বিয়ে একটি সামাজিক রীতি। ধর্ম অনুসারে এর আচার অনুষ্ঠান যেমন ভিন্ন হয় তেমনি স্থান ভেদেও এর আচার অনুষ্ঠান রীতি ভিন্ন হয়।আজ আমি আমাদের এলাকার মুসলিম বিয়ের আচার অনুষ্ঠান বলতে যাচ্ছি।যদিও বর্তমান সময়টা ডিজিটাল তাই বর্তমান বিয়েগুলো হয় সিনেমাটিক কায়দায়। এগুলো সবার জানা। আমি যেটা বলবো সেটা হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর শেষ আর একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের আমাদের এলাকার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার কথা।
বিয়েতে পেশাদার ঘটক জরুরি না হলেও ঘটক অবশ্যই আবশ্যক। গ্রাম অঞ্চলে পেশাদার ঘটক দ্বারা বিয়ে খুব একটা হয়না।কেউ হয়তো তার ফুফুর বাড়িতে গেলো আশেপাশের কেউ তাকে দেখে তার এক আত্মীয়ের জন্য মনে মনে পছন্দ করে।তারপর সে তাকে বা তার আত্মীয় স্বজনদের বলে দেয় ওদের বাড়িতে বিয়ের বয়সী মেয়ে আছে। এভাবে কথা বার্তা ঠিক হলে, মেয়ে দেখতে আসার দিন ঠিক হতো।আর যদি পেশাদার ঘটক হয় তাহলে সে নিজে দুই পক্ষের সাথে কথা বলে মেয়ে দেখার দিন ঠিক করে।
আমাদের এলাকায় মেয়ে দেখার দিন থেকে শুরু হয় বিয়ের তোরজোর, মেয়ের বাড়িতে খাবারের আয়োজন করা হয়। উঠানে টেবিল দিয়ে তার চারপাশে চেয়ার দিয়ে দেয়।মেহমান এখানে বসে, তারপর মেয়েকে শাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে নিয়ে আসা হয়। খাবারের ট্রে হাতে মেয়ে এসে সালাম দেয়।তারপর নির্ধারিত স্থানে বসানো হয় মেয়েকে।তখন ছেলের বাড়ির লোকেরা মেয়েকে দেখে প্রশ্ন করে। পছন্দ হলে পাঁচ শত এক টাকা, এক হাজার একটাকা বা তার বেশি কিন্তু এক টাকা থাকবে।পরিমাণ টা সামর্থ্য অনুযায়ী হয়।পছন্দ না হলে কেউ কেউ একশ দুইশ টাকা দেয় কেউ না দিয়েই চলে যায় পরে জানাবে বলে।
পছন্দ হলে মেয়ের বাড়ি থেকে ছেলের সম্বন্ধে খোঁজ খবর নেওয়া হয়।তবে অবাক করা বিষয় ছেলের বিষয়ে খোঁজ নিতে হয় লুকিয়ে। এর পর বিয়ের দিন ঠিক হয়। বিয়ের দিন সকাল থেকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বিয়ে বাড়িতে রান্নার দায়িত্বে সব সময় পুরুষেরা থাকে। মহিলারা সকাল সকাল হলুদ মেহেদী বেটে মেয়েকে উঠোনে বসিয়ে প্রথমে হলুদ মাখিয়ে তার পর হাতে মেহেদী লাগিয়ে দেয়। এর ঘন্টা খানেক পর মেয়েকে গোসল করিয়ে স্বাভাবিক কাপড় পরিয়ে ঘরে খাটের উপর বসিয়ে বড় থালা সাজিয়ে আস্ত মুরগী ভাজি অন্যান্য পাঁচ রকমের ভাজি দিয়ে খাওয়ানো হয়।সাথে বাড়ির ছোটরা মহিলারা অল্প অল্প খায়।এরপর মেয়েকে খাটে বসিয়ে রাখা হয়।
মেয়ের চলাফেরা নিষিদ্ধ। অবশ্যই মেয়ের সাথে অনেকে বসে থাকে। এরপর বর আসার অপেক্ষা। বর কেনো যেনো সবসময় 'লেইট করে'।যদি দুপুর দুইটায় আসার কথা থাকে আসে চারটায়। কেউ কেউ আবার রাত দুইটায়ও আসে। বর আসার পর প্রথমে গেইট পার হতে হবে বরকে।গেইট বাঁশ আর রঙিন কাপড়ের সমন্বয়ে তৈরি।গেইটের মাঝে নিম্নমানের গ্রাফিক্স ডিজাইনের মতো 'স্টাইলিশ ফন্ট' দিয়ে বাংলাতে লিখা থাকে 'শুভ বিবাহ'।
শালি শালারা পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে এই বায়না ধরে বসে আছে। তারা পাঁচশো টাকা দিয়ে মিটিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। তারপর হয়তো মাঝামাঝিতে সমাঝোতা।এরপর বর গাড়িতে বসে থাকবে শ্বাশুড়ী টাকা অথবা স্বর্ণ দিয়ে নামাতে হবে।
এরপর বরযাত্রীরা তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় বসে যাবে।আর বরের বাড়ির মহিলারা বৌয়ের লাগেজ,ব্যাগপত্র নিয়ে বৌয়ের কাছে যাবে। এরপর লাগেজ খুলে দেখা হবে কি জিনিস এনেছে। এখানে ঝগড়া হবেই হবে।যতো ভালো জিনিস আর খারাপ জিনিসই আনা হোক ঝগড়া হবেই।যাইহোক ঝগড়া আবার মিটেও যাবে।এরপর কাজী সাহেব কয়েকজন মুরুব্বি নিয়ে ঘরে আসবে মেয়ের কবুল নিতে। আসার আগে একজন এসে বলে যায় কাজী সাহব আসছেন।তখন বৌয়ের বাপের বাড়ির পড়া কাপড়ের উপর একটা কাপড় দিয়ে গোমটা দেওয়া হয়।এই কাপড়টাকে বলা হয় 'করপোত্তে কাপড়'। যেটা শ্বশুর বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়।
শ্বশুর বাড়ির একজনের উকালতিতে বিয়ে শেষ হলে এদিকে বরযাত্রীরা খাওয়া দাওয়া করে, অন্য দিকে বৌকে সাজানো হয়।বৌ সাজানো শেষে ঘরের ভেতর কাপড় দিয়ে ঘেরাও করে আর একটা ঘর বানানো হয়।সেই ঘরকে বলে 'আন্দর ঘর'। সেখানে বর বউকে মিষ্টি খাওয়াবে বউ বরকে মিষ্টি খাওয়াবে। এরপর তাদের মুখের সামনে আয়না ধরা হবে দুজন দুজনকে আয়নার ভিতর দেখবে। এখান থেকে দুজনকে এক সাথে বের করে। উঠানে মেয়ের মুরুব্বি রা মেয়েকে স্বামীর হাতে সঁপে দেয়।বর বৌ এক সাথে মুরুব্বিদের সালাম করে।এরপর বৌকে গাড়িতে তুলে দেয়।গাড়িতে তুলার আগে কনে চিল্লাপাল্লা আর কান্নাকাটি করে বুঝিয়ে দেয় যে এই বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে।
বধু বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
বরের বাড়িতে বিয়ের দিন তেমন কোন আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয় না।সকালে বরের হলুদ মেহেদী দিয়ে গোসল করিয়ে বর সাজিয়ে বর যাত্রী নিয়ে চলে যায়।এরপর বৌ নিয়ে আসলে বধুবরণ হয়। শ্বাশুড়ী কিংবা বড়ো জা ধান দুর্বা দিয়ে মিষ্টি খাইয়ে বৌ বরণ করে। বরনের পর বৌকে কোলে করে ঘরে নিতে হবে।কি জানি কেনো বৌ হেঁটে যেতে পারবে না।আমাদের এলাকায় সেই রাতেই বাসর অনুষ্ঠিত হয়।বিয়ের এক দুই দিনের ভিতর বৌভাতের অনুষ্ঠান হয়।
এই হচ্ছে আমাদের এলাকার মুসলমানদের বিয়ের অনুষ্ঠান।এই তর্কে যাচ্ছি না এটা কি সত্যিই মুসলমানদের রীতি অনুযায়ী হয় কিনা,তবে আমাদের এলাকাতে এভাবেই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।যদিও এখন আবার অনেক কিছুই পাল্টাতে শুরু করেছে এবং যাচ্ছে।