাশে শুধু 'করোনা' 'করোনা' বলে আহাজারি।করোনা যেহেতু ছোঁয়াছে রোগ,এর জীবাণু বাতাসে ভেসে বেড়ায় তাই এটি থেকে বাঁচতে হলে মাস্ক বা মুখোশ পড়া বাধ্যতামূলক।
মালয়েশিয়াতে রোগটি তখনও আসেনি।তাও অনেকটা শখেরবশে কালো কালারের দুইটা মাস্ক কিনলাম।প্রতিদিন সকালেই মাস্ক পড়ে বের হতাম,যদিও তখন মাস্ক পড়তে হবে এইরকম কোনো নিয়ম চালু করা হয়নি,বা বাধ্যবাধকতা ছিলো না।মাস্ক তখন যেনো একটু ভালো লাগতো,নিজেকে একটু আলাদা আলাদা লাগতো।
এরইমধ্যে আরেকদির হঠাৎ শুনি মালয়েশিয়াতেও রোগটি চলে এসেছে।সরকার থেকে কড়া নির্দেশনা আসলো,বাহিরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পড়তে হবে,হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে।নির্দেশনা আসার সাথে সাথেই ওয়ানটাইম ইউজেবল মাস্কের দাম বেড়ে গেলো।তখনি বিরক্ত লাগতে শুরু করলো।ওয়ানটাইম মাস্কের দাম বেড়ে যাওয়াতে স্থায়ীভাবে পড়ে যাওয়া যায় এমন একটা মাস্ক কিনলাম।প্রতিদিন সেটা পড়েই যাওয়া শুরু করলাম।তিন-চার দিন পরই লকডাউন ঘোষণা করা হলো।চৌদ্দদিনেন লকডাউন।ঘরেই থাকতে হবে বের হওয়া যাবে না।
তারপর প্রায় দুইমাস একাধারে লকডাউন চললো।তখন তেমন বের হয়নি, বের হওয়র সুযোগও ছিলো না।তাও দুই-একদিন বের হয়েছি,অনেক প্রস্তুতি নিয়ে।মুখে মাস্ক,হাতে গ্লাভস,লিফটের বাটনে চাপ দেওয়ার জন্য ছোটো কাঠি,হ্যান্ড স্যানিটাইজার ইত্যাদি ইত্যাদি।মনে হচ্ছিল যুদ্ধে যাচ্ছি।
লকডাউনের মধ্যে বাসায় বসে বসে গেঞ্জির কাপড় কেটে তিনটা মাস্ক বানালাম।লকডাউনের পর এই তিনটা মাস্ক উল্টে পাল্টে পড়তে লাগলাম।তখন মাস্ক পড়তাম কখনোও নাকের নিচে,কখনও তুতনির নিচে,কখনওবা মাথার উপর চশমার মতো।তিনমাস এভাবেই চললো।
তারপর আবার মালয়েশিয়ায় করোনা রোগী বাড়তে লাগলো।মাস্ক ব্যবহারের সঠিক নিয়মের নির্দেশনা আসলো।নাকের উপর থেকে তুতনির নিচ পর্যন্ত শুদ্ধভাবে মাস্ক পড়তে হবে।অন্যথায় ৩০০ রিঙ্গিত অর্থাৎ ৬০০০ টাকা জরিমানা।
তখন শুদ্ধভাবে মাস্ক পড়তে শুরু করলাম।
তারপর আবার লকডাউন আসলো,প্রায় দেড় মাস পর ছাড়লো।এবার লকডাউন ছাড়ার পর সরকার থেকে কড়া নির্দেশনা আসলো,কাপড়ের মাস্ক পড়া যাবে না,ওয়ানটাইম মাস্ক পড়তে হবে,একবার ব্যবহারের পর ফেলে দিতে হবে।বাধ্য হয়ে ৫০ রিঙ্গিত অর্থাৎ এক হাজার টাকা দিয়ে ৫০ টা ওয়ানটাইম মাস্ক কিনলাম।এরপর ধীরে ধীরে মাস্কের দাম কমতে লাগলো।
এখন অবশ্য ৫০ টি মাস্ক একশো টাকা দিয়ে কিনা যায়।তবে মাস্ক হচ্ছে এখন মৌলিক চাহিদার প্রথম স্তর।তারপর খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান ইত্যাদি।একদিন না খেয়ে থাকাই যায়,কিন্তু মাস্ক ছাড়া ফ্লাটের মেইন গেইট খুলে বের হওয়া অসম্ভব বেপার।সবাই আপনাকে বর্জন করবে।শুধু তাই না,মাস্ক ছাড়া আপনাকে দেখা গেলেই ১০০০ রিঙ্গিত অর্থাৎ বিশ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে বিনা শর্তে।তাই এখন দুইমিনিট পায়চারি করার জন্য নিচে গেলেও শুদ্ধভাবে মাস্ক পড়ে যেতে হয়।
(এখানে "আমি" বলতে আমার বোন,যে মালয়েশিয়ার প্রবাসী,লিখাটি তার জবানিতে লিখলাম)