নিজের কষ্টার্জিত কোনো কিছু অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়া খুবি কঠিন একটি কাজ।স্বাভাবিকভাবে মানুষ এটি পারে না।কিন্তু যে এই কঠিন কাজটি করতে পারে থাকেই মহানুভব বলে।তারাই আসলে মহানায়ক।কোন একটা কিছু কেউ সহজে পেয়ে গেলো,তো ঐ জিনিসটা অন্য কারো সাথে ভাগাভাগি করে নিতে মনে তেমন প্রভাব পড়বে না।আবার একটা কিছু কয়েকজন মিলে অর্জন করলো,তার থেকেও অন্যকে দিতে কোনো রকম দ্বিধা কাজ করবে না।কিন্তু যদি এমন হয়,এমন একটা জিনিস যা শুধুমাত্র কেউ নিজে একা পরিশ্রম করে,কষ্ট করে অর্জন করলো তো সেই জিনিসে যদি কেউ ভাগ বসাতে আসে তাহলে সে সহ্য করতে পারবে না,তার মন বলবে,যখন এটা পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করেছি তখনতো কেউ সাহায্য করে নি,এখন কেনো আমার অর্জন অন্যের সাথে ভাগ করবো?কিন্তু যারা এ বেপারটা মেনে নিতে পারে তারাই মহানুভব।
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ বেপারটা লক্ষ্য করা যায়।কিছু ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা পড়ালেখায় অনেক ভালো,পরিশ্রম করে পড়ালেখা করে এবং নিজেই বিভিন্ন বই,গাইড থেকে মিলিয়ে সহজভাবে "নোটস" তৈরি করে,যা পরীক্ষার জন্য সহায়ক হয়।যা পরীক্ষার আগমুহূর্তে রিভিশন এর জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ।
তো সব শিক্ষার্থীতো আর পড়ালেখায় ভালো হয় না,যারা কম পড়াশোনা করে,"নোটস" তৈরিতো দূরে থাক,তারা বই এর পড়াই শেষ করে উঠতে পারে না।তখন তারা সহজ রাস্তা খুঁজে,পড়ালেখায় ভালো শিক্ষার্থীদের কাছে খোঁজ করে কোনো গোছানো পড়া আছে কিনা,মানে কোনো "নোটস" আছে কিনা।এখন সেইসব পড়ালেখায় ভালো শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু আছে এমন যারা ঐ উপরে বলা প্রথম শ্রেণীর মানুষের মতো যারা ভাবে, আমি কষ্ট করে পড়ালেখা করে নোটস তৈরি করেছি,এটা আমি অন্যকে কেনো দিবো!তারা বিনা পরিশ্রমে সহজেই পাশ করে যাবে!তারাও কষ্ট করে তৈরি করে নিক।আবার কিছু শিক্ষার্থী আছে যাদের কাছে সেই গোছানো পড়াগুলো চাওয়ার সাথে সাথেই দিয়ে দেয়।তারা অন্যকে সাহায্য করতে পেরে আনন্দিত হয়।
আসলে সব জায়গায়ই সাহায্য করার দিক দিয়ে এই দুই ধরনের মানুষ বিদ্যমান।এক ধরনের মানুষ অন্যকে সাহায্য করে আনন্দ পায়,নিজেকে ধন্য মনে করে আবার আরেক ধরনের মানুষ অন্যকে কিছুতেই সাহায্য করবে না।যদিওবা বাধ্য হয়ে সাহায্য করে তখন ভাবে,আহ্ আমার সময়টা বৃথা নষ্ট হলো।
তখন গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়ি।সরকারি বিদ্যালয় হলেও আমাদের সেই বিদ্যালয়টা উপজেলার মধ্যে নাম করা।ভর্তির সময় আমার রোল নাম্বার হলো ৪২।আমার বোনেরা আর আম্মা আমাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পূর্বেই প্রথম শ্রেণীর পড়া পড়িয়ে ফেলেছিলেন,তাই তাদের দাবি ছিলো যাতে সব পরীক্ষায় আমি প্রথম হয়।তাদের দাবি অনুযায়ী প্রথমও হচ্ছিলাম।আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বছরে তিনটা পরীক্ষা হতো।প্রথম সাময়িক,দ্বিতীয় সাময়িক আর বার্ষিক।তো আমি প্রথম আর দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় প্রথম হয়।এখনকার বাচ্চাদের মতো প্রথম শ্রেণীতে এতো বিষয় ছিলো না।মাত্র তিনটা বিষয় ছিলো।বাংলা,ইংরেজি,গণিত,প্রতি বিষয়ে একশো নাম্বারের পরীক্ষা,মোট তিনশো নাম্বারের পরীক্ষাতে তিনশোই পেতাম।
যাইহোক,মূল ঘটনা বার্ষিক পরীক্ষার।প্রথমদিন বাংলা পরীক্ষা ছিলো।পুরো বই আমার মূখস্ত।যাবো আর সব লিখে দিয়ে আসবো।আমাকে যদি বলা হয়,পুরো বাংলা বই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লিখে দিয়ে আসতে তবুও লিখে দিয়ে আসতে পারবো,প্রশ্নপত্রের দরকার নেই।কারণ আমার যখন তিন বছর বয়স তখন থেকে এই বই আমাকে পড়ানো শুরু হয়,কিন্তু বয়সে হয় না বলে বিদ্যালয়ে ভর্তি নেইনি,তাই প্রায় তিনবছর ঐ একি বই পড়তে হয়।
পরীক্ষা শুরু হলো। লিখা শুরু করলাম।আমার পিছনে বসেছে আমাদের পাশের বাড়ির একটা ছেলে।নাম স্বপন।তার রোল নাম্বার ৪৩।সে আমার সাথে ভর্তি হলেও,আমার থেকে অন্তত চার-পাঁচ বছরের বড়।অভাবের সংসার তাই এতোদিন ভর্তি হতে পারেনি।যখন প্রথম শ্রেণীতে পড়ি,তখন আমি বয়সে যেমন ছোট,আকার-আকৃতিতেও ছোট।আবার খুবি নরম প্রকৃতির।তাই আম্মা স্বপনকে বলে দিয়েছিলো আমাকে একটু দেখে রাখতে।ছোট সময়তো বাচ্চারা মারামারি করে,তো
বিদ্যালয়ে যাতে কেউ আমাকে না মারে।তো স্বপন আমাকে সবসময় দেখেশুনে রাখতো।ও যেহেতু বয়সে অনেক বড় সবাই ওকে ভয় পেতো।আর যারজন্য আমার সাথে কেউ ঝগড়া লাগতে আসতো না।এসব কারণে স্বপন আমার উপকারী বন্ধু।
প্রথম এবং দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় আমি তাকে আমার সম্পূর্ণ খাতা দেখতে দিয়েছি,তারপরও এতো গুরুত্ব দিয়ে সব লিখেনি,তাই আমি প্রথম হলেও সে ভালো করতে পারেনি।
এখন মূল ঘটনাটা বলি,তো বাংলা পরীক্ষায় প্রথম থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত সে আমার খাতা সম্পূর্ণটা নকল করলো।কিন্তু একটা প্রশ্ন আশপাশে কেউ পারছিলো না,বাংলাদেশের জাতীয় পশু কি?আবার অনেকে পারলেও রয়েল বেঙ্গল টাইগার বানানটা লিখতে পারছিলো না।আমিতো জানি,এটা আমি পরীক্ষায় আসার আগেও লিখে এসেছি।কিন্তু এমন সময় আমার মাথায় দূষ্টু বুদ্ধি খেললো,আমি মনে মনে ভাবলাম,"এই বেটা স্বপন আমার কাছ থেকে সব দেখে লিখলো,কিন্তু এটা আমি দেখাবো না।"এই ভাবনাতে আমি কি করলাম,এই প্রশ্নের উত্তরটা না লিখে স্বপনকে বললাম,পরে লিখবো।আগে অন্যগুলো লিখি।কিন্তু আমার মনে মনে ছিলো,শেষে একা একা লিখে ফেলবো,এটা স্বপনকে দেখাবো না।
কিন্তু ঘটনা ঘটলো উল্টো।স্বপনের সাথে এই লুকোচুরি করতে গিয়ে আমার সময় নষ্ট হয়,যখন ঘন্টা বাজলো তখন আমার একটা প্রশ্ন বাকি ছিলো ঐটা তাড়াহুড়ো করে লিখি।পরীক্ষা শেষ, ম্যাম যখন খাতা নিতে আমার কাছে আসলো তখন আমার মনে পড়লো,আরে আমিতো রয়েল বেঙ্গল টাইগার এই উত্তরটা লিখিনি।কিন্তু তখন মনে পড়লে কি হবে,ততক্ষণে ম্যাম খাতা নিয়ে চলে গেলো।
পরীক্ষার ফলাফল যেদিন দিবে,আমিতো জানি আমি ঐ প্রশ্নের উত্তর লিখিনি।কিন্তু বোনদের এটা বলিনি।আমার মেজু বোন আমাকে নিয়ে বিদ্যালয়ে গেলো,সে তো নিশ্চিত আমিই প্রথম হবো।কিন্তু যখন, প্রথম হয়েছে যে তার নাম ঘোষণা করলো দেখা গেলো আমি হইনি,দ্বিতীয় ও না,তৃতীয় হয়েছে স্বপন, চতুর্থও না,পঞ্চম হয়েছি আমি।আমার বোনতো কেঁদে দিবে এমন অবস্থা,পঞ্চম হবো এটা কিছুতেই সে মেনে নিতে পারছে না।
আমার কাছ থেকে সব দেখে লেখার পরও স্বপন তৃতীয় হয়েছিলো,কারণ সে ঐ প্রশ্নের উত্তর যা আমি পরে লিখবো বলে রেখে দিয়েছিলাম ওটা সে অন্য আরেকজনের কাছ থেকে শুনে লিখে নেয়।তার হাতের লিখাও খুব সুন্দর ছিলো।আর পরবর্তী ইংরেজি আর গণিত পরীক্ষায় আমি প্রথম দিন থেকে শিক্ষা নিয়ে আর এমন করিনি,স্বপনকে সবই দেখিয়েছি,কিছুই বাদ রাখিনি লিখার।কিন্তু আমি বাংলাতে ৯৮ পাই, ঐ প্রশ্নের জন্য এক কাটা গেলো, আরেক কাটা যায় শেষের প্রশ্নটা তাড়াহুড়ো করে লিখাতে,কিন্তু স্বপন ১০০ই পায়।২৯৮ পেয়ে আমি পঞ্চম,আর ২৯৯ পেয়ে একজন চতুর্থ,আর ৩০০ পেয়ে তিনজন প্রথম হয় তার মধ্যে স্বপন একজন,পরবর্তীতে তাকে তৃতীয় ধরে হিসাব করা হয়।
ঐদিনের পর থেকে আমার এই ধারণা হয় যে স্বপনের সাথে হিংসা করে, সে বিনা পরিশ্রমে আমার সমান নাম্বার পাবে এটা মেনে নিতে না পেরে তার সাথে যে লুকোচুরি করি,যে কার্পণ্যতা করি তা আমার নিজেরই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।ঐদিনের পর থেকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে কার্পণ্যতা আমি সম্পূর্ণ ছেড়ে দেয়।আমার কাছ থেকে সাহায্য পেয়ে বিনা পরিশ্রমে যদি কেউ বড় কিছু অর্জন করে ফেলে এবং এতে যদি আমার কোনো ক্ষতি না হয়,তাতে আমাদের কার্পণ্যতা করা উচিত নয়,যা আমার আছে তা নির্দ্বিধায় বিলিয়ে দেওয়া উচিত।