"শুকনো বরই এর স্মৃতি"

Words
515
Reading
3 min
Listen
Play
4y

বাল্যকাল সবার কাছেই অনন্য। আমার কাছেও এর ব্যতিক্রম নয়।ছোট বেলার কত যে মধুর স্মৃতি তা কি লিখে শেষ করা যায়।যাইহোক কতশত স্মৃতির ভীড়ে বরই নিয়ে কিছু কথা আমাকে মাঝে মধ্যে হাসিয়ে যায়।বরইকে অনেকে কুল বলে চিনে।আমাদের এলাকায় সবাই এটাকে বরই বলে।ছোট বেলায় আমাদের নিজেদের বরই গাছ ছিলো তিনটা। আমাদের এক চাচাতো দাদু তাদের দুইটা,আমাদের মামা বাড়িতে ও ছিলো দুইটা।

এতো বিস্তারিত বলার কারণ বরই যে আমাদের কাছে কতটা সহজলভ্য ছিলো সেটাই বুঝানোর চেষ্টা। আবার এ সবগুলো গাছ আমাদের জন্য উন্মুক্ত। সব বরই পেরে নিয়ে নিলেও কোনো সমস্যা নেই।আবার সব গাছেই এতো বরই হতো গাছের গুঁড়া ধরে ঝাঁকি দিলে ঝরঝর করে বরই মাটিতে পরতো।আমাদের তিনটা গাছের মধ্যে দুইটা গাছের বরই টক ছিলো আর একটা মিষ্টি। আমি টক বরই পছন্দ করি। মিষ্টি বরই গাছের কাছেও আমি যেতাম না।টক বরই গাছ থেকে বস্তা ভরে পারতাম। বরই ধুয়ে বড় হামান দিস্তাতে দিয়ে সাথে ধনিয়া পাতা, কাঁচা মরিচ,তেতুলদিয়ে হাত ঢেকিঁ দিয়ে পিসে ভর্তা বানিয়ে কলা পাতায় ঢেলেসবাই মিলে খেতাম।মাঝে মাঝে 'কাঁঠালের মজি'ও যোগ করতাম।

আমরা বরই খাওয়ার পর যা থাকতো আম্মা ঐগুলো রোদে শুকাতে দিতো।সমস্যা এখানেই শুরু। বরই গাছ থেকে সব বরই খেয়ে নিলেও কোনো সমস্যা নেই। তবে রোদে দেওয়া বরই এর জন্য একশত চুয়াল্লিশ ধারা জারি করা।সেই বরই খাওয়া যাবে না।বরই রোদে দেওয়ার দুই থেকে তিন পর সেটা আধা শুকনো হয়।তখন খয়েরী একটা রং হয়। এই বরই দেখতে যেমন সুন্দর খেতে ও তেমন সুস্বাদু।কিন্তু এই বরই ধরার ও নিয়ম নেই।ছোট থেকে আম্মা আমরা যা খেতে চাই তা বেশি করে দেয় এই একটা ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন। কেনো তা আজও জানি না।একদিন জিজ্ঞেস করা লাগবে।যাইহোক এই বরই শুকিয়ে এমন অবস্থা করতেন শেষের দিকে দিলেও খাওয়া যেতো না।তারপরও দিতেন না।এটাকে প্যাকেট করে রেখে দিতেন। পরে তা অন্য মৌসুমে আচার বানাতেন,মুরাব্বা রান্না করতেন।আবার অনেক ফেলে দিতে হতো। কারণ এতো বেশি কি করবেন, তবু আধা শুকনো বরই খেতে দিবেন না।

আগেই বলে ছিলাম পাশের বাড়ির দাদুর গাছ আছে,তিনিও একি অবস্থা করতেন।এরপর আসা যাক মামি আম্মার কথায়।মামা বাড়িতে দুইটা গাছ ছিলো। একটা মিষ্টি বরই আর একটা টক।মামি আম্মা টক বরই গুলো পেরে কিছু টা অংশ আমাদের দিয়ে বাকী গুলো শুকাতে দেবে।আম্মার রোদে দেওয়া বরই খাওয়া নিষেধ। তবে আম্মা চাটাই পেতে শুকাতে দিতো। সেখান থেকে আম্মা আম্মার সামনে থেকে পাঁচ টা তো পিছনে আরও দশ নিয়ে খেয়ে নিতাম।কিন্তু মামি আম্মা মাছের জাল প্রথমে তিন দিক থেকে সেলাই করে তার ভিতর বরই রেখ বাকী থাকা পাশটাও সেলাই করে দিতেন।"বরই ধরতে পরবা,দেখতে পারবা খাইতে পারবা না।"এভাবে শুকিয়ে মৌসুম শেষে দেখাগেছে দুই তিন বস্তা শুকনো বরই ফেলে দিতে হচ্ছে।কিন্তু পরের বছর তিনি একি কাজ করেন।

ফুফুর বাড়িতে খুব বেশি যাওয়া হতো না আমাদের। বছরে দুই একবার যাওয়া হতো।তাই ফুফুদের বাড়ি সম্পর্কে খুব বেশি জানতাম না।তো একবার আমি আমার ছোট ফুফুর বাড়ি গেলাম। যাওয়ার পর ফুফু এতো আদর করেছে যে আমি অনেকটাই অবাক হয়েছি এতো আদর! হঠাৎ দেখি ফুফুও বরই শুকাতে দিয়েছেন। ভাবলাম এবার খাওয়া যাবে ইচ্ছে মতো।তারপর দেখি সব কিছুতে উন্মুক্ত হলেও ফুফুর কাছেও এই আধা শুকনো বরই খাওয়া যাবেনা।

তখন খুব মন খারাপ হতো। মনে মনে ভাবতাম আমি বড় হলে বরই রোদে দিয়ে আধা শুকানো সব বরই খেয়ে নেবো। আর এখন বাড়িতে বরই এর মৌসুম এসে চলে যায়,যাওয়া হয় না খাওয়াও হয়না। আম্মার খুব দুঃখ আমরা খেতে পারিনা। এখন হয়তো আধা শুকনো বরই খেয়ে নিলেও কিছু বলবেন না।

600px-Ziziphus_jujuba_MS_2461.JPG

"শুকনো বরই এর স্মৃতি" | Ecency