আমার মা গ্রামের বাচ্চাদের কোরআন পড়ান,তাই সেই ছোট বেলা থেকে মায়ের সাথে থেকে আমিও শিক্ষকতাটা শিখে নিলাম।যখন আমি তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি তখন কোরআন পড়তে পারি।তাই মাঝেমধ্যে আম্মা ব্যস্ত থাকলে বলতেন আজকে তুমি বাচ্চাদের পড়িয়ে ছুটি দিয়ে দাও।এভাবে প্রায়ই আমি ওদের পড়াতাম।তখন থেকে শিক্ষকতা আমার ভালো লাগতো।ওস্তাদের সন্তান হিসাবে সবাই খুব সম্মান করতো।এলাকার ছোটো থেকে বড় কেউ কখনও আমাদের 'তুই' সম্বোধন করে কথা বলেনি।
শিক্ষকের এতো সম্মান দেখে ছোটো থেকেই শিক্ষকতার প্রতি আমি দুর্বল হয়ে যায়।এর মধ্যে আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি তখন আমার এক ভাবী তার ছোটো ছেলেকে নিয়ে এসে বললো আপা আমার ছেলেটাকে পড়ান।ওর নাম বাবু।বাবুকে স্বর্ণবর্ণ শিখানোর মাধ্যমে আমার শিক্ষকতার সূচনা।এরপর আস্তে আস্তে ছাত্রছাত্রী বাড়তে লাগলো।সবই কচিকাঁচার দল।যখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখন বিশ জনকে একসাথে পাটের তৈরি বিছানা মাটিতে পেতে সেখানে বসিয়ে পড়াতাম।দশম শ্রেনীতে থাকাকালীন গ্রুপ আকারে ভাগ করে পড়ানো শুরু করি।
এইসএসসি পাশ করার পর ঢাকা চলে আসি উচ্চশিক্ষার জন্য।সেটা ছিলো ২০০৮ সাল তখন আমার বড় আপা অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে।আমি ওনার কাছে আসলাম,বড় আপার অনেক ছাত্রছাত্রী ছিলো।বড় আপা তার তিনজন ছাত্রীকে আমাকে পড়াতে দিলো।আমি তাদের বাসায় গিয়ে পড়াতাম।অল্পদিনে এখানেও ভালো শিক্ষক হিসাবে পরিচিতি লাভ করি।এখানেও ব্যাচ আকারে পড়ানো শুরু করলাম।অনার্সের শেষের দিকে পড়ালেখার পাশাপাশি টিউশনি করে মাসে প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার মতো আয় হতো।২০১৪ তে অনার্স কোর্স শেষ হলো।
মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হলাম।তখন নিজের বাসায় দুইটা ব্যাচ পড়াতাম,আর শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে আরো চার-পাঁচজনকে পড়াতাম।তখন মোটা বাইশ জন শিক্ষার্থী ছিলো।হঠাৎ আমার মাথায় এলো উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাবো।অনেক দেশে চেষ্টা করলাম হলো না।শেষে মালয়েশিয়ার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।যাওয়ার দিন ঠিক হলো।ছাত্রছাত্রীরা ততদিনে জেনে গেলো আমি চলে যাচ্ছি।
২০১৫ সালের জুন মাসের এগারো তারিখ রাতে আমার ফ্লাইট ছিলো।আর বারো তারিখ আমার জন্মদিন।আমি দশ তারিখ পর্যন্ত পড়ালাম, আমার ব্যাচে করে পড়ানো ছেলেমেয়ে নিজেরা কথা বলে, একজন আমাকে ফোন করে বললো,'আপু এগারো তারিখ দুপুর তিনটায় আমরা সবাই আসবো,আপনি বাসায় থাকবেন'।আমি বললাম আচ্ছা ঠিক আছে,এসো তোমরা।
এগারো তারিখ সকালে আমি কিছু কেনাকাটার জন্য বাহিরে গেলাম।দুপুর আড়াইটার পর ফিরে দেখি সব ছাত্রছাত্রী একসাথে এসে হাজির।ওদের ব্যাগগুলো মোটা মোটা হয়ে ফুলে আছে,যেন মনে হচ্ছে ওরাও পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে আমার সাথে চলে যাবে।একজন জিজ্ঞেস করলো, আপু এখন আপনি কি করবেন।আমি বললাম আমি এখনোও গোসল করিনি।সাথে সাথে একজন বললো,ঠিক আছে আপু আপনি গোসল করে আসেন।আমি আমার বেডরুমের সাথের বাথরুমে ঢুকার সাথে সাথে বেডরুমের দরজা বাহির থেকে তারা বন্ধ করে দিলো।গোসল করে বের হয়ে দেখি দরজা বন্ধ, আমি কিছু না বুঝে ওদের সাথে কথা বলার জন্য প্রস্তুত হয়ে দরজা ধাক্কা দিলাম।
দরজা খুলে আমি অবাক হয়ে গেলাম।ড্রয়িং রুম সাজানো।ওদেরকে যে বেঞ্চিতে বসিয়ে পড়াতাম সেইদুটো একসাথে করে টেবিলের মতো বানিয়ে তা উপর কেইক,পায়েস,ফিরনি,বিভিন্ন ধরনের চপ,চকলেট কতো কি।ওরা সবাই আমার জন্য উপহার নিয়ে এসেছে।ওদের মধ্যে সবার ছোটো ছিলো সাদিয়া।ও তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে।ও বুঝতে পারেনি সবাই উপহার নিয়ে আসবে,সে কিছু আনেনি।জন্মদিনের অনুষ্ঠান সবাই একসাথে পালন করলেও উপহার সবাই ব্যক্তিগত ভাবে এনেছে।ঘড়ি,ব্যাগ,ডায়েরি,মগ,শোপিস এমন আরও অনেক কিছু।সবাই উপহার দিচ্ছে এই দেখে সাদিয়া মন খারাপ করে বসে আছে এক কোণায়।আমি সবার সাথে কথা বললাম,বিদায় নিলাম।সাদিয়ার সাথেও কথা বললাম।
সবাই চলে যাওয়ার পর আমি ঘরে চলে গেলাম।সাদিয়া তখনও বসে আছে,আমার মেঝু আপা তাকে দেখে বললো,তুমি এখনও বাসায় যাওনি।ও বলে,আমি আপুর সাথে কথা বলবো।মেঝু আপা আমাকে ডেকে বললো,কিরে তুই সাদিয়ার সাথে কথা বলিস নি।আমি বেরিয়ে এসে আবার সাদিয়ার কাছে বসলাম।সাদিয়া বলতে লাগলো,আপু আমি আপনার জন্য কোনো উপহার কিনিনি।আমি বললাম,তাতে কি হয়েছে।এইযে তোমরা সবাই মিলে আমার জন্মদিন পালন করলে এতেই আমি খুব খুশি হয়েছি।
ও তখন বললো,কিন্তু আমি আপনাকে কিছু দিতে চাই।বলতে বলতে একটা কলম আর গোলাপ ফুল বের করলো...
চলবে...
(এই লেখাটি আমার বোন সেতারা পারভীন রুবির,তার অনুমতি নিয়ে পোস্ট করেছি)