প্রিয় শিক্ষক

Words
749
Reading
4 min
Listen
Play
4y

IMG_20200627_113056.jpg

আমি স্টুডেন্ট হিসাবে ছিলাম গড়পড়তা।কখনও ফেইলও করিনি আবার কখনও ভালো কোনো অবস্থানও করতে পারিনি।কখনও স্কুল কামাই করিনি,আবার কখনও বাড়ি থেকে বাড়ির কাজও করে নিয়ে যায় নি।স্কুলে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে আগে বাড়ির কাজগুলো করে নিতাম।একটা কথা আছে না,শিক্ষকরা ক্লাসের দুই ধরনের ছাত্রকে চিনে,ভালো ছাত্রকে আর দুষ্টু ছাত্রকে।তাই আমাকে চিনার কোনো প্রশ্নই আসতো না।এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যাথাও ছিলো না।স্কুলে আসতে হবে তাই আসতাম।কিন্তু পড়ালেখায় আমার কোনো মন ছিলো না।কখন ক্লাস শেষ হবে আর খেলা করবো তা নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম।

আর বাড়িতে এসে ঘরে বই রেখে কোনো মতে খাওয়া শেষ করে গাছে গাছে চড়ে বেড়ানো ছিলো আমার প্রধান কাজ।এভাবে নবম শ্রেণি পর্যন্ত চললো।কোনো প্রাইভেট বা কোচিং করিনি।যা পড়েছি নিজে নিজে।যখন দশম শ্রেণীতে উঠলাম আমার বান্ধবী আমাকে বললো,আমরা কলেজের ইংরেজি শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়বো তুই পড়বি?ওর আমাকে প্রস্তাব করার কারণ ছিলো,ঐ শিক্ষক বিশ জন না হলে পড়াবেন না,ওনি ব্যাচ হিসাবে পড়ান।এক ব্যাচে বিশজন ছাত্র।আমি ওকে বললাম, আমি তোকে আগামী কাল জানাবো।

স্কুল থেকে এসে আম্মাকে বললাম,সৃজনশীল সিস্টেম একটু কঠিন।আমাদের শ্রেণির অনেকে ইংরেজি শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়বে,আমি কি পড়বো?আম্মা বললো,ঠিক আছে পড়।
আমি পরের দিন গিয়ে বললাম পড়বো।সেদিন টিফিন পিরিয়ডে আমরা পাঁচজন কলেজে গেলাম স্যার এর সাথে কথা বলতে।আমাদের এক বান্ধবীর পরিচিত একজন কলেজে পড়ে,সে আমাদেরকে স্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে।আমরা গিয়ে দেখলাম,অনেক ছাত্রছাত্রী একটি কক্ষে বসে আছে।আমরা সেখানে গেলাম দেখি সবাই কান্না করছে।

আমরা অবাক সবাই এমন একসাথে বসে কাঁদছে কেনো।কিছু বুঝতে পারলাম না।আমার বান্ধবী তার পরিচিত মেয়েটির কাছে গেলো।সে জিজ্ঞেস করলো,তোমাদের সবার কি হয়েছে।ওরা কিছু বললো না।এবার সে বললো,আপু আমরাতো ইংরেজি স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছি,তুমি কি আমাদের নিয়ে যাবে স্যারের কাছে?এ কথা শুনে সবাই আরও বেশি কাঁদতে লাগলো।আর একজন বললো,স্যার যদি থাকতো তাহলে কি আমরা এখানে বসে কাঁদতাম।আমার বান্ধবী বলে উঠলো,মানে কি!আর একজন বলে উঠলো,স্যার আজ আমাদের কলেজ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে।স্যারের আরও ভালো কলেজে চাকরি হয়েছে।

আমরা চলে আসলাম,কিন্তু মনে একটাই প্রশ্ন এক স্যার চলে গেছেন,আরেক স্যার আসবেন,এতে এতো মরা কান্না করার কি আছে!

এরপর অনেক দিন চলে গেলো।মডেল টেস্টের আগে আমার বান্ধবী বললো,স্যার আবার ফিরে এসেছেন কলেজে,টেস্টের পর আমরা তিন মাস পড়বো।তুই পড়বি? ইদানীং আমি এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম,কারণ পড়ার থেকে আমার আগ্রহ কান্নার কারণ খোঁজা।মডেল টেস্টের পর পড়ার তারিখ ঠিক হলো,প্রথম দিন পড়তে গেলাম।কলেজের একটা কক্ষে ছাব্বিশ জনকে একসাথে পড়াবেন।আমরা পৌঁছানোর বিশ মিনিট পর স্যার আসলো।ফর্সা লম্বা অন্যরকম এক সুদর্শন পুরুষ।এতো সুন্দর পুরুষ মানুষ এক হাজারে এক জন হয়।মনে মনে ভাবলাম,তাহলে বোধহয় এইজন্যই মেয়েরা এতো কান্না করছিলো সেদিন,কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম তাহলে ছেলেগুলো কেনো কাঁদলো সেদিন।

এর মধ্যে স্যার সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।স্যার বলতে শুরু করলেন আমি মাশরুক আকন্দ শোয়েব।আজ আমরা সবাই পরিচিত হবো।আমি তোমাদের সবার নাম জেনে নয়,শিখে নিবো।যাতে সবাইকে নাম ধরে ডাকতে পারি।এই তুমি, সেই তুমি এসব নাম আমার পছন্দ না।আমি সবাইকে নাম ধরে ডাকতে পছন্দ করি।ঐদিন নাম পরিচয়ের মাধ্যমে ক্লাস শেষ হলো।স্যার সপ্তাহে তিন দিন পড়াবেন।স্যারের কাছে পড়া শুরু করলাম।ক্লাসের প্রত্যেকে ওনার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।আর প্রত্যেকটা পড়া প্রতিটা ছাত্রছাত্রীকে আলাদা ভাবে বুঝান।একজন ছাত্র বুঝতে বাকি থাকলেও সেটা পার করে যাবেন না।ইংরেজি বর্ণমালা A,B,C থেকে শুরু করলেন,গ্রামার শুরু করলেন Parts of speech থেকে।

দুই ঘন্টা আড়াই ঘন্টা ক্লাস করেন।শুধু যে ইংরেজি পড়াচ্ছে তা নয়,জীবনে চলার পথে কোনটা ভালো কোনটা মন্দ,ধর্ম নৈতিকতা সব দায়িত্ব যেনো ওনার।একটা ছোটো বাচ্চাকে যেভাবে একটু একটু করে শিখায়,স্যার আমাদের কে সেভাবে শিখাচ্ছেন।পরীক্ষার তিন মাস আগে আমরা পড়তে গিয়েছি,ভেবেছিলাম দুই মাস হয়তো পড়বো,স্যার পাশ করার মতো কিছু টিপস দিবেন শেষ।কিন্তু স্যার পাশের জন্য নয় শিখানোর জন্য শুরু করেছেন।পরীক্ষার আগে স্যার আমাদের বেসিক কিছু গ্রামার আর পাঠ্যবই এর কিছু অংশ পড়াতে পেরেছেন।তাতে কি যা পড়িয়েছেন তাতে আমরা পঞ্চাশ এর উপর নাম্বার পেয়ে গেলাম।

এবার আমরা কলেজে চলে আসলাম।এবার আমরা স্যারের ক্লাসের ছাত্রছাত্রী।ক্লাসে প্রায় দুইশো জন ছাত্র ছাত্রী।স্যার প্রত্যেকের নাম জানেন।প্রত্যেকের নাম যেনো স্যার এর মুখে অর্থ বহ হয়ে উঠে।ওনার কাছ থেকে আস্তে আস্তে শিখতে শুরু করলাম শিক্ষার মানে।ধীরে ধীরে ক্লাসের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী হয়ে গেলাম।স্যার যখন আমাকে নাম ধরে ডাকতো তখন আমার মনে হতো আমার পুরাতন নামটা নতুন হয়ে গেছে।আমি বুঝতে পারলাম শিক্ষককে কেনো জীবন গড়ার কারিগর বলা হয়।আমি বুঝতে পারলাম লেখাপড়া পাশ করার জন্য নয় জীবনের জন্য।শুধু আমি নই,স্যারের প্রত্যেকটা ছাত্রছাত্রী সেটা জানে।

কলেজ জীবনের দুই বছর স্যারের কাছ থেকে যা শিখেছি,সারা জীবন সুষ্ঠু জীবনযাপনের জন্য তা পর্যাপ্ত।কলেজ জীবনের শেষ দিন যেদিন বিদায় অনুষ্ঠান ছিলো আমরা প্রায় দুইশো জন ছাত্র ছাত্রী এতো কেঁদেছিলাম যে এর আগে মনে হয় কোনো ব্যাচ এতো কাঁদেনি।কলেজ ছাড়ার জন্য আমরা কাঁদিনি, কেঁদেছিলাম স্যারকে ছেড়ে আসার দুঃখে।স্যারের মতো এমন শিক্ষক যদি বাংলার প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকতো তাহলে হয়তো বাংলাদেশে শিক্ষিত অপরাধী থাকতো না।

অনেক বছর কেটে গেছে স্যারের সাথে সাক্ষাৎ নেই,কিন্তু স্যারের দেওয়া শিক্ষা গুলো আমার জীবনে প্রতিটা পদের পাথেয়।সেরা শিক্ষক,প্রিয় শিক্ষক কিংবা আদর্শ শিক্ষকের পদবী দিয়ে স্যারকে বর্ণনা করা সম্ভব নয়।স্যারের উপমা শুধু স্যার নিজেই।শুধু আমি নই, স্যারের হাজার ছাত্র ছাত্রী স্যারকে নিয়ে একি ধারণা পোষণ করে।

প্রিয় শিক্ষক | Ecency