পাখির স্বতন্ত্র স্বভাব হচ্ছে স্বাধীনভাবে আকাশে উড়ে বেড়ানো।পাখি মুক্ত,স্বাধীন।যেহেতু তার ডানা আছে,উড়তে পারে,আকাশে বা প্রকৃতিতে কোনো দেয়াল নেই বা বাঁধা নেই তাই যখন যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে।এই পাখি বিষয়ে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে,"খাঁচায় বন্দী পাখি ছাড়া পেলে বেশি উড়ে"।পাখিদের ক্ষেত্রে এটা কতটুকু সত্য জানি না।কোনো পাখির উপর এটা পরীক্ষা হয়েছিলো কিনা কে জানে।তবে মানুষের ক্ষেত্রে এটা একদম প্রযোজ্য।এই প্রবাদটার মানে হচ্ছে যে পাখি বনে বাঁদাড়ে ঘুরে বেড়ায়,সে এতো বেশি উড়ে না, মানে তার কাজ হচ্ছে খাদ্য সংগ্রহ করা,খাদ্য সংগ্রহের জন্য যতটুকু উড়া লাগে যেখানে যাওয়া লাগে যায়।কিন্তু যে পাখিকে কেউ বন্দী করে রেখেছে,হয়তো ছোট থেকে সে খাঁচায় বন্দী,মালিক তাকে খাঁচার ভিতরেই খাবার দেয়,সে সবসময় খাঁচার ভিতরেই থাকে।যদিও তার উড়ার ক্ষমতা রয়েছে কিন্তু উড়ার সুযোগ সে কোনোদিনও পায় নি।
খাঁচায় থেকে সে অন্য পাখিদের দেখে তারা কত সুন্দর উড়ে বেড়াচ্ছে।তারা কত স্বাধীন।খাঁচায় বন্দী পাখি তখন কল্পনা করে যদি কোনোদিন মুক্ত হতে পারি,সারাদিন শুধু উড়ে বেড়াবো,একদেশ থেকে আরেকদেশে যাবো।
এখন যদি একদিন সে উড়ার সুযোগ পায়,মালিকের অজান্তে বা ভুলে খাঁচা থেকে বের হতে পারে,তাহলে ঐদিন সে যত উড়বে তা স্বাভাবিকভাবে বন্য পাখি তাদের সারাজীবনেও উড়ে নি।এর কারণ এই উড়াটা খাঁচায় বন্দী পাখিটার স্বপ্ন ছিলো,কিন্তু যে পাখি জন্ম থেকেই মুক্ত,সবসময় উড়ে বেড়ায়,তার কাছে উড়াটা একটা স্বাভাবিক বিষয়, প্রতিদিন যেমন খাবার খাওয়া লাগে,উড়াটাও তেমন।
এই বিষয়টা মানুষের ক্ষেত্রেও একি।কেউ যদি বন্দী থাকে অনেকদিন,সে যদি মুক্তি পায় তাহলে তার ভাবখানা এমন হয় যে আজই সে পুরো পৃথিবীটা ভ্রমণ করে আসবে।আসলে বেপারটা এমন নয় যে সে মুক্তিতেই সব আনন্দ,আর বন্দী অবস্থায় সে খুব কষ্টে ছিলো।বেপার হচ্ছে,মানুষ আসলে সেটা চায়,যেটা তার আওতায় নেই,যেটা পাওয়া কষ্টসাধ্য,আর ঐ কষ্টসাধ্য বিষয়টা যদি সে অর্জন করতে পারে তাহলে সে সবচেয়ে খুশি হয়।
চাওয়া চাওয়ির হিসাব বাদ দিয়ে এই খাঁচায় বন্দী পাখির একটা উদাহরণ দেয়।আমার তিন বোনের পর আমার জন্ম হওয়াতে,আম্মা আর বোনদের কাছে আমি খুব মূল্যবান।বাবা মার কাছে সব সন্তানই মূল্যবান কিন্তু আমাদের সমাজে কারো একটানা তিনটা মেয়ে হওয়ার পর যদি ছেলে হয় তাহলে সেই ছেলেটা আরেকটু বেশিই গুরুত্ব বহন করে।যাইহোক এই কারণে আমার আম্মা আর বোনেরা আমাকে ছোট থেকে এক ধরনের বন্দী অবস্থায় লালনপালন করেন।গ্রামের ছেলেরা সাধারণ বুঝতে শিখার সাথে সাথেই অনেক বন্ধু হয়,বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা করে, কিন্তু আমার এমন করার সুযোগ হয়নি,কারণ আমাকে সবসময় বাড়ির ভিতরেই থাকতে হয়েছে।বিদ্যালয়েও আমাকে আমার বোনেরা নিয়ে যেতো আবার নিয়ে আসতো।
তারপর ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠার পর ঢাকা চলে আসার পরতো আরও বন্দী।মেজু বা ছোটো বাসা থেকে স্কুলে নিয়ে যেতো আবার স্কুল ছুটি হলে বাসায় নিয়ে আসতো।এভাবেই আমার পুরো স্কুল জীবন এবং কলেজ জীবনও এভাবেই কাটে।স্কুল থেকে বাসা,কলেজ-বাসা।একটা উদাহরণ দিলে বুঝা যাবে আমি কতটুকু বন্দী ছিলাম,ঢাকা শহরে আমরা স্বাভাবিকভাবে বাসে যাতায়াত করি।
একাদশ শ্রেণীর আগ পর্যন্ত সবসময় বাস কন্ডাক্টর যখন আমার কাছে ভাড়া চাইতে আসতো আমি বলতাম "সামনে দিয়ে দিবে,আমার বোন আছে।" আমি কখনওই একা কোথাও যাতায়াত করিনি।
তবে এটা যে বন্দীত্ব আমি কোনোদিন বুঝতে পারতাম না।কারণ আমি ঐ জীবনেই খুশি ছিলাম।আর ভাবতাম সব মানুষ বুঝি এমনই।তারপর মেডিকেলে ভর্তি হলাম।কিছুদিন পর করোনা আসলো।করোনার ছুটিতে বাড়িতে গেলাম।বাড়িতে কয়েকদিন থেকে নানুবাড়িতে গেলাম।অন্য সময় হয়তো তিন-চার দিন নানুবাড়িতে থাকার সুযোগ হতো।কিন্তু সেইবার চার মাস নানুবাড়িতে থাকার সুযোগ হলো।নানুবাড়িতে কেউ আমাকে কিছু বলতো না,মানে অভিভাবক ছাড়া অবস্থা আরকি।আর নানুবাড়ির যে এলাকা সেটা একটা "এন্টারটেইনমেন্ট এনভায়রনমেন্ট" এই ধরনের এলাকা।সব ছেলে দেখি,দিন নেই রাত নেই ঘুরে বেড়াচ্ছে,এখানে আড্ডা দিচ্ছে ঐখানে আড্ডা দিচ্ছে।নিজের মতো করে যা খুশি করছে।আমিও তাদের অনুসরণ করা শুরু করলাম।রাত বিরাতে অযথা ঘুরে বেড়াতাম।এই চার মাসে 'অপরাধ' বা দেশের আইনের পরিপন্থী হয় এমন কিছু করিনি, কিন্তু সমাজের চোখে "ঠিক না" এমন অনেক কিছু করেছি।আমি সারাজীবন ঘরকেই মানুষের জীবন বলে মনে করতাম,কিন্তু গ্রামের ছেলেদের সাথে এভাবে উগ্রভাবে,মুক্ত স্বাধীন ভাবে ঘুরে,যা খুশি করে দেখলাম ভালোই লাগে।অনেক খুশিতে ছিলাম।তবে কিছুদিনের মধ্যেই আম্মার কাছে বিচার গেলো।কারণ এতো শান্তশিষ্ট ছেলে,গ্রামের বখাটে ছেলেদের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে এটা আমার নানুবাড়ির মানুষের খারাপ লাগলো।
তখন এই প্রবাদটা খুব শুনেছি,"খাঁচায় বন্দী পাখি ছাড়া পাইয়া বহুত বাড় বাড়ছে,বেশি উড়তাছে।"
এসব কথা শুনে, অবশেষে আমি নানুবাড়ি থেকে চলে আসি।প্রথম প্রথম একটু খারাপ লাগে, এতো আনন্দ ছেড়ে চলে যাচ্ছি!কিন্তু পরবর্তীতে আবার সব ঠিক হয়ে যায়,আবার আমি ঘরকুনো বন্দীদশায় ফিরে আসি,আর এটাই আমার কাছে স্বাভাবিক জীবন যাপন।
তখন থেকে আমি এই প্রবাদটার সঠিক মানে বুঝতে পারি।সবসময় অভিভাবকের কড়া নজরদারিতে থাকতাম,আর সেখানে গিয়ে মুক্তি পেয়ে বেশি লাফালাফি শুরু করি,অথচ আমার মামাতো ভাইরা তারা সবসময়ই মুক্ত কিন্তু তারা তখন আমার মতো এতো লাফাতো না যদিও তাদেরও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিলো।